ফুলমিয়াকে আবু সাঈদ একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো কারণ সে এখনও ঠক্ ঠক করে কাঁপছিলো।
বনহুর বললো–স্যার, অত্যন্ত ভয়াবহ সংবাদ। আমার মনে হয় আজও কাউকে সেই অদ্ভুত জীবটা ভক্ষণ করে সাগরগর্ভে অন্তর্হিত হয়েছে।
অবাক কণ্ঠে বললেন আবু সাঈদ–সর্বনাশ ঘটেছে! আমারও ঐ রকম সন্দেহ হচ্ছিলো। কারণ জাহাজটা কাৎ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকারের শব্দ আমাদের কানে এসেছিলো। কিন্তু আশ্চর্য, আর্তনাদের আওয়াজটা ঠিক আমার ক্যাবিনের পিছন থেকেই ভেসে এসেছিলো বলে মনে হয়েছিলো।
ফুলমিয়া বলে উঠে–স্যার, আপনি যদি অভয় দেন তাহলে আমি যা জানি এবং দেখেছি সব খুলে বলবো।
ফুলমিয়ার কথায় আবু সাঈদ বিস্মিত হলেন, তিনিই শুধু নন, অন্যান্যেও অবাক হলো তার হেঁয়ালিপূর্ণ কথা শুনে। বনহুরও আশ্চর্য হয়ে গেলো–কি বলতে চায় ফুলমিয়া!
আবু সাঈদ বললেন–ভয়ের কোনো কারণ নেই, তুমি নির্ভয়ে বলো।
ফুলমিয়া নাসেরের দিকে এবং তার নিজের দলবলের মুখের দিকে একবার সন্দিহানভাবে তাকিয়ে নিয়ে বললো–আমি সব সত্য কথা বলবে এবং সত্য কথা বলার পর আমার মৃত্যু ঘটবে…ছোট স্যার এবং আমার দলবল আমাকে হত্যা করবে স্যার!
নাসেরের এবং লাঠিয়াল দলের মুখে একটা অদ্ভুত ভাব ফুটে উঠলো। ফুলমিয়ার কথা তারাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
কক্ষস্থ সকলে একবার ফুলমিয়া এবং নাসের ও লাঠিয়াল দলের উপর দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো, সকলেই ফুলমিয়ার কথার মানে বুঝে উঠতে পারছিলো না।
নীহার এবং বনহুর নিশ্চুপ শুনছিলো।
বললেন আবু সাঈদ-ফুলমিয়া, তুমি যা বলতে চাও স্পষ্ট করে বলো। তারপর তুমি যদি নিহত বা নিরুদ্দেশ হও তাহলে আমি কাউকে ক্ষমা করবো না। সে যাই হোক আমি সমুচিত শাস্তি দেবো।
তখনও ক্যাবিন-মধ্যে কারো বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি।
ফুলমিয়া বলবার পূর্বে আবার একবার নাসের এবং লাঠিয়াল দলের দিকে তাকিয়ে দেখে নেয়, বলে সে–স্যার, প্রথমে একটি কথা জেনে রাখবেন, নাসের সাহেব এবং আমার দলবল মানে আমাদের সর্দার জলিল মিয়া ও তার সাঙ্গপাঙ্গ–এরা সবাই আলম সাহেবকে মন্দ চোখে দেখে। তাকে হত্যা করার জন্য ওদের অত্যন্ত আগ্রহ। বিশেষ করে নাসের সাহেবই এদের এ ব্যাপারে উৎসাহ…
গর্জন করে উঠে এবার নাসের, কারণ এতোক্ষণে সে ফুলমিয়ার মনোভাব স্পষ্ট উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।
নাসের হুঙ্কার ছাড়তেই আবু সাঈদ বজ্রকঠিন কণ্ঠে বলে উঠেন–চুপ করে শুনে যাও নাসের, কোনো রকম গন্ডগোল করলে আমি নিজ হস্তে গুলী চালাবো।
নীহার ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো নাসেরের দিকে।
ফুলমিয়ার এবার সাহস হলো, সে আলমকে হত্যা-ব্যাপার নিয়ে হেডনাবিক মকবুলের হত্যা এবং জাহাজের ইঞ্জিনে আলমকে নিষ্পেষিত করে তাকে হত্যা করার চেষ্টা আরও পর পর। আলমকে নিহত করার জন্য নাসেরের কার্যাবলি সব সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বললো।
নাসের, এবং শম্ভু, জম্বু রাগে ফুলতে লাগলো হিংস্র জন্তুর মত; কিন্তু তারা টু শব্দটি করতে সাহসী হচ্ছে না, কারণ স্বয়ং আবু সাঈদ এবং তাঁর প্রতিটি অন্তরঙ্গ বন্ধুবান্ধব সকলেই উপস্থিত এ ক্যাবিনে। তাছাড়া স্বয়ং আলম রয়েছে সেই স্থানে, জানে ওরা আলমের শক্তির পরিচয়। আলমের হস্তে এখনও গুলীভরা রিভলভার–ক্যাবিনের উজ্জ্বল আলোতে চক্ করছে। নাসের এবং শয়তানের দল বাধ্য হয়েই দাঁড়িয়ে রইলো খাঁচার বন্দী ধূর্ত শিয়ালের মত।
ফুলমিয়া সব বললো, আলমকে হত্যার জন্য সিঁড়ির মুখ নষ্ট করে দিয়েছিলো ঐ নাসেরের যুক্তিতে জলিলের দল এবং আলমকে বাঁচাতে যেয়েই সে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিলো সাগরগর্ভে। কিন্তু মহান হৃদয় আলম তাকে মৃত্যুর কবল থেকেও বাঁচিয়ে নিয়েছে।
সব শুনে নীহার ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত ফোঁস্ ফেস্ করতে লাগলো। তখনই নাসেরকে জীবন্ত সাগরবক্ষে নিক্ষেপ করার জন্য পিতাকে অনুরোধ জানাতে লাগলো।
কিন্তু আলমের মুখ সচ্ছ-স্বাভাবিক, সে আজ কথাগুলো নিজ কানে নতুন করে শুনলেও বহু। পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলো, নাসের এবং জলিলের দল তাকে হত্যা করতে চায়। বনহুর বুঝেও নীরব ছিলো, কোনোদিন সে বলেনি বা জানায়নি কারো কাছে। আজ শুনে সে বিন্দুমাত্র বিস্মিত হলো না। নীরবে শুনে যেতে লাগলো ফুলমিয়ার কথাগুলো।
নীহার শুধু অবাকই হচ্ছে না, প্রত্যেকটি ছবি ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। কি ভয়ঙ্কর হৃদয়হীন জানোয়ার এই শয়তান নাসের। নীহারের মুখ কঠিন রক্তাভ হয়ে উঠেছে, এই দন্ডে সে যেন নাসের এবং জলিলের দলকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।
ফুলমিয়া সমস্ত ঘটনা একটির পর একটি ব্যক্ত করে চলেছে। এবার শুরু করে আজকের ঘটনা। নাসেরের কাছে জলিল একশত স্বর্ণমুদ্রার লোভে আজ এই মৃত্যুভয়ঙ্কর রাত্রির অন্ধকারে আত্নগোপন করে কিভাবে সে এসেছিলো নির্দোষ নিষ্পাপ আলম সাহেবকে হত্যা করতে, কিভাবে সে গোপনে সব জেনে নিয়ে জলিলের পিছু নিয়েছিলো, কি ভাবে একখানা সুতীক্ষ্ণ ধার ছোরা লুকিয়ে নিয়েছিলো কাপড়ের মধ্যে। জলিল যখন আলম সাহেবকে গুলী ছুঁড়তে যাবে ঠিক তখন। তার পিঠে ছুরিখানা বসিয়ে দেবে ভেবেছিলো কিন্তু সে ভাগ্য তার হলো না। ফুলমিয়া কাপড়ের তলা থেকে ছোরাখানা বের করে আবু সাঈদের সম্মুখে টেবিলে রাখে।
কক্ষমধ্যে কারো মুখে কথা নেই। আবু সাঈদের ক্যাবিন যেন বিচারকের আদালত কক্ষ বনে গেছে। সবাই ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে শুনে চলেছেন। আসামীর মত মুখ চুন করে বিবর্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে নাসের ও তাদের দলবল।
