স্যার, ঐ যে গম্বুজ দেখছেন ওটাই তো বোম্বে স্টুডিও। গম্বুজগুলো স্টুডিও ফ্লোরের।
ওঃ তুমি দেখছি স্টুডিওর সব জানো?
পথের বাঁকে হ্যান্ডেলটা দ্রুত ঘুরিয়ে নিয়ে বললো ড্রাইভার প্রায়ই আমাকে স্টুডিওতে আসতে হয় কিনা, তাই সব জানি স্যার।
অল্পক্ষণেই গাড়ি এসে বোম্বে স্টুডিওর সম্মুখে দাঁড়িয়ে পড়লো। বিরাট ফটক, ফটকের দু’ধারে দু’জন পাহারাদার রাইফেল কাঁধে দাঁড়িয়ে আছে। একজন পাহরাদার ফটক খুলে দিলো, গাড়ি প্রবেশ করলো ফটকের মধ্যে।
পাহারাদার দু’জন সেলুট করে সরে দাঁড়ালো।
বনহুর স্টুডিওর অফিসে প্রবেশ করলো। ষ্টুডিও সম্বন্ধে সবকিছু পূর্ব হতেই জানা ছিলো, কাজেই আজ নতুন করে তাকে বেগ পেতে হলো না, সোজা সে অফিস-রুমে প্রবেশ করে স্টুডিও ডাইরেক্টর মিঃ রাজেন্দ্র চন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলো।
রাশভারী মানুষ মিঃ রাজেন্দ্র। কাগজপত্র নিয়ে কি যেন লিখছিলেন, চশমাসহ চোখ দুটো তুলে ধরে বললেন–বসুন।
বনহুর আসন গ্রহণ করলো।
মিঃ রাজেন্দ্র বললেন–আপনি কোথা থেকে এসেছেন জানতে পারলে
নিশ্চয়ই জানাবো। আমি খান বাহাদুর শামস ইরানী। এতোদিন বিদেশে ছিলাম কোনো ব্যবসা উপলক্ষে, এবার বোম্বে ফিরে এসেছি। ভাবছি অন্য ব্যবসা না করে এবার ছবি করবো।
খুশি হয়ে বললেন মিঃ রাজেন্দ্র চন্দ্র–বেশ তো, ভাল কথা। আজেবাজে ব্যবসার চেয়ে ছবির ব্যবসা অনেক লাভবান। যদি ছবি একবার হিট করে তাহলে কোনো কথাই নেই। একেবারে লালে লাল হয়ে যাবেন। দেখলেন না এ বছরের কয়েকটা ছবি কেমন মার্কেট পেলো?
হাঁ, সব জানি। বনহুর অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর মত মাথা দোলালো। তারপর বললো–আমি আপনার নিকটে এ বিষয়ে পরামর্শ নিতে এলাম।
বেশ ভাল কথা, জিজ্ঞাসা করুন?
বনহুর একথা-সে কথার মধ্য দিয়ে অল্পক্ষণেই গভীরভাবে আলাপ জমিয়ে নিলো মিঃ রাজেন্দ্র চন্দ্রের সঙ্গে। এমন কি, কথায় কথায় স্বয়ংবরা’ ছবির পরিচালকের ঠিকানা লিখে নিলো, তারপর বিদায় গ্রহণ করলো সে ঐ দিনের মত।
স্টুডিও থেকে বেরিয়ে সোজা আসলাম চৌধুরীর বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা দিলো বনহুর। অবশ্য এখন তাকে সর্বক্ষণ ভাড়াটে গাড়িই ব্যবহার করতে হচ্ছে। মিঃ রাজেন্দ্র চন্দ্রের ওখান থেকে সোজা একেবারে পৌঁছে গেলো বনহুর পরিচালক আসলাম চৌধুরী বাসায়।
মস্তবড় দোতলা–ইংলিশ প্যাটার্ণের সবুজ রংয়ের বাড়ি। সম্মুখে বাগান; বাগানের মধ্য দিয়ে। লাল কাকড় বিছানো পথ। পথটা সোজা চলে গেছে গাড়ি বারান্দায়।
বনহুরের গাড়ি গেট পাট হয়ে গাড়ি-বারান্দার নীচে এসে থামলো। একজন ভদ্রলোক। ড্রইংরুমের বারান্দায় পায়চারি করছিলেন, গাড়িখানা থামতেই এগিয়ে এলেন। ভদ্রলোকের দেহে স্লিপিং গাউন, আংগুলের ফাঁকে দামী চুরুট। বনহুর গাড়ি থেকে নেমে আদাব জানালো।
ভদ্রলোকটিকে দেখে বনহুর বুঝতে পারলো, ইনিই পরিচালক আসলাম আলী চৌধুরী হবেন।
বনহুরের অনুমান মিথ্যা নয়। আসলাম আলী একজন সম্ভ্রান্ত বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখে করমর্দন করলেন, তারপর সঙ্গে করে ড্রইংরুমে নিয়ে বসালেন। অবশ্য কিছুটা যে তিনি বিস্মিত হননি তা নয়, কারণ এ ব্যক্তি তার সম্পূর্ণ অপরিচিত।
আসলাম আলী যখন আশ্চর্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন বনহুরের দিকে তখন বনহুর নিজকে সংযত করে নিয়ে বললো–আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্যই আমার আগমন। আমার নাম শামস ইরানী, আপনিই বুঝি–
জি হাঁ, আমি আসলাম আলী।
আমি সেই রকমই অনুমান করে নিয়েছিলাম। দেখুন, আমি যা বলবো বা বলতে এসেছি সে কথা হলো–আমি একটা ছবি করবো মনস্থ করেছি, আমার ছবির কাজ আগামী মাস থেকে শুরু করবো। ছবির নাম এখনও ঠিক করিনি তবে ছবির নাম ঠিক করবার পূর্বে ছবির পরিচালক ঠিক করে নিতে চাই।
‘স্বয়ংবরা’ ছবি রিলিজ পাবার পর আলী সাহেব এখন অবসরই আছেন, প্রায় একরকম বসে আছেন তিনি। অবশ্য অন্য ছবির চিন্তা তিনি করছেন। হঠাৎ নতুন একজন প্রযোজকের আগমনে আনন্দ বোধ করলেন। আলী সাহেব জানতেন, তার স্বয়ংবরা’ মুক্তি পাবার পর অমন কত প্রযোজকের আগমন হবে তাঁর বাড়িতে। মনে মনে খুশিই হলেন, আত্মগর্বে স্ফীত হয়ে উঠলো। তাঁর মুখমন্ডল। শামস ইরানীকে দেখেও তিনি এ রকমই একটা আন্দাজ করে নিয়েছিলেন।
বনহুর শান্ত-ধীর কণ্ঠে বললো এবার–আমার ছবির পরিচালক হিসাবে থাকবেন আপনি, এটাই আমি আশা করি। অবশ্য আপনি যা পারিশ্রমিক চাইবেন আমি তাতেই রাজি হতে পারবো।
আলী সাহেবের চোখ দুটো চক চক করে উঠলো, মাথার চুলে হাল্কাভাবে একটু হাত বুলিয়ে নিয়ে বললেন–এ তো আমার সৌভাগ্য মিঃ ইরানী। আমিও চাই নতুন প্রযোজক যারা চলচ্চিত্র জগতে নতুন আগমন করেছেন। কারণ আমি তাদের অর্থের প্রাচুর্য আরও বাড়িয়ে দিতে চাই, সৃষ্টি করতে চাই নতুন এক বিত্তশালী জগত। যারা কোনোদিন এ জগতে আসেননি বা আসতে সাহসী হননি তাদের মনের ভুল আমি ভেঙে দিতে চাই।
বনহুরের মুখে হাসির আভাস, মনোযোগ সহকারে শোনে সে আলী সাহেবের কথাগুলো। বলে বনহুর–হাঁ, আমিও এর পূর্বে অন্য ব্যবসা করতাম। বিদেশে আমার কয়েকটি ইডাস্ট্রী আছে। তবু আমার ইচ্ছা ছবি করবো।
বেশ তো, অন্যান্য ব্যবসার চেয়ে এ ব্যবসায়ে যথেষ্ট লাভবান হওয়া যায়। অবশ্য খুব চিন্তা করে ছবি তৈরি করলে তাতে পয়সা যেমন আসে সুনামও তেমনি পাওয়া যায়।
