শয্যায় শয়ন করে বনহুর সিগারেটের পর সিগারেট পান করে চললো। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো–কোথায় কেমনভাবে সন্ধান পাবে সে নূরীর।
বোম্বে শহর ছোটখাট নয়, তা ছাড়াও এ শহরটি বনহুরের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। প্রথমে এ শহরের প্রতিটি জায়গা তাকে বিশেষভাবে জেনে নিতে হবে। এলোমেলো কত কি চিন্তা আজ তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো–সব চেয়ে বেশি মনে পড়ছিলো নীহারের কথা, অবশ্য নীহারের কথা নিয়ে এখন ভেবে কোনো ফল হবে না যদিও।
বনহুর যতই নীহারের কথা বিস্মৃত হতে চেষ্টা করছিলো ততই যেন আরও গাঢ় হয়ে ভেসে উঠছিলো ওর মুখখানা মনের পর্দায়। কিছুতেই নিদ্রা আসছিলো না তার চোখে। শিয়রের টেবিলে এ্যাসট্রেটা অর্ধদগ্ধ সিগারেটে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটা সুমিষ্ট সুগন্ধযুক্ত ধুম্রকুন্ডলী সমস্ত কক্ষটাকে মোহময় করে তুলেছিলো। বনহুর মন থেকে নীহারের স্মৃতি মুছে ফেলতে চেষ্টা করলো–কিন্তু একি, একটি মুখ সরে যেতে না যেতে আর একটা মুখ তার মনকে আচ্ছন্ন করে তুলছিলো– শ্যালন, লুসি, মিস আরতী–আরও কত নির্মল পবিত্র মুখ–অনেক ফেলে-আসা স্মৃতিগুলো ভীষণভাবে আলোড়ন জাগালো তার হৃদয়মধ্যে। কত নারীই না তার জীবনপথে এসেছে কিন্তু কেউ তো জয় করতে পারেনি–পারেনি পদস্থলিত করতে। বনহুর নিজকে কঠিনভাবে সংযত রেখে সবার সঙ্গে সমানভাবে মিশেছে, স্নেহ-ভালবাসা-প্রেম-প্রীতিও দিয়েছে যতটুকু সে সক্ষম হয়েছে দিতে।
আজ কেন বার বার মনে পড়ছে সেইসব অবলা সরল সহজ তরুণীগুলোর মুখ, কেন যেন আজ সবাই এক সঙ্গে এসে তার মনের পর্দায় ভীড় জমাচ্ছে। তবে কি নূরীর আকর্ষণেই আজ তার মনে এ অস্থিরতা?
বনহুর অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রেতে গুঁজে রেখে উঠে মুক্ত জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। ঘুমন্ত বোম্বে নগরীর দিকে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ নয়নে, এই শহরেরই কোনো এক নিভৃত কোণে লুকিয়ে আছে তার নূরী। এখন কি করছে সে, হয়তো ঘুমিয়ে আছে নয় কোনো ছবির সুটিং নিয়ে ব্যস্ত আছে। জানে বনহুর স্টুডিও ফ্লোরে রাতেও সুটিং চলে কারণ সেও একদিন চলচ্চিত্র জগতে নায়কের অভিনয় করেছে। আজ সে সব কথা মনে করে হাসি পায় তার–দস্যু বনহুর হয়েছিলো। চিত্রনায়ক আর আজ নূরীও সেই জগতে গিয়ে পড়েছে কেমন করে কে জানে—হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো অদূরস্থ একটি লাইট পোষ্টের পাশে কোনো এক দেয়ালের গায়ে। চমকে উঠলো বনহুর, মস্তবড় একটা পোষ্টার দেয়ালের গায়ে আঁটা রয়েছে, পাশাপাশি দুটি নারী মুখ। একটি নারী অপরিচিত, আর একটি নূরীর ছবি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বনহুর বিচলিত হয়ে উঠলো, লাইট পোষ্টের উজ্জ্বল আলোতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলো।
বোম্বে শহরে প্রথম রাত বনহুরের কাটলো সম্পূর্ণ অনিদ্রায়। শয্যায় শয়ন করেও কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করতে পারলো না সে।
গোটা রাত অনিদ্রায় কাটিয়ে চোখ দুটো জ্বালা করছিলো আয়নার পাশে এসে দাঁড়ালো; নিজের উদভ্রান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজেই আঁতকে উঠলো। চোখ দুটো যেন জবা ফুলের মত লাল। হয়ে গেছে, সমস্ত মুখমন্ডলে ক্লান্তি আর অবসাদের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। বনহুর কিছুক্ষণ নিজের চেহারার দিকে নিশ্চুপ তাকিয়ে আংগুল দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নিলো। তারপর তোয়ালেটা। কাঁধে ফেলে প্রবেশ করলো বাথরুমে।
বাথরুম থেকে বের হলো যখন তখন অনেকটা সুস্থ আর সচ্ছ মনে হলো নিজেকে, চায়ের টেবিলে এসে বসতেই কেশব আর ফুলমিয়া এসে দাঁড়ালো।
বললো কেশব–বাবু, আমাদেরকে কি করতে হবে বলে দিন?
সম্মুখস্থ টেবিলে কলিং বেলটার উপরে চাপ দিতে দিতে বললো বনহুর–বসো, প্রথমে নাস্তা খেয়ে নাও তারপর কাজের কথা হবে।
কেশব আর ফুলমিয়া তাদের বাবুর সম্মুখে চেয়ারে বসতে ইতস্ততঃ করছিলো, বললো বনহুর– বসে পড়ো তোমরা।
ততক্ষণে হোটেলের বয় এসে দাঁড়ালো, খাঁটি উর্দু ভাষায় বললো–নাস্তা আনবো স্যার?
বনহুর বললো–হাঁ,নিয়ে এসো।
বয় চলে গেলো।
কেশব আর ফুলমিয়া আসন গ্রহণ করলো বটে কিন্তু কেমন যেন সঙ্কোচিতভাবে বসে রইলো।
নাস্তা এলো।
বনহুর দু’টি প্লেট ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো–নাও।
নাস্তা শেষে কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললো বনহুর–কেশব, একটা পেপার নিয়ে এসো, দেখো দেখি কোন হলে ‘স্বয়ংবরা’ ছবি চলছে।
কেশব উঠবার পূর্বেই ফুলমিয়া উঠে পড়ে; পা বাড়াতেই বলে উঠে বনহুর–কফিটা শেষ করে যাও, আর পয়সাও নিয়ে যাও বুঝলে?
কেশব বললো–কেন, আমিই তো যাচ্ছি।
ফুলমিয়া বললো–কেন, আমি থাকতে তুমি যাবে কেন? দিন পয়সা দিন—
হাত পাত্বে ফুলমিয়া বনহুরের সামনে।
বনহুর পয়সা দিলে চলে যায় ফুলমিয়া।
অল্পক্ষণ পরে সংবাদপত্র নিয়ে ফিরে আসে। বনহুর কাগজখানা চোখের সামনে মেলে ধরে এবং সিনেমা বিজ্ঞপ্তি গুলোর উপরে দ্রুত দৃষ্টি বুলিয়ে চলে।
হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি সংবাদপত্রের একস্থানে সীমাবদ্ধ হলো, স্বয়ংবরা’ ছবির বিজ্ঞপ্তি এটা। বনহুর দেখলো, ছবিখানা এখন বোম্বের কয়েকটি হলে একযোগে চলছে–মার্জিয়া, শ্যামশাহা, রূপনারায়ণ। বনহুর দশ টাকার দু’খানা নোট পকেট থেকে বের করে বললো কেশব, যাও মার্জিয়া সিনেমা হল থেকে স্বয়ংবরা’র জন্য তিনখানা টিকেট নিয়ে এসো গে।
