কিন্তু অজস্র ভয়ার্ত কণ্ঠস্বরের মধ্যে তলিয়ে যায় কেশবের কণ্ঠস্বর। কেশব কারো কোনো বাধা না শুনে ছুটে যায় আবু সাঈদের ক্যাবিনে, হাউ মাউ করে কেঁদে বলে–স্যার, বাবু নেই, আমার বাবু নেই, বাবু নেই স্যার…
আবু সাঈদ এবং নীহার কথাটা শুনে বজ্রাহতের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে যান।
আবু সাঈদ বলে উঠলেন–কেশব, এ তুমি কি বলছো? আলম ক্যাবিনে নেই?
না না স্যার, বাবু ক্যাবিনে নেই।
তবে কোথায় গেলো?
নীহার হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো দু’হাতে মুখ চেপে ধরে–আলম, শেষ অবধি তোমার অদৃষ্টে এই ছিলো…আব্বা তুমি ওকে খুঁজে দেখো আব্বা…
কিন্তু কার সাহস আছে ঐ মুহূর্তে ক্যাবিন ত্যাগ করে বাইরে যায়। কেশব বাইরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো কিন্তু আবু সাঈদের আদেশে অন্যান্য লোক তাকে ধরে ফেললো। কেশব ক্যাবিনের দেয়ালে মাথা ঠুকে বিলাপ করে চললো।
এদিকে জাহাজ তখন একটা মোচার খোলার মতই দুলছে। না জানি কোন মুহূর্তে তলিয়ে যাবে। প্রত্যেকটা ক্যাবিনে আর্ত-কোলাহল, মৃত্যু ভয়ে সবাই উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।
বনহুর তখন উদ্যত রিভলভারহস্তে সন্তর্পণে অন্ধকারে এগুচ্ছে, যেদিকে জাহাজখানা সম্পূর্ণভাবে কাৎ হয়ে রয়েছে ঐ দিকে সে আজ দেখতে চায়, জীবটা কি এবং কেমন দেখতে। দুর্দান্ত সাহস আর মনোবল নিয়ে সে অগ্রসর হচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে তার মৃত্যু ঘটতে পারে।
বনহুর আজ নাবিক আলম নয়–সে দস্যু বনহুর।
তার মধ্যে জেগে উঠেছে ভয়ঙ্কর প্রাণ। সে প্রাণে নেই ভয়-ভীতি বা কোনো আতঙ্কের ছাপ। এই দন্ডে যদি কেউ বনহুরের আসল রূপ দেখতো নিশ্চয়ই সে স্তম্ভিত হয়ে যেতো। কঠিন হয়ে উঠেছে তার মুখমন্ডল, চোখ দুটি দিয়ে যেন অগ্নিশিখা নির্গত হচ্ছে। নাসিকাতে দ্রুত নিশ্বাস পতনের শব্দ হচ্ছে যেমন পশুরাজ শিকারের সন্ধান পেয়ে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে ঠিক তেমনি। বনহুর ক্ষিপ্তের ন্যায় চঞ্চল হয়ে উঠেছে, আজ সে দেখবে জীবটা কি।
অত্যন্ত সাবধানে জাহাজের ক্যাবিনের কোল ঘেষে কখনও বা উবু হয়ে মাথা নিচু করে বনহুর এসে পড়লো পিছন ডেকে অন্ধকারময় এক স্থানে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলো, কারণ এইস্থানে তিন পাশে বিভিন্ন ক্যাবিনের দেয়াল–সম্মুখভাগ খোলা, কাজেই ঐ স্থানে দাঁড়ালে জাহাজের প্রায় সম্পূর্ণ ডেকে নজর পড়ে অথচ তাকে সহসা পিছন থেকে কেউ আক্রমণে সক্ষম হয় না। বনহুর এই স্থানে দাঁড়িয়ে তাকালো সম্মুখস্থ সাগরবক্ষে। হঠাৎ বিস্ময়ে চমকে উঠলো, সঙ্গে সঙ্গে ক্যাবিনের সঙ্গে ঠেশ দিয়ে মিশে দাঁড়ালো, দেখতে পেলো বনহুর-তার নিকট হতে অনেকটা দূরে খোলা ডেকের উপরে অন্ধকারে একটা জমকালো গাছের গুঁড়ির মত কি যেন গড়াচ্ছে। ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখলো, সেই গাছের গুঁড়ি অর্ধেকটা এখনও সাগরবক্ষে ডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে। দুটো টর্চলাইটের মত কি যেন জ্বলছে গুঁড়িটার অগ্রভাগে।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে রিভলভার থেকে গুলী ছুঁড়লো ঠিক ঐ টর্চলাইটের মত জ্বলন্ত বল দুটি লক্ষ্য করে। পর-পর কয়েকটা গুলী সে এক সঙ্গে করে বসলো নিশ্বাস বন্ধ করে। ভুলে গেল বনহুর নিজের অস্তিত্ব, বিস্মৃত হয়ে গেছে সে সমস্ত দুনিয়াটাকে। বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করেছে। ঐ ভয়ঙ্কর জীবটাকে।
বনহুরের রিভলভারের পর পর গুলীর আঘাত খেয়ে জীবটা তীব্র হুইসেলধ্বনির মত কানফাটা আওয়াজ করে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো ভীষণ এক তান্ডবলীলা। জাহাজখানা সাইক্লোন ঝড়ের মুখে মোচার খোলার মত দোল খেতে লাগলো। পর মুহূর্তে জীবটা গড়িয়ে পড়লো সাগরবক্ষে।
এবার সাগরের জলের মধ্যে শুরু হলো সেকি সাংঘাতিক তোলপাড়! জাহাজ ডুবু ডুবু অবস্থা, সমস্ত জাহাজ আর্তনাদ আর কোলাহলে ভরে উঠেছে। আর বুঝি রক্ষা নেই, এই বুঝি শেষ!
বনহুর একটা থাম ধরে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, সমস্ত দেহ তার জলের ঝাপটায় ভিজে উঠেছে। চুল, জামা-কাপড় সব একাকার হয়ে গেছে। দক্ষিণ হস্তে এখনও তার রিভলভার বুঝতে বাকি নেই বনহুরের গুলী খেয়ে জীবটার চরম অবস্থা হয়েছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সাগরবক্ষের প্রচন্ড আলোড়ন ক্রমান্বয়ে স্থির হয়ে এলো। সাগরে জলোচ্ছাস শান্ত হওয়ার সঙ্গে জাহাজখানাও যেন শান্ত হয়ে আসছে আস্তে আস্তে। আশ্বস্ত হলো বনহুর, এতোক্ষণে যেন সম্বিৎ ফিরে এলো তার। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রুমাল দিয়ে চোখমুখের পানি মুছে ফেললো।
জাহাজ শান্ত হবার সঙ্গে সঙ্গেই জাহাজের ক্যাবিন-মধ্যের ভয়ার্ত আর্ত চিৎকার থেমে এলো, তবে মৃদু গুঞ্জন থামলো না। ক্যাবিন-মধ্যে নানারকম ভয়-বিহ্বল আলোচনা চলছে তীব্রভাবে। কিন্তু কারো সাহস হচ্ছে না বাইরে বেরিয়ে আসে।
আবু সাঈদের মত অভিজ্ঞ এবং দুঃসাহসী পর্যটক পর্যন্ত আজ একেবারে হকচকিয়ে গেছেন, তিনি কি করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না যেন। আলমই যে আজ ঐ ভয়ঙ্কর জীবটার খোরাক হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ ছিলো না আবু সাঈদের। নীহারও পিতার মনোভাব বুঝতে পেরে কেঁদে-কেটে আকুল হয়েছে, কিন্তু ভয় আর দুর্ভাবনাই তাকে বেশি উদভ্রান্ত করে তুলেছে, এবার আর বুঝি রক্ষা নেই কারো।
হঠাৎ রিভলভারের পর-পর আওয়াজ শোনার পর আবু সাঈদ কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না কোথায় থেকে এ গুলীর শব্দ আসছে। পরক্ষণেই শুরু হয়েছিলো সাইক্লোন ঝড়ের মত ভীষণ অবস্থা। আবু সাঈদ সব ভুলে কন্যাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন বুকের মধ্যে–মা, আর বুঝি রক্ষা পেলাম না আমরা। এবার সাগরবক্ষে জাহাজডুবি হয়ে সবাই মরবো।
