আমি তেমনি একটা মনোভাব নিয়েই এসেছি আলী সাহেব। স্বয়ংবরা’ ছবি আমার কাছে খুব ভাল লেগেছে। নিখুঁত আপনার পরিচালনা, শুধু তাই নয়, এ ছবিতে যারা অভিনয় করেছেন তাদের
অভিনয়ও হয়েছে অত্যন্ত প্রাণস্পর্শী। আলী সাহেব, আমার ছবিতেও আমি এইসব শিল্পীদের গ্রহণ। করতে চাই।
অত্যন্ত আনন্দের কথা। আপনি যাদের পছন্দ করবেন তাদেরকেই চুক্তিবদ্ধ করা হবে।
বনহুর ভিতরে ভিতরে খুশিই হলো, এতো অল্প সময়ে এতোটা অগ্রসর হবে সে ভাবতেও পারেনি। আর বেশি এগিয়ে কাজ নেই, এতে ফল মন্দ হতে পারে। ধীরে এগুনোই শ্রেয় মনে করে সেদিনের মত বনহুর বিদায় গ্রহণ করলো পরিচালক আলী সাহেবের বাড়ি থেকে।
হোটেলে কেশব আর ফুলমিয়া বহুক্ষণ বাবুকে না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে সে গেলো কোথায়?
ফুলমিয়া আর কেশব যখন হোটেল থেকে বেরুতে যাচ্ছে ঠিক তখন বনহুরের গাড়ি এসে থামলো হোটেলের সম্মুখে।
বনহুরের পাশ কেটেই চলে যাচ্ছিলো ওরা।
বনহুরকে চিনতে পারে না ফুলমিয়া আর কেশব। বনহুর কিন্তু ওদের দু’জনার মুখোভাব দেখেই বুঝতে পেরেছে, ওরা অত্যন্ত ভাবাপন্ন ও চিন্তিত হয়ে উৎকণ্ঠিতভাবে কোথাও চলেছে। ওদের চিন্তার কারণ যে সে, নিজে সেটাও উপলব্ধি করে নিলো বনহুর।
ফুলমিয়া আর কেশবের সম্মুখে পথ রোধ করে বলে বনহুর –এই তোমরা শোন।
থমকে দাঁড়ালো কেশব আর ফুলমিয়া, দু’জনার মুখেই বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেছে, প্রথম চলার পথে বাধা।
কেশব বললো–স্যার, আমাকে ডাকছেন?
হা শোন।
বলুন স্যার?
তোমাদের দেখে খাঁটি বাঙ্গালি বলে মনে হচ্ছে, তোমরাই কি এই হোটেলে গত পরশু এসেছো?
হাঁ, আমরা বাঙালি এবং পরশু এসেছি। বললো কেশব।
বনহুর নিজের ছদ্মবেশ নিখুঁত হয়েছে বুঝতে পারলো, কারণ কেশব আর ফুলমিয়া তাকে একটুও সন্দেহ করেনি। বনহুর বললো–ওঃ তোমরাই তাহলে আমার বন্ধু আলমের সঙ্গীদ্বয়?
কেশব আর ফুলমিয়ার মুখটা উজ্জ্বল হলো, যাক এই অজানা অচেনা জায়াগায় তবু পরিচিত একজনকে পাওয়া গেলো। খুশি হলো বটে মুহূর্তের জন্য তারপর মুখোভাব গম্ভীর করে বললো কেশবস্যার, সকাল বেলা তিনি বাইরে গেছেন এখনও ফিরে আসেননি, আমরা তাই তাকে–
খুঁজতে যাচ্ছিলে বুঝি?
হাঁ, স্যার তিনি যে কেন এখনও আসছেন না ভেবে পাচ্ছি না আমরা।
তা তোমরা তাকে কোথায় খুঁজে পাবে? বিরাট শহরে কোথায় কি কাজ নিয়ে গেছে তাই বা কে জানে। যাক, আমি তাকে দেখি কোথাও পাই কিনা। তোমরা যাও, নিজের কামরায় চলে যাও।
কেশব আর ফুলমিয়া এতক্ষণে একজন দরদীর সন্ধান পায়। কতকটা আশ্বস্ত হয়ে ফিরে যায় হোটেলে।
বনহুর পিছন সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায় উপরে নিজ ক্যাবিনে। তারপর দ্রুতহস্তে ড্রেস পরিবর্তন করে নেয়।
বাথরুম থেকে যখন বেরিয়ে আসে তখন তাকে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না এই যুবক কিছু পূর্বের সেই প্রৌঢ় ভদ্রলোক। সুন্দর মুখমন্ডলে বনহুরের নেই কোনো ক্লান্তি বা অবসাদের ছাপ বরং অন্যদিনের চেয়ে আজ তাকে অনেক সচ্ছ মনে হচ্ছে। একটু পরে বনহুর ডাক দেয় কেশব আর ফুলমিয়াকে।
কেশব আর ফুলমিয়া অবাক হয়ে যায়, বিস্ময়ভরা নয়ন নিয়ে ওরা দু’জন তাকিয়ে থাকে বনহুরের দিকে।
কেশব বলে উঠে–বাবু, আপনি কোথায় গিয়েছিলেন? আর এলেনই বা কখন?
কেন, তোমরা বুঝি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলে?
তা আর হবে না বাবু, না হয়ে যে উপায় ছিলো না। এই বিদেশ বিভুঁই জায়গায় কি বিপদ যে কখন ঘটে–
আমার জন্য কিছু ভেবো না তোমরা। বসো কেশব আর ফুলমিয়া কথা আছে তোমাদের সঙ্গে।
কেশব আর ফুলমিয়া আসন গ্রহণ করলো।
কেশব বললো–বাবু, বোম্বে শহরে আপনার কোনো বন্ধু আছে কি?
আমার বন্ধু! অবাক হওয়ার ভান করে বলে বনহুর।
ফুলমিয়া বলে এবার–স্যার, আপনার বন্ধুই হবে। বেশ ভদ্রলোক বলে মনে হলো।
হাঁ বাবু, খুব ভদ্রলোক–চোখে চশমা, হাতে ঘড়ি–
কেশবের কথার মাঝখানে বলে উঠে বনহুর–বোম্বে শহরে আমার তো কোনো বন্ধু নেই। শোন কেশব আর ফুলমিয়া তোমরা এ দেশের কাউকেই বিশ্বাস করবে না। হঠাৎ কারো কাছে কোনো কথাও বলবে না কোনো সময়, কারণ কখন যে কে আমাদের বিপদে ফেলার জন্য ওৎ পেতে বসে আছে, বুঝতে পারবে না।
কেশব আর ফুলমিয়া মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো। লোকটা যে তাদের কাছে মিথ্যা বলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বনহুর বলে–কেশব, তুমি তো জানো, আমরা এই বোম্বে শহরে কেন এসেছি?
হা বাবু জানি ফুলকে খুঁজতেই আপনি–
শুধু আমি নই, ফুলের সন্ধান করতে গেলে বা তাকে খুঁজে বের করতে হলে তোমাদের উভয়ের সহযোগিতাও আমার দরকার হতে পারে।
কেশব ইতিমধ্যে ফুলমিয়ার কাছে নূরী সম্বন্ধে সব কথা খুলে বলেছিলো। গতরাতে সিনেমা। দেখে আসার পর বনহুর কেশবকে বলেছিলো ফুলমিয়াকে নিভৃতে সব ঘটনা যেন খুলে বলে। সে সঙ্গে আছে। তাছাড়া নূরীকে খুঁজে বের করতে হলে তাকেও প্রয়োজন হতে পারে।
বনহুরের কথাতেই কেশব সব খুলে বলেছে ফুলমিয়ার কাছে। কাজেই আজ বাবুর কথায়। অবাক হলো না, সব সে বুঝতে পারছিলো।
বলে চলে বনহুর–কেশব, আমি নূরীর সন্ধান পেয়েছি। সে যে বেঁচে আছে এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। কিন্তু এখনও জানি না সে কোথায় আছে। কেশব, নূরীকে খুঁজে বের করতে আমার বেশি বিলম্ব হবে না। তবে তাকে উদ্ধার করতে হলে আমাকে যথেষ্ট চেষ্টা করতে হবে এবং তোমাদের সহায়তা একান্ত দরকার হবে আমার।
