কেশব আর ফুলমিয়া বনহুরের কথায় অবাক হলো প্রথমে, এই সাত সকালে সিনেমার টিকেট বিস্মিত হবার কথাই তো। কিন্তু বাবুর কথায় তারা কোনোরকম উক্তি উচ্চারণ করলো না। নতমুখে কিছু চিন্তা করছে দেখে পুনরায় বললো বনহুর–সকাল সকাল সিট বুক না করলে এসব শহরে ছবি দেখা মুস্কিল। সময়মত টিকেট পাওয়া যাবে না, তাই তিনখানা টিকেট কেটে এনে রাখবে।
এবার কেশব মাথা দোলালো–আচ্ছা।
গোটা দিন হোটেল থেকে আর বের হওয়া হলো না বনহুরের, সন্ধ্যার পূর্বে ফুলমিয়াকে বললো একটা ট্যাক্সি ডেকে আনতে।
ট্যাক্সি এলো।
বনহুর, কেশব আর ফুলমিয়াকে নিয়ে ট্যাক্সি পৌঁছলো মার্জিয়া হলের সম্মুখে। ট্যাক্সির মধ্য হতেই বনহুরের নজর গিয়ে পড়লো হলের সম্মুখস্থ পোষ্টারগুলোর উপর। নায়িকা শ্যামার পাশে নূরীর ছবিখানার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বনহুর।
কেশবের দৃষ্টি পোষ্টারে পতিত হতেই চমকে উঠলো সে, বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো-বাবু, এ ফুল–ফুলের ছবি?
হাঁ কেশব, ফুলই বটে।
বাবু!
কেশব চলো, পরে সব বলবো।
কেশব আর ফুলমিয়াসহ হলে প্রবেশ করলো বনহুর।
ছবি শুরু হতে এখনও কয়েক মিনিট বাকি–বনহুর, কেশব আর ফুলমিয়া এসে বসলো। অল্পক্ষণ পরই ছবি শুরু হলো। বহুরের বুকের মধ্যে আলোড়ন চলেছে, বিপুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে সে।
পর্দায় টাইটেল চলছে।
উন্মুখ হৃদয় নিয়ে দেখছে বনহুর। এই বুঝি নূরী নামটা এবার ভেসে উঠবে পর্দায়। নেমসিন শেষ হয়ে এলো কিন্তু নূরী’ অক্ষর দুটো তো ভেসে উঠলো না। ভড়কে গেলো বনহুর–তবে কি তার মনের ভ্ৰম, ভুল করেছে সে। নিশ্চয়ই ওটা অন্য কোনো মেয়ে হবে। চিত্রজগতে চিত্রতারকাদের তো অভাব নেই। বনহুরের মনটা হঠাৎ বিমর্ষতায় ভরে গেলো।
ছবি শুরু হলো, বনহুর আনমনে তাকিয়ে আছে, হঠাৎ পর্দায় তার আকাঙিক্ষত জনকে দেখে উন্মুখ হয়ে উঠলোনা না, ভুল তার হয়নি। এ যে তারই নূরী।
কেশব অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–বাবু, এ যে ফুল!
হাঁ কেশব, ফুলই বটে। চুপ করে দেখে যাও।
ছবি দেখা শেষ করে যখন বনহুর বেরিয়ে এলো বাইরে তখন কেশব চঞ্চল কণ্ঠে বললো– বাবু ফুল কি করে সিনেমায় এলো?
বনহুর বললো–আমিও তাই ভাবছি কেশব।
এরপর পথে আর কোনো কথা হলো না, হটেলে ফিরে বনহুর নিজ কামরায় গিয়ে সোফায় বসে পড়লো।
ফুলমিয়া আর কেশব যার-যার নিজ ক্যাবিনে আশ্রয় নিলো বটে কিন্তু কারো মনোভাব সচ্ছ ছিলো না। বনহুরের গম্ভীর হবার সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে পড়েছিলো কেশব, সে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলো না, যে ফুলকে তারা হারিয়েছিলো সেই সুদূর পর্বতের নির্জন বনভূমিতে কি করে তার আর্বিভাব হলো বোম্বের রূপালী পর্দায়?
কেশবের চেয়েও বেশি বিস্মিত এবং হতভম্ব হয়েছে ফুলমিয়া। ছবিগৃহে হঠাৎ কেশবকে অস্ফুট ধ্বনি করতে দেখে এবং আলম সাহেব আর কেশবকে অত্যন্ত ভাবাপন্ন হয়ে যেতে দেখে অবাক না হয়ে পারেনি সে। কিন্তু কাউকে কোনো প্রশ্ন করার সাহসও হয়নি তার।
বনহুর ছবি দেখার পর স্থির বিশ্বাসে এলো নূরীকে চিনতে তার ভুল হয়নি একটুও। নূরীকে এবার তার খুঁজে বের করতে মোটেই বিলম্ব হবে না।
পরদিন বনহুর সুন্দর দামী স্যুট পরে তৈরি হয়ে নিলো এবং মাথায় একটা ক্যাপ পরে নিলো। মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আর গোঁফ, চোখে চশমা। হাতে ব্যাগ আর ছড়ি। মাথায় চুলের পিছন দিকে এবং সামনের কয়েক গাছা চুলে পাক ধরেছে, দাড়ির মাঝেও দু’একটা সাদা মনে হচ্ছে।
ছদ্মবেশ ধারণ করে আয়নার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো বনহুর। এখন তাকে দেখলে পঁয়তাল্লিশের কম মনে হবে না। চেহারা এবং পোশাকে ধনবান ও আভিজাত্যের ছাপ ফুটে উঠেছে।
চশমাটা খুলে সম্পূর্ণ দেহটার দিকে একবার নিপুণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখে নিলো, তারপর হোটেলের পিছন সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো নিচে।
একটা ট্যাক্সি ডেকে চেপে বসলো-বোম্বে স্টুডিওতে চলো।
গাড়ি উল্কা বেগে ছুটতে শুরু করলো।
বোম্বে শহর।
তেল চকচকে পিচঢালা পথ।
অসংখ্য গাড়ির ভীড়ে বনহুরের গাড়িখানা অগ্রসর হচ্ছে। পিছন আসনে নিশ্চুপ বসে আছে। বনহুর,দক্ষিণ হস্তের আংগুলের ফাঁকে অগ্নিদগ্ধ সিগারেট। পাশেই রয়েছে ছোট্ট এ্যাটাচি ব্যাগটা। পথের দু’ধারে আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলোর দিকে তাকিয়ে সে গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছিলো। বড় বড় অট্টালিকার সম্মুখে দোকানপাট আর প্রায় মাঝে মাঝেই হোটেল ও রেষ্টুরেন্ট রয়েছে। ফলমূলের দোকানই যেন বেশি মনে হলো। এক্কা ঘোড়ার গাড়ি এবং দোতলা বাস প্রায়ই নজরে পড়তে লাগলো। তবে পথে বেশ শৃঙ্খলার সঙ্গে যানবাহন চলাচল করছে। পথের ঠিক মাঝখান। দিয়ে চলেছে যন্ত্রচালিত গাড়িগুলো। একপাশ কেটে চলেছে ঘোড়া গাড়ি এবং টউরে গাড়ি। রাজপথের দুপাশে ফুটপাত অসংখ্য লোকজন পায়ে হেঁটে চলাচল করছে এই ফুটপাত দিয়ে।
কর্মব্যস্ত জনমুখর বোম্বে নগরী।
বনহুর আপন মনে গভীর চিন্তায় মগ্ন।
বোম্বে আগমন করলেও বনহুর এখনও বোম্বে নগরীর সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হতে পারেনি, কারণ মাত্র দু’দিন হলো তারা এ শহরে এসেছে।
বেশ কিছুক্ষণ চলার পর দূরে সুউচ্চ একটা চূড়া নজরে পড়লো। অনেকগুলো দালান কোঠা ছাপিয়ে মাথাটা দেখাচ্ছে–মস্তবড় গম্বুজের মত দেখতে। আশে পাশে মন্দিরের চূড়ার মত আরও কতগুলি উচ্চচূড়া। বনহুর ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলো–ওটা কিসের গম্বুজ দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভার?
