বনহুর তার নিজের ক্যাবিনে ফিরে আসে, আজ কদিন হলো এ ক্যাবিন ত্যাগ করে সে উপরের ডেকে চলে গিয়েছিলো। নীরব-নির্জন কক্ষের শয্যায় এসে চীৎ হয়ে শুয়ে পড়লো বনহুর, গভীর চিন্তায় ডুবে গেলো সে।–নূরীর অন্তর্ধানের পর কেটে গেছে কয়েকটা দিন! ভেবেছিলো বনহুর, নূরীকে আর কোনোদিন সে খুঁজে পাবেনা, নিশ্চয়ই সে জংলীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে কিংবা কোনো জন্তু তাকে ভক্ষণ করে ফেলেছে। আজ সে সন্ধান পেয়েছেনূরীর মৃত্যু হয়নি–না না কোনো ভুল নেই, নূরীকে চিনতে তার এতোটুকু ভুল হবে না কোনোদিন। এক সঙ্গে তার কেটেছে শিশুকাল; কৈশোর জীবন, তারপর এখনও নূরী তাকে আবেষ্টনীর মত আঁকড়ে রেখেছিলো সর্বক্ষণ। কিন্তু নূরী কি করে বোম্বে গিয়ে হাজির হলো–শুধু তাই নয়, একেবারে চিত্রজগতে–
হঠাৎ শিয়রে কারো উপস্থিতি অনুভব করে বনহুর, পরক্ষণেই চুলে স্পর্শ একটি কমল হস্তের–আলম।
সম্বিৎ ফিরে আসে বনহুরের, উঠে না বসে যেমন শুয়েছিলো তেমনি থাকে, শুধু চোখ দুটি তুলে ধরে নীহারের মুখে, কোনো জবাব দেয় না।
বনহুর তখন চলে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নীহারও বেরিয়ে এসেছিলো এবং সন্তর্পণে অনুসরণ করছিলো তাকে।
বনহুর সোজা তার পূর্বের ক্যাবিনে ফিরে এসে দাঁড়ালো ঠিক তার ক্যাবিনের মেঝেতে। অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো, লক্ষ্য করলো–আলম টেলিভিশনে সেই চিত্র তারকার এ্যাডভারটাইজমেন্ট দেখার পর হতে সম্পূর্ণ যেন পাল্টে গেছে। নীহার বনহুরের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো–আলম, সত্যি করে বলো ঐ মেয়েটি তোমার কে?
বনহুর দৃষ্টি নীহারের মুখ থেকে ফিরিয়ে তাকালো ক্যাবিনের লাইটের উজ্জ্বল আলোর দিকে– আমার সঙ্গিনী?
তোমার স্ত্রী?
অস্ফুট কন্ঠে বললো বনহুর হাঁ।
বনহুরের চুল থেকে নীহারের হাতখানা সরে আসে, চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে–আলম, একটা চিত্রতারকা তোমার স্ত্রী!
নীহার উঠে দাঁড়াতেই বনহুর শয্যায় বসে পড়লো অবাক হয়ে তাকালো সে ওর মুখের দিকে। নীহারের হঠাৎ এমন বিস্ময়কর কণ্ঠস্বরে কম আশ্চর্য হয়নি বনহুর।
নীহার গম্ভীর কণ্ঠে বললো–চিত্রতারকাগণ কোনোদিন সতীসাধ্বী মেয়ে হতে পারে না, কারণ নানারকম পুরুষের সঙ্গে তাদের মিশতে হয়, নানাভাবে মন যুগিয়ে চলতে হয় তাদের–
মুহূর্তে বনহুরের মুখমন্ডল রক্তাভ হয়ে উঠে, চক্ষুদ্বয় হতে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হয়, কঠিন কণ্ঠে চিৎকার করে উঠে–নীহার?
বনহুরের অগ্নিমূর্তি নীহারকে স্তব্ধ করে দেয়, কিছুক্ষণ কোনো কথা তার মুখ দিয়ে বের হয় না। ধীরে ধীরে নীহারের চোখ দুটো নত হয়ে আসে, বলে সে আমাকে ক্ষমা করো আলম।
নীহার বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াতেই বনহুর ডাক দেয়-নীহার যেও না।
দাঁড়িয়ে পড়ে নীহার।
বনহুর নীহারের কাঁধে হাত রাখেনীহার, আমার বুকের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠেছে, আমি পারছি না কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে–বনহুর ছুটে গিয়ে বিছানায় উবু হয়ে শুয়ে পড়ে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠে ছোট্ট বালকের মত।
নীহার ওকে ত্যাগ করে চলে যেতে পারে না, সেও এসে বসে বনহুরের পাশে, মাথায় হাত বুলিয়ে বলে–আলম, তুমি শান্ত হও। শান্ত হও, কেঁদো না, কেঁদো না তুমি–
নীহার!
আলম! আলম, কেঁদো না–শান্ত হও। নীহার আজ অবাক না হয়ে পারে না, যে আলমকে সে লোহার মতই কঠিন সংযমী পুরুষ বলে জানে, আজ সে ভুল যেন ভেঙে যায়। আলমের চোখের পানি তার চোখেও অশ্রুর বন্যা এনে দেয়।
এক সময় শান্ত হয়ে আসে বনহুর, নীহারের কোমল হস্তের স্পর্শ তার দেহ-মনে সান্ত্বনা-এনে দেয়। কখন ঘুমিয়ে পড়ে সে, নীহার তখনও ওর চুলের ফাঁকে আংগুল চালনা করে চলেছে।
বনহুরের মাথাটা বালিশের উপর ঠিক করে শুইয়ে দিয়ে দেহে চাদরখানা টেনে দেয়, তারপর বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে।
পরদিন জাহাজ ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ ত্যাগ করার পূর্বে বনহুর আবু সাঈদের নিকটে এসে বললো–স্যার, আমাকে বোম্বে যেতে হবে।
বেশ তো, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে।
বললেন আবু সাঈদ। জাহাজ ছাড়ার পূর্বে বনহুর নিজে নাবিকের ড্রেসে সজ্জিত হয়ে ইঞ্জিন-কক্ষে প্রবেশ করলো।
জাহাজ ‘পর্যটন’ এবার রওয়ানা দিলো বোম্বে অভিমুখে।
২.১৬ আস্তানায় দস্যু বনহুর
ঘর্মাক্ত দেহে কালি মাখা অবস্থায় বনহুর ইঞ্জিন-কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। বোম্বে পৌঁছতে আর মাত্র একটি দিন বাকি। বনহুর অধৈর্য হয়ে উঠেছে–শুধু নূরীর সাক্ষাৎ কামনাই তার বাসনা নয়, নূরীকে চলচ্চিত্র জগৎ থেকে সরিয়ে আনাই তার উদ্দেশ্য।
নির্জন ডেকে দাঁড়িয়ে ভাবছে নানা কথা।
এমন সময় নীহার এসে দাঁড়ালো তার পাশে। বনহুর ওর দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হলো, কেমন যেন বিষাদময় করুণ চেহারা। এলোমেলো চুল, প্রসাধনবিহীন মুখমন্ডল। চোখেমুখে যেন একটা উদাস ভাব পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে তার। এ ক’দিন নীহারের সাক্ষালাভ ঘটেনি একটিবারের জন্যও। বনহুর সহসা কোনো কথা বলতে পারলো না। নীহারের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো, তাকালো সম্মুখস্থ সীমাহীন জলরাশির দিকে। বনহুর অন্তর দিয়ে এ ক’দিন উপলব্ধি করেছে নীহার তাকে কতখানি ভালবেসে ফেলেছিলো। যদিও সে ওকে কোনো সময় এ ব্যাপারে উৎসাহ দেখায়নি বা প্রশ্রয় দেয়নি তবুও নীহারের মনটা যে সম্পূর্ণরূপে তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে সহজভাবেই অনুভব করেছে সে। অবশ্য আজ শুধু নয়, এমনিভাবে আরও কতদিন কত নারীর মনে সে নিজের অজ্ঞাতে রেখাপাত করেছে যার জন্য বনহুর কিছুমাত্র দায়ী বা অপরাধী নয়।
