নীহার অংগুরী পরিয়ে দেয়, মৃদু মৃদু হাসে বনহুর।
*
ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ ত্যাগ করবার পূর্বে আবু সাঈদ একটা আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করলেন! নানারকম গান-বাজনা এবং খাওয়া-দাওয়া হবে। খালাসি হতে নাবিক এবং পর্যটকগণ সবাই এ। উৎসবে যোগদান করবেন।
পর্যটনের যাত্রীগণের মনে আনন্দ আর ধরে না। আবু সাঈদের সবচেয়ে বেশি আনন্দ–তার এ যাত্রা জয়যুক্ত হয়েছে। সার্থক হয়েছে আলমকে পাওয়া। আবু সাঈদ আলমের কাছে সর্বতোভাবে কৃতজ্ঞ। শুধু আবু সাঈদই নন, জাহাজের প্রত্যেকটা ব্যক্তি বনহুরের সঙ্গে করমর্দন করে নিজকে ধন্য মনে করতে লাগলো। সবাই অন্তর দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে লাগলো তাকে।
আনন্দ-উৎসব শুরু হলো।
‘পর্যটনে’ যে যা গান-বাজনা জানেন তিনি তাই পরিবেশন করলেন। নীহারও গীটার বাজিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করলো।
নানারকম গান-বাজনা চলেছে।
বিকেল থেকে শুরু হয়েছে উৎসব, সন্ধ্যায় উৎসব শেষ হবে।
যে ক্যাবিনে আনন্দ-উৎসব চলেছে ঐ ক্যাবিনটা ছিলো সবচেয়ে বড় এবং প্রশস্ত। এই ক্যাবিনে নানারকম বাদ্যযন্ত্র এবং খেলাধুলোর সরঞ্জাম সাজানো ছিলো। তাছাড়াও আছে রেডিও এবং টেলিভিশন সেট।
নানারকম অশান্তি আর উত্তেজনায় এ ক’দিন কারো টেলিভিশন দেখা সম্ভব হয়ে উঠেনি। আজ সবাই মনস্থ করেছে, উৎসব-শেষে সবাই টেলিভিশন দেখবেন। কারণ আজ তারা নিশ্চিন্ত, উৎসব এবং খাওয়া-দাওয়া-পর্ব শেষ হলেই ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ ত্যাগ করবে জাহাজ ‘পর্যটন’। কারণ আবু সাঈদের কাজ শেষ হয়েছে।
আনন্দোচ্ছাসে জাহাজ-মধ্যে খুশির উৎস বয়ে চললো। কয়েকজন নাবিক নানারকম বাজনা বাজিয়ে শোনালো। কেউ বা গান গাইলো, কেউ বা নাচ দেখালো। ক্যাবিনের চারদিকে সোফায় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ বসে আছেন। আবু সাঈদের পাশেই বসেছে নীহার আর আলম। নাসেরও আছে তাদের পাশে। আর অন্যান্য চারদিকে ভিড় জমিয়ে দেখছে।
নানারকম হাসি-তামাশা আর গান-বাজনার মধ্যে একসময় শেষ হলো জাহাজ ‘পর্যটনের’ আনন্দ-উৎসব।
খাওয়া-দাওয়া-পর্ব শেষ হলো।
অল্পক্ষণ পরেই টেলিভিশন প্রোগ্রাম শুরু হলো।
আবু সাঈদ এবার সোফায় হেলান দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে সিগারেট ধরালেন।
ক্যাবিনের মধ্যে সকলেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো টেলিভিশনে।
পবিত্র কোরান তেলাওয়াতের পর শুরু হলো এডভারটাইজমেন্ট। বিভিন্ন কোম্পানীর প্রচারপত্রসহ নানারকম ছবি দেখানো আরম্ভ হলো। ব্যাঙ্ক লিমিটেড কোম্পানী থেকে শুরু করে কটন স্পিনিং এবং সিনেমা বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত।
বনহুর অন্যমনস্কভাবে কিছু চিন্তা করছিলো, হয়তো গত রাতের ঘটনাটাই ভাবছিলো সে, দৃষ্টি ছিলো তার টেলিভিশন সেটে। এবার ‘স্বয়ংবরা’ ছায়াছবির এডভারটাইজমেন্ট দেখানো হচ্ছে।
প্রডাকশান, প্রডিউসার ও পরিচালকের নামসহ স্বয়ংবরা ছবির বিজ্ঞপ্তি ভেসে উঠলো টেলিভিশনের পর্দায়। ছবির দু’একটি বিশেষ আকর্ষণীয় দৃশ্যও দেখান শুরু হলো। হঠাৎ চমকে উঠলো বনহুর, দ্রুত সোজা হয়ে বসে অস্কুটধ্বনি করে উঠলো– নূরী।
নিস্তব্ধ কক্ষে বনহুরের কণ্ঠস্বরে সবাই তার দিকে ফিরে তাকালো।
নীহার অবাক হয়ে বললো-আলম, তুমি ওকে চেনো নাকি?
টেলিভিশনে তখন স্বয়ংবরা’ ছবিতে নূতন পার্শ্বনায়িকা নূরীকে স্থিরচিত্রে দেখানো হচ্ছিলো। ভীবালার বেশে নূরী দাঁড়িয়ে আছে। যদিও নূরী হাসছে কিন্তু বনহুরের দৃষ্টিতে সে দেখলো, ওর বিষাদময় করুণ রূপ, চোখেমুখে তার উদ্বিগ্নতার ছাপ। বনহুর সম্বিৎহারার মত আসন ত্যাগ করে ছুটে গিয়ে টেলিভিশন সেট দু’হাত চেপে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো, কিন্তু ততক্ষণে স্বয়ংবরার এ্যাডভারটাইজমেন্ট শেষ হয়ে গেছে।
আলমের এই অদ্ভুত কান্ড দেখে ক্যাবিনস্থ সবাই অবাক হয়ে গেলো। বিস্মিত হলেন আবু সাঈদ। নীহার হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
বনহুর এবার বিষণ্ণ মনে উঠে দাঁড়ালো টেলিভিশন সেট ত্যাগ করে। ফিরে এসে আপন আসনে বসে পড়লো ধপ করে, চোখেমুখে ফুটে উঠেছে এক ব্যাকুলতার ছাপ।
আবু সাঈদ আগ্রহ কণ্ঠে বললেন–আলম, হঠাৎ তুমি এভাবে–কথা শেষ করলেন না তিনি।
নীহারও উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের দিকে।
ক্যাবিনের সকলের দৃষ্টিই তখন বনহুরকে লক্ষ্য করছে, যদিও তাদের দৃষ্টি মাঝে মাঝে চলে যাচ্ছিলো টেলিভিশনে। সকলের মনেই প্রশ্ন–ব্যাপার কি?
আবু সাঈদের কথায় বললো বনহুর–স্যার, ঐ মেয়েটি আমার আত্মীয়া।
বিস্ময়-ভরা কণ্ঠে বললেন আবু সাঈদ–তোমার আত্মীয়া?
হাঁ, বেশ কিছুদিন পূর্বে জঙ্গলে–ঢাকা এক অজানা পর্বতে সে হারিয়ে গিয়েছিলো–আনমনা। হয়ে যায় বনহুর। এবার তাকে অত্যন্ত গম্ভীর চিন্তাযুক্ত মনে হয়।
টেলিভিশনে তখন চীনা-নৃত্যের দৃশ্য শুরু হয়েছে। কতকগুলো চীনা যুবতী তাদের দেশীয় নৃত্য পরিবেশন করছিলো। ক্যাবিনের প্রায় সকলেই চীনা-নৃত্যে আত্মমগ্ন হয়ে পড়লেন, বনহুর সেই ফাঁকে ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে গেলো।
আবু সাঈদও এই অদ্ভুত নৃত্যে মনোযোগী হয়ে পড়েছেন।
কিন্তু নীহারের দৃষ্টি কোনো সময় আলমের মুখমন্ডল ছাড়া টেলিভিশনের পর্দায় আকৃষ্ট হলো না। বনহুর বেরিয়ে যেতেই নীহার আলগোছে আসন ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলো বাইরে।
ভাগ্যিস ক্যাবিনে কেশব ছিলো না তাই রক্ষা, তাহলে নূরীর ছবি টেলিভিশনে দেখে সে ব্যাকুল হয়ে উঠতো। সে কোনো কাজে তখন ক্যাবিনের বাইরে গিয়েছিলো।
