নীহারের প্রতি করুণায় ভরে উঠে বনহুরের মন। সুন্দর ললাটে চিন্তার ছাপ পড়ে, নিজকে সচ্ছ করে নেবার জন্য প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি। সংযোগ করে।
নীহার স্তব্ধ প্রতিমার মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে যাবার জন্য পা বাড়ায়।
বনহুর মুখ ফিরিয়ে একমুখ ধোয়া সম্মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বলে–শোন।
থমকে দাঁড়ায় নীহার, দৃষ্টি তখনও নত ছিলো ওর।
বনহুর সরে আসে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে, নীহারের নত মুখখানা তুলে ধরে–নীহার, কি হয়েছে তোমার?
চট করে কোনো জবাব দিতে পারে না নীহার শুধু চোখ দু’টো তুলে তাকায় বনহুরের দিকে।
বনহুর একটু হাসবার চেষ্টা করে বলে–তোমাকে কষ্ট দেবার জন্যই আমি এ জাহাজে এসেছিলাম, তাই না? নীহার, আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না তুমি?
হঠাৎ নীহার উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠে বনহুরের বুকে মুখ লুকায়, বলে সেনা না না, আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারবো না। কেন তুমি আমার মনকে এভাবে চুরি করে নিয়েছো? কেন তুমি এসেছিলে এ জাহাজে? কেন তুমি ডুবে মরে যাওনি সেদিন ঐ সাগরের জলে।
নীহার, ঠিকই বলেছো। সেদিন সাগরবক্ষে মৃত্যু হলে আমি বেঁচে যেতাম। কিন্তু অদৃষ্ট আমাকে সে সুযোগ দেয়নি আমি তাই আজও বেঁচে আছি–একটু নিশ্চুপ থেকে বলে বনহুর — নীহার, যদি বলো এই মুহূর্তে আমি সাগরবক্ষে নিজকে বিসর্জন দিতে পারি। বনহুর নীহারের হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে–তাহলে তুমি নিশ্চয়ই স্বস্তি পাবে।
নীহার পূর্বের ন্যায় নিশ্চুপ।
বনহুর নীহারের হাতখানা মুক্ত করে দিয়ে পিছন ডেকের দিকে এগিয়ে যায়, দক্ষিণ হস্তের সিগারেটটা ইতিপূর্বে নিক্ষেপ করেছিলো দূরে।
পিছনের নির্জন ডেকে এসে দাঁড়ালো বনহুর, বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে, মুখমন্ডল তার সচ্ছ-স্বাভাবিক।
নীহার এখনও ঠিক পূর্বের স্থানে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু দৃষ্টি তার চলে গেছে বনহুর যেখানে ডেকের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সেইখানে। মনের মধ্যে আলোড়ন চলেছে নাইবা পেলো ওকে, তা বলে মরবে ও! বেঁচে থাকুক, হয়তো আবার সে ফিরে আসবে একদিন। তবুতো মন জানবে, এ পৃথিবীর শামিয়ানার নিচেই যে আছে, যে পৃথিবীর তলায় আছে নীহার। যাকে ভালবাসা যায় তার অমঙ্গল চিন্তা করা যায় না, কি করে ওকে মৃত্যুর হীমশীতল কোলে নির্বাসন দেবে! তা হয় না, আলমকে মরতে দেবে না। আলমই যে তাদের রক্ষাকবচ, কি ভয়ঙ্কর মৃত্যু-বিভীষিকা থেকেই না সে তাদের বাঁচিয়েছে–একবার নয় কতবার। তার পিতার ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ অভিযান সার্থক হয়েছে, সেও ঐ ওরই জন্য। আর সে-ই কিনা মরবে, শুধু তাকে সুখী করার জন্য নিজকে বিসর্জন দেবে?
নীহার ক্ষণিকের জন্য ভেবে নিলো, তারপর দ্রুত ছুটে গিয়ে জাপটে ধরে ফেললো বনহুরকে–না না, মরতে তোমাকে দেবো না।
বনহুর গম্ভীর-স্থির কণ্ঠে বললো–কোনো লাভ হবে না আমি বেঁচে থাকলে তোমার।
জানি! কিন্তু বেঁচে থাকবে সেটাই যে হবে আমার পরম সান্ত্বনা!
নীহার!
না না, আর তুমি আমাকে নীহার বলে ডেকো না আলম। ঐ ডাক আমাকে পাগল করে তোলে, আমি–আমি হারিয়ে ফেলি নিজেকে।
তাহলে–
তুমি নাবিক, আমি মনিব কন্যা–কাজেই আমাকে–কণ্ঠ আটকে আসে নীহারের, অশ্রু ছলছল চোখ দুটো কেমন যেন তীক্ষ্ণ মনে হয়। মুহূর্ত দাঁড়ায় না আর নীহার সেখানে ছুটে চলে যায়।
বনহুর হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, একটা ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠে তার মুখে। আর কয়েক ঘন্টা আছে সে এ জাহাজে, তারপর এ জাহাজ থেকে বিদায় নিয়ে সে চলে যাবে, কোনো সম্বন্ধ আর থাকবে না এ জাহাজের কারো সঙ্গে। হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না, এদের স্মৃতি তলিয়ে যাবে কোন্ অতলে। তবে এ কথা সত্য পর্যটন জাহাজের প্রতিটি কথা তার মনে আঁকা হয়ে থাকবে চিরস্মরণীয় হয়ে।
ঐদিনের পর নীহারের সঙ্গে বনহুরের সাক্ষাৎ ঘটেছিলো একবার কিন্তু কোনো কথা হয়নি তাদের মধ্যে। শুধু নীরব দৃষ্টি বিনিময় ঘটেছিলো এই যা। বনহুর বেশ অনুভব করেছিলো– নীহারের ভিতরটা মোটেই সুস্থ বা স্বাভাবিক নয়। একটা অসহ্য জ্বালা ওকে দাহ করে চলেছে তা স্পষ্ট বোঝা যায় ওর মুখোভাবে।
*
জাহাজ বোম্বের অদূরে কারোইয়া বন্দরে পৌঁছলে নাবিক আলমকে বিদায় জানাতে সমবেত হলো জাহাজ ‘পর্যটন’ এর যাত্রীবৃন্দ। আজ আর আলমের কোনো শত্রু নেই এ জাহাজে। পর্যটনের মালিক আবু সাঈদ সাহেব হতে নাবিক এবং খালাসিগণ সবাই ব্যথা-কাতর অন্তর নিয়ে আলমকে বিদায় সম্ভাষণ জানাতে এগিয়ে এলো। জাহাজের প্রত্যেকেই ওকে বিদায় জানাতে গিয়ে নীরবে অশ্রু মুছলো।
বিদায়ের শেষ মুহূর্তে বনহুর অবাক হলো–সবাই যখন তাকে বিদায় জানাতে এলো তখন তাদের মধ্যে শুধু দেখতে পেলো না বনহুর আবু সাঈদ কন্যা নীহারকে।
বনহুরের অতৃপ্ত আঁখি দুটিও যেন অনন্ত পিপাসা নিয়ে খুঁজে ফিরছিলো একখানা ব্যথা-কাতর করুণমুখ। জাহাজ ‘পর্যটন থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে সে–আর কোনোদিন এ জাহাজে ফিরে আসবে কিনা জানা নেই। তাই বনহুর একবার জাহাজের প্রতিটি প্রাণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ কামনা করে। সহস্র ভীড়ের ফাঁকে একবার দেখতে চায় সেই মুখ খানাকে, যে মুখ তার মনকেও বিচলিত করে তুলেছিলো কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে। অন্তরের নিভৃত কোণে একটা তীব্র জ্বালা অনুভব করে, ঐ বিদায় যেন তার কাছে সম্পূর্ণ সচ্ছ মনে হয় না।
