নীহার ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলো, কোনো কথা তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছিলো না। থরথর করে কাঁপছিলো সে পিতাকে আঁকড়ে ধরে।
কিন্তু যেই দন্ডে জাহাজ একেবারে স্থির হয়ে পড়লো তখন আবু সাঈদ নিজের রিভলভারখানা নিয়ে দ্রুত বের হতে যাচ্ছিলেন ঠিক ঐ সময় তার ক্যাবিনের দরজায় আঘাত পড়ে।
চমকে উঠেন আবু সাঈদ, তবে কি জীবটা এবার তার দরজায় এসে হানা দিলো? দরজা খুলে বের না হয়ে তিনি এক পাশে দাঁড়িয়ে রিভলভার উদ্যত করে ধরলেন।
সেই সময় পুনরায় দরজায় আঘাত হলো এবং শোনা গেলো বনহুরের কণ্ঠস্বর–স্যার, দরজা খুলুন। দরজা খুলুন–
আবু সাঈদ দরজা খুলবার পূর্বেই তাঁর পাশে দন্ডায়মান নীহার দ্রুতহস্তে দরজা খুলে দেয়, চোখেমুখে তার ফুটে উঠে আনন্দোচ্ছাস।
বনহুর কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে।
নীহার ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর বুকে–আলম। আলম–
আবু সাঈদও কম খুশি হননি, এতোক্ষণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন–আলম আর জীবিত নেই। আবু সাঈদ নিজেও বনহুরকে বুকে আঁকড়ে ধরলেন।
ক্যাবিন-মধ্যে আরও অনেকে ছিলো, সবাই বনহুরকে ঘিরে ধরে নানারকম প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চললো।
বনহুর শান্ত কন্ঠে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। কিন্তু জীবটা এখনও জীবিত আছে না তার মৃত্যু ঘটেছে বলতে পারলো না। তবে যতদূর সম্ভব জীবটা নিহতই হয়েছে বলে মনে করছে সে, কারণ পর-পর কয়েকটা গুলীই জীবটার মাথায় গিয়ে বিদ্ধ হয়েছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এসব ব্যাপার নিয়ে আলোচনার মধ্যেই একসময় পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে এলো। এমন একটা ভয়ঙ্কর ঘটনার পর কেউ আর ঘুমাতে পারেনি।
ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই জাহাজের ক্যাবিন থেকে বের হয়ে এলো। বনহুর, আবু সাঈদ, কেশব আর নীহার সবার আগে, পিছনে অন্যান্যে। জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াতেই একজন খালাসি ছুটে এলো পিছন ডেকের দিক হতে।
সবাই তাকালো খালাসিটার দিকে।
হাঁপাচ্ছে খালাসি বেচারী, দু’চোখ ছানাবড়ার মত বড় হয়ে উঠেছে। বারবার ভয়-কাতর দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে পিছন ডেকের দিকে, কিছু যেন বলতে চাইছে কিন্তু সহসা বলতে পারছে না, কণ্ঠ যেন আড়ষ্ট হয়ে গেছে তার।
আবু সাঈদ বললেন–কি হয়েছে বলো? কোনো ভয় নেই এখন আর।
খালাসি লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বললো–ঐদিকে গিয়ে দেখুন স্যার জাহাজের গায়ে–আর বলতে পারলো না সে।
আবু সাঈদ বললেন–চলো দেখি আলম কি ব্যাপার।
বনহুর এবং অন্যান্য আবু সাঈদকে অনুসরণ করলো। জাহাজের পিছন দিকে এসে সাগরবক্ষে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই সকলেরই চক্ষুস্থির হলো, কারো মুখে যেন কথা বের হলো না সহসা। বনহুর আর আবু সাঈদ উভয়ে একবার তাকালো উভয়ের দিকে, বনহুর বুঝতে পারলো, রাত্রির অন্ধকারে তার একটি গুলীও বিফলে যায়নি।
তালবৃক্ষের মত মোটা বিরাট এক অজগর সাপ মৃত অবস্থায় জাহাজের গায়ে ভেসে রয়েছে। লম্বায় কত হাত হবে বলা মুস্কিল দেহটা গাছের গুঁড়ির মত মোটা আর কয়লার মত কালো।
নীহার ভয়ে চেপে ধরলো পিতাকে, দুরু দুরু কাঁপছে তার দেহটা।
আবু সাঈদ বললেন–মা, সব ভয় দূর হয়ে গেছে। শুধু ভয়ই দূর হয়নি নীহার, আজ ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের সবকিছু রহস্যই উঘাটিত হয়েছে। এই সর্পরাজেরই কণ্ঠের তীব্র হুইসেলধ্বনি। এতোদিন আমরা শ্রবণ করে এসেছি। এপথে যতগুলো জাহাজ গেছে তারা সবাই এই শব্দ শুনতে পেয়েছিলো এবং যত নাবিক বা জাহাজের আরোহিগণ ফৌজিন্দিয়া দ্বীপে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে তাদের প্রায় ব্যক্তিই এই সর্পরাজের উদরে প্রবেশ করেছে। আজ সেই নরখাদক সর্পরাজের জীবন নাশ ঘটেছে। ফৌজিন্দিয়া দ্বীপে আজ আর কোনো ভয় রইলো না। থামলেন আবু সাঈদ, ফিরে দাঁড়ালেন তিনি বনহুরের দিকে, পিঠে হাত রেখে বললেন–এ সবের কৃতিত্বের মূলে হলো আলম। আলম শুধু ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের আলোক-রহস্যই উদঘাটন করেনি, সে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের। তীব্র হুইসেলধ্বনিও চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছে। আর কেউ এ শব্দ পাবে না এবং কাউকে আর এভাবে জীবন বিসর্জন দিতে হবে না।
জাহাজের সাবই আনন্দধ্বনি করে উঠলো। সবাই বনহুরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো যেন। নাসের এবং জলিলের দল সবাই এসে তাকে মোবারকবাদ জানাতে লাগলো।
আবু সাঈদ এবার সর্পরাজের কতকগুলো ফটো গ্রহণের জন্য ফটোগ্রাফারকে আদেশ দিলেন। সেদিনটা সর্পরাজের দেখা এবং ফটো তোলা নিয়েই ব্যস্ত রইলো সবাই। তারপর বিশ্রাম এবং আনন্দ-উৎসব।
নীহার এক সময় নিজে এসে বনহুরকে অভিনন্দন জানালো। নিজের হাতের একটি অংগুরী খুলে পরিয়ে দিতে গেলো সে ওর আঙ্গুলে। কিন্তু বাধা দিয়ে বললো বনহুর–নীহার, তোমার পিতার উপহার আমি সানন্দে গ্রহণ করেছি, কিন্তু তোমার অংগুরী আমি গ্রহণে অক্ষম।
নীহারের মুখ গম্ভীর হলো, অভিমান-ভরা কণ্ঠে বললো–কেন? আমি কি তোমার কাছে। এতোই হেয়?
বনহুর নীহারের হাত মুঠায় চেপে ধরলো–নীহার, তোমার তুলনায় আমি অতি নগণ্য, তাই তোমার অংগুরী গ্রহণ আমার সাজে না, আমি নাবিক ছাড়া কিছুই নই–
নীহার বনহুরের মুখে হাতচাপা দিলো, একথা আমি তোমার মুখে আরও কতবার শুনেছি। কিন্তু আলম, আমি জানি তুমি নাবিক নও–
নীহার!
আমার আংটি তোমাকে গ্রহণ করতেই হবে।
যদি খুশি হও তাহলে দাও।
আলম! নীহার অস্ফুট আনন্দধ্বনি করে উঠে, বনহুরের হাতখানা হাতে তুলে নিয়ে নিজের আংগুল থেকে একটি আংটি খুলে নিয়ে পরিয়ে দেয় বনহুরের হাতের আংগুলে।
