কেশব সামান্য কিছু আসবাবসহ এসে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে–বাবু, ফুলমিয়া আমাদের সঙ্গে যেতে চায়।
গভীর একটা চিন্তার অতলে তলিয়ে গিয়েছিলো বনহুর, কেশবের কথায় যেন সম্বিৎ ফিরে। আসে তার চোখ তুলে বলে- ফুলমিয়া আমাদের সঙ্গে যেতে চায়?
হা বাবু।
কিন্তু আমি কোথায় যাব নিজেই তো জানি না এখন।
কেশব কিছু বলবার পূর্বে পিছন থেকে সরে আসে ফুলমিয়া –দেখেন বাবু সাহেব, আমাকে আপনি নিয়া চলেন।
ফুলমিয়া, তুমি আমার সঙ্গে কোথায় যাবে?
যেখানে আপনি যান সেখানে যাবো। দুনিয়ায় আপনজন বলতে আমার কেউ নেই, আমি চিরদিন থাকবো আপনার সঙ্গে।
বনহুর কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে রইলো ফুলমিয়ার দিকে।
সেই অবসরে বললো কেশব–বাবু ওকে ছেড়ে যাবেন না। ফুলমিয়া আমাদের সঙ্গে থাকলে। ভালই হবে।
বেশ, আমার সঙ্গে কষ্ট যদি মাথা পেতে নিতে চাও তবে চলো। তবে হাঁ আমি কোনো সময় তোমাদের দূরে সরিয়ে দেবো না, যদি যাই আমিই যাবো।
ফুলমিয়া অতোশত বোঝে না। আলম যে তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হয়েছে এটাই তার বড় সৌভাগ্য। খুশি হলো ফুলমিয়া।
আবু সাঈদ বিদায় মুহূর্তে বনহুরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন –আলম, তোমাকে দেবার মত আমার কিছু নেই। তুমি যে উপকার করেছে তার মূল্য হয় না। আমার যথাসর্বস্ব দিলেও আমি তৃপ্তি পাবোনা। এই নাও এক লক্ষ টাকার একখানা চেক তোমাকে দিলাম–প্রয়োজন হতে পারে।
হাসলো বনহুর–চেকের কোনো প্রয়োজন হবে না স্যার। আপনার অন্তরে স্নেহ আর প্রীতির। কথা চিরদিন স্মরণ থাকবে। বনহুরের চোখ দুটো নিজের অজ্ঞাতে একবার ঝাপসা হয়ে এলো। বনহুর নিজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের পুটলিটা পিঠে তুলে নিয়ে অগ্রসর হলো।
কিছুদূর এগুতেই সম্মুখে এসে দাঁড়ালো নীহার ঝড়-বিধ্বস্ত ছিলতার মত বিষণ্ণভাবে।
বনহুর চমকে উঠলো–তুমি!
বললো নীহার–হাঁ আমি। আলম, ফুলমিয়াকে তুমি গ্রহণ করতে পারলে আর আমি তোমার কাছে এতোই তুচ্ছ? ফুলমিয়ার মত এতটুকু কপার পাত্রী নই কি আমি তোমার কাছে?
মেম সাহেব, আপনি শুধু ফুলমিয়া নয়, আমার চেয়ে আপনি অনেক অনেক ঊর্ধ্বে। আমার মত নগণ্যহীন ব্যক্তি আপনার মত মহৎপ্রাণ নারীর নাগাল পেতে পারে না। আপনি আমাকে মাফ করবেন মেম সাহেব–বনহুর কথা শেষ করে দ্রুত জাহাজ ত্যাগ করে নেমে গেলো।
বজ্রাহতের ন্যায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো নীহার।
আবু সাঈদ আজ ক’দিন কন্যার মনোভাব অনুভব করেছিলেন, তিনি যে একেবারে এসব জানতেন না তা নয়। কিন্তু নীহার যে আলমকে এতোখানি ভালোবেসে ফেলেছিলো আজ তিনি মর্মে মর্মে অনুভব করলেন। আলম আর নীহার যখন কথা বলছিলো আবু সাঈদ কন্যার পিছনে এসে দাঁড়ান,হাত রাখেন কন্যার কাঁধে-মা নীহার!
পিতার কোমল কণ্ঠ নীহারের মনের বাঁধ যেন ভেঙে দেয়, হঠাৎ উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠে সে দু’হাতে মুখ ঢেকে।
আবু সাঈদের চোখ দুটোও ভিজে উঠে, কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে, কন্যাকে সান্ত্বনা দিতে যান কিন্তু পারেন না, আলম যে তাঁর মনেও গভীরভাবে রেখাপাত করে গেছে, কোনো দিনই ওর কথা। ভুলতে পারবেন না আবু সাঈদ।
*
বোম্বে শহর।
যদিও এ শহরটা বনহুরের কাছে নতুন তবু সে এতটুকু বিচলিত হলো না। কেশব আর ফুলমিয়াসহ একটা হোটেলে আশ্রয় নিলো।
পাশাপাশি দুটো কামরা ভাড়া নিলো বনহুর নিজেদের জন্য। একটা কামরায় বনহুর স্বয়ং থাকবে আর একটিতে ফুলমিয়া ও কেশব।
বোম্বে পৌঁছেই দরকারী জিনিসপত্র কেনা-কাটা করে নিলো বনহুর নিজের হাতে। কি কিনলো না কিনলো সব জিনিসের সংবাদ রাখলো না কেশব আর ফুলমিয়া।
সবচেয়ে তার সর্বক্ষণের সাথী হলো নাসেরের সেই রিভলরখানা। যথেষ্ট গুলীও বনহুর সংগ্রহ করে নিয়েছিলো আবু সাঈদের নিকট হতে। বনহুর তাই নিশ্চিন্ত, চলাফেরা করতে তার কোনো অসুবিধাই হবে না।
যে হোটেলে বনহুর সঙ্গীদ্বয়সহ আশ্রয় নিয়েছিলো সে হোটেলটি বোম্বের নামকরা না হলেও খুব ছোট নয়। হোটেলটি বোম্বের ফুলাগু রোডের প্রায় শেষ প্রান্তে অবস্থিত ছিলো। রোডের নাম অনুসারেই হোটেলটার নাম করা হয়েছিলো ফুলাগু হোটেল।
ফুলাগু সুন্দর পরিচ্ছন্ন না হলেও মোটামুটি মন্দ নয়। হোটেলের মালিক একজন বার্মিজ। যদিও লোকটা বার্মিজ কিন্তু সে বহুকাল বোম্বে বাস করার দরুণ কথাবার্তা সব খাঁটি বোম্বাই ওয়ালাদের ভাষায় বলতো। ইংলিশও জানতো ভাল। ফুলাগু হোটেলের মালিকের নাম হলো ফাংফালিও।
বনহুর প্রথম সাক্ষাতেই ফাংফালিও এর অন্তরটা দেখে নিয়েছিলো, লোকটা মহৎ এবং ভদ্র তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রথম দিনই বেশ আলাপ জমে গেলো, খাঁটি ইংলিশে আলাপ আলোচনা হলো বনহুর আর ফাংফালিও এর মধ্যে।
স্বয়ং ফাংফালিও বনহুরের কামরা গুছিয়ে দিলো। বনহুরের আচরণে সেও যে খুব মুগ্ধ হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
নিজের ক্যাবিনে শয্যা গ্রহণ করে বনহুর আজ স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলো। সন্ধ্যার পরই খাওয়া-দাওয়া পর্ব চুকিয়ে নিয়েছিলো, কাজেই এখন বনহুর সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত।
হোটেলে এখনও লোকজন গমগম করছে, বিভিন্ন ক্যাবিন থেকে অবসর-বিনোদ যাত্রীদের হাসি-গল্পের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বনহুর কেশব আর ফুলমিয়াকে তাদের ক্যাবিনে শয়ন করার নির্দেশ দিয়ে নিজেও শয়ন করেছিলো এসে নিজের ক্যাবিনে।
