তোমরা কাপড় পরে তৈরি হয়ে নাও, আমিও আসছি। কথাটা বলে বনহুর ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করলো।
ততক্ষণে কেশব আর ফুলমিয়া স্যুট পরে তৈরি হয়ে নিলো। যদিও একটু-আধটু ঢিলা এবং আঁটসাট হলো তবু একেবারে কোনোরকম বেখাপ্পা ধরনের হলো না। কেশব আর ফুলমিয়ার পোষাক পরা হয়ে গেলো তবু বাবুর সন্ধান নেই, তিনি ড্রেসিং রুমে যেন আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
বেশ কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো বনহুর কিন্তু তাকে দেখে হঠাৎ চমকে উঠলো কেশব আর। ফুলমিয়া। আজ বনহুরের দেহে পূর্বদিনের সেই ড্রেস বিদ্যমান। তাকে দেখলে এই মুহূর্তে চেনা কিছুতেই সম্ভব নয়।
কেশব আর ফুলমিয়া যখন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে–এই ভদ্রলোক কি করে ভেতর কক্ষে প্রবেশ করলেন আর কখনই বা প্রবেশ করেছিলেন ড্রেসিং রুমে।
বনহুর কেশব আর ফুলমিয়ার মুখোভাব লক্ষ্য করে একটু হেসে বললো–তোমরা আমাকে চিনতে পারনি। আমিই তোমাদের বাবু আলম।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো কেশব –বাবু!
ফুলমিয়া ঢোক গিলে বললো–স্যার আপনি! আপনিই সেই ভদ্রলোক বুঝি?
হাঁ। শোন আমি এখন কোনো ছবির প্রযোজক বুঝলে? মানে আমার টাকায় ছবি তৈরি করবো।
স্যার ছবি তৈরি করবেন? তা আমরা পারবো আপনার সহকারী হতে?
আঃ শোনোই না। ছবি তোমাদের তৈরি করতে হবে না, করবো আমি। শোন, তোমাদের যা বলবো সেই ভাবে কাজ করবে।
আচ্ছা স্যার। বললো ফুলমিয়া।
কেশব যেমন অবাক হয়েছে, তেমনি হয়েছে হতবাকবাবু কি পাগল হলেন নাকি! ফুলের সন্ধান করতে এসে শেষে কিনা ফিল্ম তৈরি করবেন।
বনহুর কেশবের মনোভাব বুঝতে পেরে হেসে বললো–কেশব, সখ হলো ফিল্ম করার এবং আমার ছবিতে নায়িকা হবে ফুল।
বললো বনহুর–আর বিলম্ব নয় এক্ষুণি বেরুবো। প্রথমে একটা গাড়ির একান্ত দরকার।
ফুলমিয়া ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছিলো গাড়ি ডাকতে।
বনহুর বললো–গাড়ি কিনতে হবে বুঝলে?
ফুলমিয়া অবশ্য ততক্ষণে দরজায় দাঁড়িয়ে পড়েছে। ফিরে দাঁড়িয়ে বললো–গাড়ি কিনবেন স্যার?
হাঁ, ছবি করতে হলে কতক্ষণ ভাড়াটে গাড়িতে কাজ চলবে, একটা গাড়ি কিনতেই হবে।
আজ অবশ্য ভাড়াটে গাড়িতেই বেরুতে হলো। বনহুর ছদ্মবেশে সজ্জিত হয়ে কেশব আর ফুলমিয়াসহ সিঁড়ি দিয়ে যখন নামছিলো নিচে তখন ফাংফালিও–এর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।
কেশব আর ফুলমিয়ার সঙ্গে অপরিচিত এক ভদ্রলোককে দেখে অবাক হলেন ফাংফালিও বললেন তিনি ইনি কে চিনতে পারলাম নাতো?
ফুলমিয়া আর কেশব ভাল ইংলিশ বোঝে না, কাজেই ফাংফালিও এর কথার এক বর্ণও বুঝতে পারলো না তারা। বনহুর তখন নিজেই ইংলিশে পাল্টা জবাব দিলো–ভদ্র মহোদয়, আমি মিঃ আলমের বন্ধুজন। এসেছিলাম তার সঙ্গে দেখা করতে। ফাংফালিও সসম্মানে পথ ছেড়ে দিলেন–ধন্যবাদ।
বনহুর ঐ দিনের মধ্যেই একটা মাষ্টার বুইক গাড়ি কিনে ফেললো। তারপর শুরু হলো তার কাজ।
কেশব আর ফুলমিয়া হলো তার সঙ্গী।
কেশব আর ফুলমিয়াকে সঙ্গে করেই একদিন বনহুর হাজির হলো পরিচালক আলী সাহেবের বাড়িতে। আলী সাহেবের নিকট কেশব আর ফুলমিয়াকে তার পার্টনার বলে পরিচয় দিলো।
এ কথা-সে কথার মধ্যে বললো বনহুর–আলী সাহেব, আমার পাটর্নারদেরও ইচ্ছা আপনি আমাদের ছবি পরিচালনা করবেন।
খুশি হয়ে আসলাম আলী রাজি হয়ে গেলেন। পরদিন চুক্তিবদ্ধ হবেন বলে কথা দিলেন বনহুরের কাছে।
সেদিনের মত বিদায় গ্রহণ করলো বনহুর, কেশব আর ফুলমিয়া।
এখনও বনহুর নিশ্চিন্ত নয় নূরী সম্বন্ধে–সে জানে না নূরীর কোনো সন্ধান। সে যে আসলাম আলী সাহেবের বাড়ি আছে না কোথায় আছে তাই বা কে জানে। তবে বনহুর আন্দাজ করে নিয়েছে নূরী আসলাম আলীর আয়ত্তেই আছে। আলী সাহেবের কথাবার্তায় সে বুঝতে পেরেছিলো, নূরীরই নামকরণ হয়েছে শশী।
বনহুরের সর্বক্ষণের চিন্তা নূরীকে উদ্ধার করা, কোনো সময় সে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে না। কেমন করে নূরীর দর্শন পাবে, কবে তাকে নিয়ে বিদায় হবে, ত্যাগ করবে এই বোম্বে শহর, সব সময় এ কথাই ভাবতে লাগলো সে।
আম্বিয়া হোটেল থেকে যে টাকা সে পেয়েছিলো তা দু’দিনেই শেষ হয়ে গেলো। গাড়ি কিনতে এবং ফুলাগু হোটেলের খরচ জোগাতেই প্রচুর টাকা লাগলো বনহুরের। আগামীকাল আলী সাহেবকে ছবির কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ করতে হবে। তখন লাগবে বেশ কয়েক হাজার টাকা। তা ছাড়াও ছবির জন্য নায়িকা–হাঁ, নায়িকাকেও চুক্তিবদ্ধ করতে হবে। টাকা–অনেক টাকার প্রয়োজন।
বনহুর ফুলাগু হোটেলের নিজস্ব কামরায় বসে ভাবছিলো– সম্মুখে এ্যাসট্রে পাশেই সিগারেট কেস আর ম্যাচটা পড়ে আছে। আংগুলের ফাঁকে অর্ধদগ্ধ সিগারেট। টেবিলে খবরের কাগজখানা মেলে মনোযোগ সহকারে দেখছিলো সে, আর মাঝে মাঝে সিগারেটখানা ঠোঁটে চেপে ধরে ধুম গ্রহণ করছিলেন।
বনহুরের মুখমন্ডল অত্যন্ত গম্ভীর ভাবাপন্ন। ললাটে চিন্তা রেখা ফুটে উঠেছে। বেশ কিছুক্ষণ খবরের কাগজের পাতায় মনোযোগ দেবার পর উঠে পায়চারি আরম্ভ করলো সে।
এমন সময় কেশব প্রবেশ করলো তার কামরায়। বললো সে–বাবু, সেই ভদ্রলোক এসেছেন।
ভদ্রলোক! বনহুর পায়চারী বন্ধ করে প্রশ্নভরা দৃষ্টি তুলে তাকালো কেশবের মুখে।
হাঁ, সেই যে আমরা আজ দুপুরে যেখানে গিয়েছিলাম পরিচালক আলী সাহেব–
ওঃ তিনি এসে গেছেন? বনহুরের মুখমন্ডল ক্ষণিকের জন্য ভাবগম্ভীর হলো। চট করে নিজেকে সংযত করে নিয়ে বললো–কোথায় তিনি?
