কেশব বললো–বাবু, ফুলকে উদ্ধার করতে আমরা প্রাণ দিতে পারি। বলুন বাবু, কি করতে হবে আমাদের?
ফুলমিয়া বললো–তিনি এখন কোথায় আছেন সন্ধান পেয়েছেন স্যার? যদি সন্ধান পেয়ে থাকেন আমাকে বলুন, আমি লাঠি দিয়ে তাদের মাথা লাল করে আমাদের বোনকে নিয়ে আসবো।
হেসে বললো বনহুরফুলমিয়া, সে যেখানে আছে সেখানে সহসা কেউ যেতে পারবে বলে মনে হয় না, তাছাড়া লাঠি দিয়ে তাদের মাথা ফাটানোও সম্ভব নয়। কাজেই তোমাদের বোনকে উদ্ধার করা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না।
কেশব আর ফুলমিয়ার মুখ শুকিয়ে গেলো, তাহলে ফুল নিশ্চয়ই কোনো কঠিন স্থানে আটকা আছে, যেখানে তাদের প্রবেশ অসাধ্য এবং লাঠি কোনো কাজে আসে না।
বনহুর গম্ভীর মুখে চিন্তা করতে লাগলো, কারণ সে নিজেও জানে না নূরী কোথায় আছে, তবে আন্দাজে মনে হয় এমন জায়গায় সে আছে যেখানে সর্বসাধারণের গমনাগমন কঠিন।
বনহুরের চিন্তা অহেতুক নয়, নূরী এখন আসলাম আলীর আয়ত্তে এবং শ্যামারাণীর নাগপাশে আবদ্ধ। নূরীর নিজস্ব শক্তি এখানে কিছুই নেই। আসলাম আলীর হাতের পুতুল এখন নূরী।
‘স্বয়ংবরা’ ছবিতে নূরীকে ক্যামেরার সম্মুখে কাজ করাতে আসলাম আলী চৌধুরী হিমসিম খেয়ে গিয়েছিলেন, তবু নাছোড় বান্দা হয়েছিলেন তিনি। নূরীকে নিয়ে ছবি শেষ করতে অনেক সাধ্য-সাধনা তাকে করতে হয়েছে, তবেই না আজ স্বয়ংবরা’র এতো সুনাম। সত্যিই ছবিটা দর্শক সমাজে একটা সুন্দর সার্থক ছবি বলে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। শুধু তাই নয়, নূরীকে দর্শকমণ্ডলী অত্যন্ত প্রীতির সঙ্গে গ্রহণ করেছে। স্বয়ংবরা’ শুধু বক্স অফিস হিট করেনি, পরিচালক আসলাম। আলীকে অনেক দূর অগ্রসর করে দিয়েছে। এ ছবিতে প্রযোজক যেমন পয়সা পেয়েছেন তেমনি সুনাম পাচ্ছেন আলী সাহেব। পরিচালক জানেন, তাঁর ছবির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নতুন মুখ। শশী।
আজকাল আসলাম আলীর কপাল খুলে গেছে যেন একটা কোম্পানি নয়, বহু কোম্পানি থেকে তার ডাক আসছে। আরও একটি ব্যাপার হলো, আসলাম আলীর হাতেই আছে নতুন শিল্পী শশী, শশীকে ছবিতে পেতে হলেই আসলাম আলীর প্রয়োজন।
কাজেই রোজ আসলাম আলীর গাড়ি-বারান্দায় প্রযোজকদের গাড়ির ভীড় জমে উঠতো। কেউ বা আসতো ছবি পরিচালনার দায়িত্ব দেবার জন্য,কেউ বা আসতো নতুন শিল্পী শশীকে তার ছবির নায়িকার চরিত্রে গ্রহণের আশায়। আসলাম আলীর বুক গর্বে স্ফীত হয়ে উঠতো, এমন একটি রত্ন। এখন তার হাতের মুঠায় যার জন্য তার ভবিষ্যত যে আরও উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
শশীকে ‘স্বয়ংবরা’য় কাজ করাতে যদিও আলী সাহেব হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিলেন তবু একটা আত্মতৃপ্তি ছিলো, আগামী একদিন একে নিজের মনের মত করে পাবেন। সেই বিশ্বাসেই আলী সাহেব ধৈর্য সহকারে প্রতীক্ষা করছিলেন।
এমন দিনে আবির্ভাব হলো বনহুরের। নূরীর সন্ধানেই আগমন তার, যেমন করে হোক নূরীকে চিত্রজগত থেকে সরিয়ে নিতেই হবে।
*
গভীর রাত।
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে নেমে দাঁড়ালো, পাশের স্যুটকেসটা খুলে বের করে ফেললো জমকালো ড্রেস। পরে নিলো–কতদিন পর আবার বনহুর এ ড্রেসে সজ্জিত হলো। দক্ষিণহস্তে তার রিভলভার। আজও নাসেরের রিভলভারখানা তার নিকটে সযত্নে রয়েছে।
নূরীকে উদ্ধার করতে হলে চাই প্রচুর টাকা। তাকে যে প্রযোজক সেজে কার্য হাসিল করতে হবে! সর্বপ্রথম চাই একখানা গাড়ি, মানে নিজস্ব মোটর কার। একটি ভাল গাড়ি কিনতে হলে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে। আরও অন্যান্য খরচ আছে। এই মুহূর্তে তার লক্ষ টাকার প্রয়োজন।
পাশের কামরায় কেশব আর ফুলমিয়া নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।
বনহুর মাথায় পাগড়িটা তুলে দিয়ে পাগড়ির খানিকটা অংশ দিয়ে মুখের নিচের দিকটা ঢেকে ফেললো, তারপর পিছন সিঁড়ি বেয়ে তর তর করে নিচে নেমে গেলো। পূর্বেই হোটেল-গ্যারেজের। একটা চাবি সংগ্রহ করে নিয়েছিলো বনহুর, গ্যারেজ খুলে বের করে ফেললো সে হোটেলের মালিকের গাড়িখানা যে গাড়ির চাবি আজ মালিকের নিকট হতে সংগ্রহ করে নিয়েছিলো সে।
গাড়ি নিয়ে বনহুর ছুটলো বোম্বের রাজপথ বেয়ে। রাত্রি গম্ভীর হওয়ার জন্য পথ প্রায় নির্জন তবে একেবারে স্তব্দ নয়। মাঝে মাঝে দু’একটা প্রাইভেট কার এদিক-ওদিক ছুটে চলে যাচ্ছে।
বনহুর মাথায় পাগড়িটা অবশ্য এখন খুলে রেখেছে পাশের আসনে কারণ হঠাৎ তার সমস্ত দেহে জমকালো ড্রেস দেখে পাহারারত পুলিশ কোনোরকম সন্দেহ করে নিতে পারে। বনহুর একটা নির্জন স্থানে গাড়ি রেখে নেমে পড়লো। কয়েকটা লৌহ যন্ত্রপাতি ইতিপূর্বেই সে সগ্রহ করে নিয়েছিলো। বনহুর কৌশলে গাড়ির নাম্বার প্লেট খুলে গাড়ির ভিতরে আসনের নিচে রেখে দিলো।
আবার চলতে শুরু করলো গাড়িখানা।
বোম্বে আম্বিয়া হোটেলের সম্মুখে এসে গাড়ি রেখে নেমে পড়লো বনহুর। আম্বিয়া হোটেল এখন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। শুধু একটি কক্ষে তখনও আলো জ্বলছে, এটি হলো আম্বিয়া হোটেলের ম্যানেজার শহীদ আফগানীর কক্ষ। দু’জন সহকারী নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছিলেন। এ হোটেলে প্রতি দিনের আয় প্রায় পঁচিশ হাজারের বেশি।
বোম্বের নামকরা আভিজাত্য ঘরের নারী-পুরুষ এ হোটেলে আগমন করে থাকেন। তাছাড়াও বিদেশী লোকজনের আমদানীও হয়ে থাকে। নানা ধরনের আমোদ-প্রমোদ চলে এ আম্বিয়া হোটেলে, এ হোটেলের বিশেষ আকর্ষণ হলো ফ্যান্সী নাচ আর বিলেতী মদ। গণ্যমান্য এবং ধনবান আগন্তুকদের শুভাগমনে সন্ধ্যার পর থেকে হোটেলটা গমগম করে। বোম্বের অধিবাসিগণই বেশি।
