বনহুর বললো–স্যার, আপনি যা বললেন সেই কথা সম্পূর্ণ সত্য। আমারও ঐ রকমই মনে। হয়েছিলো।
হাঁ, ঠিক তাই; ঐ মৃতদেহগুলো নোনা গ্যাসের দ্বারা মমি আকারে শক্ত হয়ে গেছে এবং পাশের ধসে-পড়া কক্ষে যে আলোর বেলুনগুলো আলমের দৃষ্টিগোচর হয়েছিলো সেগুলোই আমরা ঐ ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের বুকে জাহাজ থেকে দেখে থাকি।
একজন বিজ্ঞ পর্যটক বলে উঠলেন–মিঃ সাঈদ, ঐ আলোগুলো সম্বন্ধে আপনার কি মনে হয়?
আবু সাঈদ বললেন–ঐ আলোর বেলুন সম্বন্ধে এখন আমি নিশ্চিন্ত। ঐ আলোগুলো কোনো আত্মা বা আলোকরশ্মি নয়।
তবে কি? বললো এবার নীহার।
বললেন আবু সাঈদ–আলেয়ার আলো!
আলেয়ার আলো? অবাক কণ্ঠে বললো নীহার পুনরায়।
হাঁ, বহু জীবজন্তু মাটির নিচে চাপা পড়ায় একরকম গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে, সে গ্যাস থেকে ঐ অস্পর্শীয় আলোর সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশেও মাঝে মাঝে শ্মশান বা করবস্থানে ঐ রকম আলো দেখা গিয়ে থাকে, তার নাম–আলেয়ার আলো।
ক্যাবিন-মধ্যে একটা সাফল্যজনক আনন্দধ্বনি ফুটে উঠলো। আবু সাঈদ বললেন–এবার আমরা ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের আলোর রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছি। এখন বাকি রইলো সেই তীব্র হুইসেলধ্বনির রহস্য উদঘাটন … একটু থেমে বললেন তিনি পুনরায়–জানি না সে রহস্য ভেদ করা আমাদের সম্ভব হবে কিনা। আমি সত্যি দুঃখিত এবং অনুতপ্ত কারণ ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের রহস্য ভেদ করতে গিয়ে আজ পর্যন্ত আমাদের জাহাজের অনেকেই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন…বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো তার কণ্ঠস্বর।
সেদিনের মত আর কোনো আলাপ-আলোচনা হলো না। রাত গম্ভীর হয়ে এসেছে বলে যে যার ক্যাবিনে চলে গেলো। সাবধানতা এবং সতর্কতার সঙ্গেই সবাই নিজ নিজ ক্যাবিনে গিয়ে আশ্রয় নিলো অবশ্য জাহাজের উপরের ক্যাবিনগুলোতেই সকলের জন্য ব্যবস্থা ছিলো।
সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে এবং অনেক রাত অবধি নিদ্রা জাগরণে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিদ্রিত হয়ে পড়লো। কয়েকজন পাহারাদার অবশ্য পাহারার কারণে জাগ্রত রইলো, কিন্তু তারা ক্যাবিনের বাইরে বের হওয়ার সাহসী হলো না।
বনহুর আর কেশবের বিশ্রামের জন্য আবু সাঈদের পাশের ক্যাবিনের ব্যবস্থা ছিলো। কেশব আর বনহুর শয্যা গ্রহণ করলো।
নিদ্রা-কাতুরে কেশব অল্পক্ষণেই নিদ্রাদেবীর কোলে ঢলে পড়লো। জেগে রইলো বনহুর, চোখে তার নিদ্রা নেই। ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের আলোক-রহস্য উদঘাটিত হয়েছে বটে কিন্তু ঐ তীব্র হুইসেলের শব্দ-রহস্য এখনও ভেদ করা সম্ভব হয়নি। তবে শব্দটা যে কোনো এক ভয়ঙ্কর জীবের তাতে কোনো ভুল নেই এবং সেই জীবটাই তাদের জাহাজে বার বার আক্রমণ চালিয়ে কয়েকজনকে গলধঃকরণ করেছে।
বনহুর শয্যায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলো, এই রহস্যটা ভেদ না হওয়া পর্যন্ত তারা নিশ্চিন্ত। নয়। কি সে জীব? সামান্য একটুখানি দেখবার সুযোগ পেয়েছিলো সে অতি অস্পষ্টভাবে, কি ভয়ঙ্কর জমকালো–ঠিক গাছের গুঁড়ির মত মোটা এবং মস্ত লম্বা বলেই মনে হয়েছিলো। অক্টোপাশ মনে করেছিলো সে প্রথমে, কিন্তু অক্টোপাশ নয় বুঝতে পেরেছে। কি সে জীব হতে। পারে? গভীরভাবে বনহুর চিন্তা করতে লাগলো।
এমন সময় জাহাজটা যেন দুলছে বলে মনে হলো। বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে শয্যা ত্যাগ করলো, বালিশের তলা হতে রিভলভারটা টেনে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ঠিক ঐ জীবটা পুনরায় জাহাজে উঠে আসছে বলে সন্দেহ হলো তার। সতর্কভাবে তাকালো ক্যাবিনে কেশবই শুধু নয়, আরও কয়েকজন লোকও ঐ ক্যাবিনে নিদ্রিত রয়েছে। বনহুর লঘুপদে বেরিয়ে এলো ক্যাবিন হতে। বাইরে দাঁড়িয়ে ক্যাবিনের দরজা বন্ধ করে দিলো ভালভাবে।
চারিদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অন্ধকারে এগুতে লাগলো বনহুর, যেদিক বেশ কিছুক্ষণ পূর্বে বিরাট লম্বা দেহী জীবটা অন্তর্হিত হয়েছিলো।
সমস্ত জাহাজখানা নিস্তব্ধ, নীবর-নিঝুম। জনপ্রাণী জাহাজের ডেকে কেউ নেই। প্রায় সকলেই নিদ্রিত, যারা জেগে আছে তারাও কেউ বাইরে নেই।
জাহাজখানা এতোক্ষণ বেশ দুলছিলো, এখন হঠাৎ এক দিকে খানিকটা কাৎ হয়ে গেলো আচমকা। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ক্যাবিন থেকে ভেসে এলো নিদ্রাজড়িত আর্তনাদ। ভয়ার্তকরুণ গুঞ্জনধ্বনি। ক্যাবিন মধ্যে এ-ওর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, নিদ্রা ছুটে গেলো মুহূর্তে সকলের চোখ হতে।
জেগে উঠলেন আবু সাঈদ, নীহারের ঘুমও ভেঙে গেলে সঙ্গে সঙ্গে। আবু সাঈদ আশঙ্কা ভরা কণ্ঠে বললেন–সর্বনাশ হয়েছে, আবার সেই নরখাদক ভয়ঙ্কর জীব হানা দিয়েছে আমাদের জাহাজে–এখন উপায়?
নীহার কম্পিতকণ্ঠে বললো–আব্বা, আমার বড্ড ভয় হচ্ছে। তখন জলিলকে খেয়েছে, এখন কাকে খাবে কে জানে। হায়, একি হলো আব্বা, আলম আর কেশবকে ছেড়ে দেওয়া তোমার উচিত হয়নি।
মা তাই তো দেখছি, আমি মস্তবড় ভুল করেছি।
বিভিন্ন ক্যাবিন থেকে তখন আর্ত কোলাহল ভেসে আসছে। জাহাজখানা কাৎ হয়ে গেছে। একপাশে, না জানি কখন সাগরবক্ষে নিমজ্জিত হবে কে জানে।
ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে আবু সাঈদ আর নীহারের মুখমন্ডল।
পাশের ক্যাবিনে কেশব আর অন্যান্য নাবিকও জেগে উঠেছে; সবাই ঈশ্বরের নাম স্মরণ করছে।
হঠাৎ কেশবের হুশ হয়, বাবু কোথায়? তার বাবু…কেশব বনহুরের বিছানা শূন্য দেখেই হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে। চিৎকার করে ডাক দেয়–বাবু–বাবু–বাবু…
