আবু সাঈদ যেন স্বয়ং বিচারক।
গম্ভীর মুখে তিনি সব শুনে যাচ্ছেন, ক্ষণে ক্ষণে তার মধ্যে ভাবের পরিবর্তন আসছে, ফুলমিয়ার কথাগুলো তিনি মনোযোগ সহকারে শুনছেন।
বলে চলেছে ফুলমিয়া স্যার, জলিল সর্দার যখন ঠিক আপনার ক্যাবিনের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন আমিও কিছুটা দূরে একটা থামের আড়ালে এসে লুকিয়ে পড়ি। ছোরাখানা বের করে নেই হাতে, যেমনি জলিল সর্দার পিস্তল লক্ষ্য করবে তখনি আমি কাজ শেষ করবো। কিন্তু স্যার, কি বলবো গা আমার কাঁপছে। জলিল সর্দারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ দেখি–জাহাজের গা বেয়ে উঠে এলো গাছের গুঁড়ির মত জমকালো একটা লম্বামত কি যেন। সেই ভয়ঙ্কর জীব, সঙ্গে সঙ্গে জাহাজখানা কাৎ হয়ে গেলো এক পাশে। আমি হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম কিন্তু আমার চোখ দুটো জলিল সর্দারের দিকেই রয়েছে। গাছের গুঁড়ির মত জীবটা জলিল সর্দারকে তুলে নিলো টপ। করে। আমার কানে এলো জলিল সর্দারের করুণ আর্তনাদ, আমি কি দেখলাম, সে কি ভয়ঙ্কর…
এবার নাসের এবং জলিলের দলবল ভয়ে বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো। তাহলে জলিল আর আমাদের জাহাজে নেই? সে ঐ ভয়ঙ্কর জীবটার উদরে চলে গেছে। এই তো কয়েকমিনিট পূর্বে সে তার কাছ থেকে পিস্তলটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। আলমকে হত্যা করা তার হলো না। জলিলের মত একটা পালোয়ান লোকের এই চরম পরিণতি! নাসের হঠাৎ ছুটে গিয়ে বনহুরের হাত দু’খানা চেপে ধরলো–ভাই আলম, আমাকে মাফ করে দাও; আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। সত্যি আমি বড় অকৃতজ্ঞ, না হলে তোমার মত একজন গুণীব্যক্তিকে হত্যার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠতাম। আজ আমার দিব্যদৃষ্টি খুলে গেছে, দেখলাম কারো সর্বনাশ করতে চাইলেই করা যায় না, বরং তারই পাল্টা সর্বনাশ ঘটে বসে। জলিল সর্দারই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। বন্ধু, বলো আমাকে ক্ষমা করেছো?
বনহুর হেসে বললো–নাসের সাহেব, আপনি আমার কাছে কোনো দিনই অপরাধী নন। নিজেকে নিজেই ক্ষমা করে নিন, তাহলেই দেখবেন আপনি সচ্ছ হয়ে এসেছেন।
বনহুরের শান্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠস্বরে সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
নাসের অপরাধীর মত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, আজ সে নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্তই নয়, লজ্জিত-ব্যথিতও।
জলিলের লাঠিয়ালদের মাথাও নত হয়ে গেলো। সকলের মুখেই লজ্জা,ক্ষোভ আর অনুতাপের ছাপ ফুটে উঠেছে। সর্দারের নির্মম মৃত্যু তাদের মনকে যেন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। সাহসী শম্বু জন্ধুও ঠিক হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেছে। কারো মুখে কোনো কথা সরছে না।
ফুলমিয়ার মুখ দীপ্ত উজ্জ্বল, বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।
সবচেয়ে নীহার বিস্মিতা স্তম্ভিতা, নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে সে নাবিক আলমের দিকে। ওকে যতই সে দেখছে ততই যেন গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে, সমস্ত অন্তর দিয়ে অভিনন্দন জানাতে ইচ্ছা করছে তার।
আবু সাঈদ বললেন–এবার–আলম, হঠাৎ এমন একটা ঘটনা ঘটে গেলো যার জন্য নিতান্ত প্রয়োজনীয় কথাগুলো শেষ না করেই আমরা অন্যমনস্ক হতে বাধ্য হয়েছিলাম। অন্যান্যের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন–আপনারা বসুন; দ্বীপের ভূগর্ভে যে রহস্য আলম উদঘাটন করেছে তা এখনও সম্পূর্ণ ব্যক্ত করা হয়নি।
ক্যাবিনস্থ সকলে আসন গ্রহণ করলেন।
বনহুরও বসলো আবু সাঈদের পাশে।
আবু সাঈদ কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন–বহুকাল পূর্বে সাগরতলে ধ্বসে-পড়া ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ যে এককালে বিরাট একটি শহর ছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আশ্চর্য, বহুদিন এইসব বাড়ি-ঘর, দালান-কোঠা গভীর জলের নিচে ডুবন্ত অবস্থায় থেকে আবার জেগে উঠেছে। দ্বীপ আকারে। অনেক দিন শহরটা সাগরতলে নিমজ্জিত থাকায় শ্যাওলা, বালি, কাদা এবং নোনা মাটির স্তর পড়ে গেছে। কাজেই বাড়ি-ঘরের ধ্বংসস্তূপের উপরে দেখলে বোঝা মুস্কিল যে, এখানে এককালে কোনো শহর বা বাড়ি-ঘর কিংবা ঐ ধরনের কিছু ছিলো। থামলেন আবু সাঈদ, তিনি নতুন মানুষ নন, অভিজ্ঞ পর্যটক এবং ভূতত্ববিদ। আলমের কাছে সম্পূর্ণ ঘটনাটা শোনার পর তিনি সব কিছু বুঝতে পেরেছেন। তিনি পুনরায় বলতে শুরু করলেন–আলম যে লাশগুলো ঐ ভগ্নস্তূপের মধ্যে দেখেছে, আশ্চর্য আজও সেই শত শত বছর পূর্বের লাশ অবকৃত অবস্থায় রয়েছে। এর বিশেষ কারণ আছে যার জন্য লাশগুলো আজও পঁচে নষ্ট হয়ে যায়নি।
ক্যাবিনের মধ্যস্থ ব্যক্তিগণ সকলেই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে শুনছেন, কারো মুখে কোনো কথা নেই।
বলছেন আবু সাঈদ–শত শত বছর গভীর সাগরতলে শহরটা নিমজ্জিত ছিলো বটে কিন্তু ঐ ভগ্নস্তূপের সব স্থানেই সাগর-জল প্রবেশে সক্ষম হয়নি। তার প্রমাণ হলো, আলম সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করে যে ধসে-পড়া কক্ষগুলো চোখে দেখে এসেছে, ঐ কক্ষগুলো গভীর জল-মধ্যে নিমগ্ন হলেও ওগুলোতে সাগরের নোনা জল প্রবেশ করেনি, কিন্তু সাগরের জলের যে একটা তীব্র নোনা স্বাদ আছে তারই গ্যাস বদ্ধ ধ্বংসপ্রাপ্ত কক্ষমধ্যেও প্ররেশ করেছে। সেই তীব্র নোনা গ্যাসের জন্য মৃতদেহগুলো গলে পঁচে যায়নি। নোনা জিনিসে যেমন কোনো বস্তু অতি শীঘ্র নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু নোনা গ্যাসের দ্বারা যে-কোনো জীবের মৃতদেহ যুগ যুগ ধরে সংরক্ষণ করাও সম্ভব হয়। এখন আমরা বুঝতে পারছি, ঐ ভূগর্ভস্থ কক্ষমধ্যে মৃতদেহগুলো কেন আজও অবিকৃত রয়েছে।
