জলিলের নিকট হতে কিছুটা দূরে একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে রুদ্ধ নিশ্বাসে সুযোগের অপেক্ষা করছে ফুলমিয়া। জলিলকে আজ সে খতম না করে ছাড়বে না, অন্ধকারে ফুলমিয়ার চোখ দুটো যেন জ্বলছে, তার সঙ্গে জ্বলছে তার হস্তস্থিত সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরাখানা।
ঠিক ঐ সময় নিশ্চিন্ত স্বাভাবিকভাবে বলে চলে বনহুর–একটি নয়–তাকিয়ে দেখলাম সেই অন্ধকারময় গহ্বরে আরও কয়েকটি আলোর বেলুন কেউ যেন অদৃশ্য হস্তে নাড়াচাড়া করছে, আমি মুহূর্ত বিলম্ব না করে গুলী ছুঁড়লাম আলোর বেলুন লক্ষ্য করে–কিন্তু আশ্চর্য! আলো যেমন ভেসে বেড়াচ্ছিলো তেমনি বেড়াতে লাগলো। আরও অবাক হলাম, কোনোটা জ্বলছে আবার নিভে যাচ্ছে আলগোছে…
আমি আর বিলম্ব না করে দ্রুত বেরিয়ে এলাম বাইরে। অবশ্য আরও থাকবার এবং দেখবার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু আমার অক্সিজেন নিঃশেষ হয়ে আসছিলো, কাজেই আর দেরি করা সমীচীন মনে করিনি।
বললেন আবু সাঈদ–আর বিলম্ব করা তোমার মোটেই উচিত হতো না আলম, কারণ জাহাজে ফিরবার সময় হয়ে এসেছিলো, তাছাড়াও আমরা সবাই তোমার জন্য অত্যন্ত অস্থির বোধ করছিলাম। কিন্তু তুমি যে রহস্যময় কথাগুলো বললে তা সত্যিই বিস্ময়কর। শত শত বছর পূর্বের ধসে-পড়া ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আজও মনুষ্য-মৃতদেহ কি করে এভাবে থাকতে পারে?
বনহুর বললো–ঠিক আমার মনেও ঐ প্রশ্ন জেগেছিলো স্যার…
বনহুরের কথা শেষ হয় না, জাহাজখানা হঠাৎ একপাশে হুমড়ি খেয়ে কাৎ হয়ে যায়, পরক্ষণেই আবু সাঈদের ক্যাবিনের ঠিক পিছন হতে ভেসে আসে তীব্র আর্তনাদ।
ক্যাবিনের মধ্যে সবাই এ-ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে আচমকা, কেউ কেউ মেঝেতে লুটোপুটি খায়। কেউ বা দেয়াল ধরে কোনোরকমে সামলে নেয় নিজকে। জাহাজের প্রত্যেকটা ক্যাবিনের মধ্যে একই অবস্থা।
এই বুঝি জাহাজখানা কাৎ হয়ে তলিয়ে যাবে সাগরবক্ষে। প্রত্যেকটা ক্যাবিন-মধ্যে ভয়ার্ত আর্তনাদের গুঞ্জনধ্বনি জেগে উঠে।
সেই তীব্র মর্মভেদী আর্তনাদ হঠাৎ ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তখনই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। জাহাজ থেকে বিরাট কিছু সাগরবক্ষে পতনের শব্দ হলো। মনে হলো, কোনো একটা গাছের গুঁড়ি যেন জাহাজ থেকে সাগরের গভীর জলে গড়িয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে জাহাজখানা একটা ঝুঁকি খেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এবার ভীষণভাবে দুলছে জাহাজ পর্যটন। মনে হচ্ছে সাগরের জলে প্রচন্ড ঢেউ-এর সৃষ্টি হয়েছে, তারই আঘাতে দোল খাচ্ছে জাহাজখানা।
কিছুক্ষণ ক্যাবিনে কারো মুখে কথা সরলো না।
বিভিন্ন ক্যাবিন থেকে তখনও ভয়ার্ত আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছিলো। বনহুর কোনোরকম দ্বিধা দ্বন্দ্ব না করে দ্রুত বেরিয়ে গেলো ক্যাবিন থেকে, আবু সাঈদ বা নীহার কিছু বলবার আগেই চলে গেলো সে। তার নিকটেই ছিলো রিভলভার, রিভলভার নিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে অগ্রসর হলো।
বাইরে বেরিয়ে আসতেই ডেকের ঝাপসা আলোতে দেখলো–কে একজন ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো তাকে।
বনহুর বললো–কে তুমি?
হাঁপাচ্ছে লোকটা, বললো–বাবু বাবু, আমি ফুলমিয়া…
ফুলমিয়া ভালভাবে তাকিয়ে দেখলো, ফুলমিয়া বলির পাঠার মত থরথর করে কাঁপছে। তার মুখ যেন মরার মত ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। ভয়ার্তভাবে দেখাচ্ছে সে–বাবু, ঐদিকে দেখুন– ঐ যে ঐ দিকে…সাগরবক্ষে অন্ধকারে কি যেন দেখাচ্ছে ফুলমিয়া।
বনহুর হঠাৎ কিছু বুঝতে না পেরে দ্রুত ডেকের ধারে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগলো। গভীর জলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আড়ষ্ট হলো বনহুর, জমাট অন্ধকারে তালগাছের গুঁড়ির মত বিরাট লম্বা কিছু নজরে পড়লো, ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে তালগাছের মত লম্বা জিনিসটা। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্যই তার দৃষ্টিতে পড়েছিলো। বনহুর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, কালো লম্বা জিনিসটা সাগরবক্ষে অদৃশ্য হতেই ফিরে তাকালো ফুলমিয়ার দিকে।
ফুলমিয়া তখনও কাঁপছিলো ঠক্ ঠক করে।
অল্পক্ষণেই আবু সাঈদ, কেশব আরও কয়েকজন এসে হাজির হলেন জাহাজের ডেকে। সকলেরই চোখেমুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ। প্রত্যেকের হস্তে রাইফেল এবং রিভলভার।
আবু সাঈদের হস্তে রিভলভার, তিনি বললেন–কি ঘটলো আলম? কি হয়েছে?
বনহুর কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ফুলমিয়া বাধা দিয়ে বলে উঠে–স্যার, এখানে আর একদন্ড থাকবেন না, চলুন ক্যাবিনে চলুন, সব আমি বলবো…।
আবু সাঈদ এবং অন্যান্যে ফুলমিয়াকে ভয়-বিহ্বলভাবে কথা বলতে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেছেন, তেমনি আশঙ্কিত হয়েছেন–না জানি কি দুর্ঘটনা আজ ঘটেছে!
ততক্ষণে নাসের এবং জলিলের দলের লোকজনও ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটে আসে, ঘিরে দাঁড়ায় সবাই ফুলমিয়া আর আলমকে। কিন্তু জলিল কোথায়, নাসের জলিলের অন্বেষণে চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকায়। অনেক সন্ধান করেও নাসের জলিলকে দেখতে পায় না। অবাক হয় নাসের মনে মনে, জলিল যাকে হত্যা করতে এসেছে সেই আলম সুস্থ-সবল দেহে দাঁড়িয়ে আছে, আর সে উধাও হয়েছে। তবে কি ঐ আর্তনাদের শব্দটা জলিলের কণ্ঠের…নাসের হতভম্ব হয়ে যায়।
ফুলমিয়ার ভয়ার্ত দৃষ্টি তখনও সাগর-জলে বারবার চলে যাচ্ছিলো, বললো সে চঞ্চল কণ্ঠে আপনারা ক্যাবিনে চলুন বাবু, আপনারা ক্যাবিনে চলুন। আমি সব বলবো…
আবু সাঈদ বললো–তাই চলো আলম, দেখি ফুলমিয়া কি বলে।
আবু সাঈদের সঙ্গে সবাই তার প্রশস্ত ক্যাবিনে এসে জড়ো হলো। এমন কি নাসের, শম্ভু, জম্বু ও অন্যান্য লাঠিয়ালও এসে পড়েছে। সকলের মুখেই দুশ্চিন্তার কালো মেঘ।
