বনহুর বোম্বে সংবাদপত্রে এই আম্বিয়া হোটেল সম্বন্ধে বিশেষভাবে জ্ঞাত হয়েছিলো। আরও বিস্তারিত জেনে নিয়েছিলো সে ফুলাগু হোটেলের মালিক ফাংফালিও-এর কাছে। বলেছিলো ফাংফালিও-সাহেব, বোম্বের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য উপায়ে পয়সা উপার্জন করে থাকে ঐ আম্বিয়া হোটেল। এখানে সবরকম পাপ কাজ সমাধা হয়ে থাকে। তেমনি পয়সাও পায় ওরা প্রচুর।
বনহুর সংবাদপত্রে এ হোটেলের ঠিকানাও জেনে নিয়েছিলো। কাজেই কোনো অসুবিধা হলো না তার এই মুহূর্তে।
বনহুর হোটেলের সম্মুখে গাড়ি রেখে নেমে পড়লো বটে কিন্তু ঠিক সম্মুখ গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো না। পিছন দিক দিয়ে হোটেলের বাবুর্চির ক্যাবিনে প্রবেশ করলো প্রথমে; নাক ডেকে বয় আর বাবুর্চিরা ঘুমাচ্ছে। বনহুর আলগোছে বেরিয়ে এলো হোটেলের সম্মুখ দিকে। দোতলার রেলিং বেয়ে সোজা এগুতে লাগলো আলো প্রজ্জ্বলিত কামরার অভিমুখে।
বনহুর গাড়ির ভিতর হতে এই কামরাটা লক্ষ্য করে নিয়েছিলো। অন্যান্য কামরা অন্ধকার হলেও এই কামরায় তখন আলো জ্বলছিলো। বনহুর ভাবলো, এটাই হোটেলের কর্মকর্তাদের আড্ডা-গৃহ বা রাত্রির বিনোদ ভবন। কিন্তু আসলে তা নয়, এটা ছিলো এই আম্বিয়া হোটেলের ম্যানেজারের কামরা। সমস্ত দিনের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ম্যানেজার ও তার সঙ্গীদ্বয়। পাশেই গাদা গাদা টাকার বান্ডিল সাজানো।
নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে চলেছে ওরা কোনোরকম ভয় বা সন্দেহের কারণ নেই। হোটেলের গেটে সজাগ রাইফেলধারী পাহারাদার রয়েছে।
এমন সময় বনহুর আচমকা প্রবেশ করে সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার উদ্যত করে ধরে সে–খবরদার নড়লে মৃত্যু!
হঠাৎ বজ্রপাতের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে যায় আম্বিয়া হোটেলের ম্যানেজার ও কর্মব্যস্ত সঙ্গীদ্বয়। এতোক্ষণ হিসাব নিকাশের মাঝে বার বার হাই তুলছিলো ওরা, নিদ্রায় তাদের চোখের পাতা এক হয়ে আসছিলো। আচমকা জমকালো একটি মূর্তিকে তাদের সম্মুখে রিভলভার হস্তে দন্ডায়মান দেখতে পেয়ে হকচকিয়ে যায় তারা।
ম্যানেজার বাবু ভয়-বিহ্বল কণ্ঠে চিৎকার করতে যায়–ডাকু–ডাকু—
বনহুর চাপা কলায় বলে–চুপ করো! চেঁচালে এক্ষুণি গুলী ছুড়বো।
দক্ষিণ হস্তে রিভলভার উদ্যত রেখে টাকার বান্ডিলগুলো পকেটে পুরে বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ায় পর মুহূর্তে পিছু হটে বেরিয়ে যায় বিদ্যুৎ গতিতে এসেছিলো ঠিক তেমনি করে।
বনহুর বেরিয়ে যেতেই ম্যানেজার এবং তার সহকারীদ্বয় চিৎকার করে উঠে–ডাকু, ডাকু, গ্রেপ্তার করো–গ্রেপ্তার করো–
ততক্ষণে বনহুর হোটেলের সিঁড়ি বেয়ে তর তর করে নিচে নেমে গেছে। উপর তলা হতে চিৎকার-ধ্বনি ভেসে আসতেই মেইন গেটের রাইফেলধারী পাহারাদার উঠিপড়ি করে ছুটলো উপরে।
বনহুর সেই মুহূর্তে লুকিয়ে পড়লো সিঁড়ির আড়ালে।
তার পাশ কেটে পাহারাদার এবং আরও লোকজন ছুটলো সবাই উপরে।
বনহুরের সম্মুখে গেট উন্মুক্ত, অতি সহজে সে গেট পার হয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। ষ্টার্ট দিতেই ছুটে বেরিয়ে এলো কয়েকজন, বনহুরের গাড়িকে লক্ষ্য করে চিৎকার করতে লাগলো।
ম্যানেজার ও তার সঙ্গের কর্মচারীদ্বয় তখন নেমে এসেছে, চিৎকাররত লোকদেরকে লক্ষ্য করে বললো–গাড়ির নাম্বার দেখেছেন আপনারা? গাড়ির নাম্বার—
লোকগুলো হাবা বনে গেছে যেন, বললো তারা–কই গাড়ির তো কোনো নাম্বার দেখলাম না। গাড়ির নাম্বার তো নেই!
বনহুরের গাড়ি তখন অদৃশ্য হয়ে গেছে দূরের বাকে।
ফুলাগু হোটেলে ফিরে এলো বনহুর যখন তখন গাড়ির পিছনে নাম্বার প্লেট লাগানো হয়ে গেছে। গ্যারেজ খোলাই ছিলো, গাড়ি রেখে নিজের কামরায় এসে দরজা বন্ধ করে দিলো। আপন মনেই হাসলো বনহুর, তারপর মাথার পাগড়িটা খুলে ফেলে দিলো বিছানায়। পকেট থেকে টাকার বান্ডিলগুলো বের করে স্যুটকেসে রেখে ফিরে এলো বিছানার পাশে। টেবিলের ড্রয়ার খুলে রিভলভারখানা রেখে দিলো।
বাথরুম থেকে যখন বনহুর বেরিয়ে এলো তখন তাকে দেখলে কেউ বলতে পারবেনা–একটু পূর্বের দস্যু এই মুহূর্তের বনহুর। নাইট ড্রেস পরে শয়ন করলো সে শয্যায়।
ভোরে ঘুম ভাঙতে বেশ দেরি হয়ে গেলো বনহুরের।
দরজা খুলে অবাক হলো সে, কেশব আর ফুলমিয়ার চোখে মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ বিদ্যমান।
বললো কেশব–বাবু, এতো বেলা অবধি কোনোদিন তো ঘুমান না? কোন অসুখ-বিসুখ করেনি তো?
মৃদু হেসে বললো বনহুর–আজ একটু বেশি ঘুমিয়েছি। আর বেশি ঘুমালেই বুঝি অসুখ বিসুখ হয়? শোন কেশব আর ফুলমিয়া, তোমরা চট করে নাস্তা এবং চা খেয়ে চলে এসো, বাইরে বেরুতে হবে।
কেশব আর ফুলমিয়া বাবুর কথামত কাজ করলো। তারা চা-নাস্তা করে সোজা চলে এলো বাবুর কামরায়। কেশব আর ফুলমিয়াকে বনহুর বসার জন্য ইংগিত করে বললো– বসো আমি আসছি।
বনহুর ড্রেসিংরুমে চলে গেলো, একটু পরে ফিরে এলো হাতে দু’জোড়া স্যুট এবং দুটো ক্যাপ। বললো বনহুর–তোমরা এগুলো পরে তৈরি হয়ে নাও।
অবাক হয়ে তাকালো কেশব আর ফুলমিয়া কারণ তারা ইতিপূর্বে এমন মূল্যবান স্যুট এবং টুপি পরেনি। কেশব হাত বাড়িয়ে নিলো বটে কিন্তু হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো–বাবু, এসব আমরা পরবো?
হাঁ, পরবার জন্যই তো দিচ্ছি; তোমরা আজ থেকে কোনো এক ছবির সহকারী পরিচালক হলে।
ফুলমিয়া আর কেশব অবাক হয়ে প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠলো–ছবির পরিচালক–বলেন কি বাবু?
