আবু সাঈদ এবং আরও কয়েকজন পর্যটক মহোদয় একসঙ্গে বিস্ময়-ভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন–মানুষের দেহ!
হাঁ, মৃতদেহ! প্রথমে চমকে উঠলেও অল্পক্ষণেই বুঝতে পেরেছিলাম–দেহ দুটো প্রাণহীন। আমি টর্চের আলো ফেলে এগিয়ে গেলাম দেহ দুটির পাশে।
ক্যাবিনে যেন টু শব্দটি নেই, সকলে নিশ্বাস বন্ধ করে শুনছিলো আলমের কথাগুলো।
আলম যখন বলে চলেছে–ওদিকে তার মৃত্যুদূতের মত অন্ধকারে আত্নগোপন করে এগিয়ে আসছে জলিল, দক্ষিণ-হস্তে তার গুলীভরা পিস্তল। মুখে গালপাট্টা বাধা, দেহে লাঠিয়াল সর্দারের মজবুত পোশাক।
সমস্ত জাহাজ নিশ্চুপ নিঝুম।
যার-যার ক্যাবিনে সবাই বসে বসে খোদার নাম স্মরণ করছে। আর বেশির ভাগ লোকই আবু সাঈদের ক্যাবিনে। সকলে তারা উপস্থিত বিপদ-আপদের কথা ভুলে গিয়ে আলমের রহস্যময় উক্তিগুলো শুনছিলো।
নাসের বসে আছে দলবল নিয়ে, তার চারপাশে ঘিরে বসেছে শম্ভু, জম্বু আর অন্যান্য লাঠিয়াল। জলিল একশত স্বর্ণমুদ্রা পাবে, সেই লোভে সে একাই চলে গেছে আলম-হত্যায়। কাউকে সঙ্গে নিতে রাজি নয়, একশত স্বর্ণমুদ্রায় ভাগও দেবে না জলিল–এই তার ইচ্ছা।
ক্ষুব্ধ শার্দুলের মত জলিল অন্ধকারে এগুচ্ছে।
ঠিক তার কয়েক হাত দূরে অতি গোপনে তাকে অনুসরণ করছে ফুলমিয়া, হাতে তার সূতীক্ষ্ণ। ধার ছোরা। জলিল ফাঁকে পিস্তলের আগা প্রবেশ করিয়ে লক্ষ্য ঠিক করবে, তখন ফুলমিয়া পিছন থেকে আচমকা তার পিঠে ছোরা বসিয়ে দেবে। এই অভিসন্ধি নিয়েই সে এক্ষণে অগ্রসর হচ্ছে।
যাকে হত্যা করার নেশায় জলিল ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে, সেই নাবিক আলম–দস্যু বনহুর তখন সেই দ্বীপের অভ্যন্তরের রহস্যময় কাহিনী ব্যক্ত করে চলেছে…বলছে বনহুর–ভালভাবে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম, একটি পুরুষ দেহ অন্যটি নারী, কিন্তু তাদের দেহে কোনো আবরণ ছিলো না, ধূলো-মাটি আর কাদা ছাড়া। আমার বিস্ময় চরমে উঠলো, মৃতদেহগুলো কেমন যেন লোহার মত কালো মনে হচ্ছিলো। ভালভাবে পরীক্ষা করে দেখার জন্য আমি মৃতদেহের গায়ে হাত দিয়ে চাপ দিলাম, অদ্ভুত এবং বিস্ময়কর মৃতদেহগুলো দেখতেও যেমন লৌহ-রং তেমনি লৌহের মতই শক্তও বটে। চোখমুখের আকার তেমন স্পষ্ট বোঝা যায় না। নারী এবং পুরুষ-দেহ চিনবার উপায়। একমাত্র তাদের দেহের আকার, তাছাড়া কারো মাথায় কোনো রকম কেশ নেই। মৃতদেহগুলো যে শত শত বছর পূর্বের তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আবু সাঈদ বিস্ময়-বিস্ফোরিতভাবে তাকিয়ে কথাগুলো যেন গিলছিলেন, অস্কুট ধ্বনি করলেন–মৃতদেহগুলো শত শত বছর পূর্বের–কিভাবে বুঝলে আলম?
বললো বনহুর–কারণ দেহগুলো শুকনো কাঠের মত এবং লোহার মত শক্ত হয়ে গিয়েছিলো। শুধু ঐ দুটি মৃতদেহই আমি দেখিনি স্যার, হঠাৎ আমার নজর পড়লো, ঐ মৃতদেহ দুটির অনতিদূরে। একটি শিশুর দেহ এবং তার পাশে একটি কুকুর বা ঐ ধরনের কোনো জীবের দেহ পড়ে আছে। শিশু এবং কুকুরটির দেহ পরীক্ষা করেও আমি ঐ রকম শক্ত-কঠিন মনে করলাম। থামলো বনহুর, হাই তুলে বললো–আমার তখন নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো, কাজেই দ্রুত সবকিছু দেখা শেষ করার বাসনায় উঠে পড়লাম। টর্চের আলো ফেলে এগুতে লাগলাম সন্তর্পণে।
বললো নীহার–আলম, তোমার ভয় হলো না?
হাসলো বনহুর–মৃত্যুর গহ্বরে প্রবেশ করে ভয়! কিসের ভয় করবো মেম সাহেব?
ঐ মৃতদেহগুলোর জন্য তোমার মনে একটুও আশঙ্কা জাগলো না?
না। কারণ জানি, মৃত সে মৃতই–জাগবে না কোনোদিন। হাঁ, তারপর কিছুটা এগুতেই দেখলাম মাঝখানে একটা দরজা কিন্তু দরজার মুখে মাটির চাপ দিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে, তবে খুব বেশি জমাট নয়। অল্প চেষ্টাতেই দরজাটা খসে পড়লো, তখন বুঝতে পারলাম–আসলে দরজায় মাটির চাপ জমাট হয়েছিলো না, ও দরজাটাই ঠিক দেখতে ঐ রকম মাটির চাপের মত মনে হচ্ছিলো, দরজাটা খসে পড়ে অন্ধকার একটা গহবর বেরিয়ে এলো। আমি টর্চের আলো ফেলে এবং রিভলভার বাগিয়ে ধরে সেই গহ্বরে প্রবেশ করলাম।
উঃ কি সাংঘাতিক লোক তুমি! বললো নীহার।
আবু সাঈদ বলে উঠলেন–এবার বুঝতে পারছি কেন এতো বিলম্ব হলো তোমার সুড়ঙ্গমধ্যে।
বললো বনহুর–হাঁ স্যার, এসব কারণে আমার বিলম্ব ঘটেছিলো।
তারপর–সেই গহ্বরে প্রবেশ করলে তুমি?
হ, টর্চের আলো ফেলে অন্ধকারময় গহ্বরে প্রবেশ করে আমি স্তম্ভিত হলাম। এ কক্ষটা আরও জমাট অন্ধকার, কারণ সম্মুখ কক্ষটায় সুড়ঙ্গমুখের কিছুটা আলোকরশ্মি প্রবেশ করছিলো তাই কিছুটা সচ্ছ মনে হচ্ছিলো। দ্বিতীয় কক্ষটায় প্রবেশ করতেই হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম, দড়বড় উঠে টর্চের আলো ফেলতেই শিউরে উঠলাম। মেঝেতে কয়েকটা কয়লার মত কালো। মৃতদেহ বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে আছে। এবার যেন আমি সত্যি ভড়কে গেলাম। মৃতদেহগুলো অত্যন্ত ভয়ঙ্কর কুৎসিত দেখাচ্ছে। আমি আর দাঁড়াতে পারলাম না, চটপট সরে যাবো, ঠিক ঐ সময় দেখলাম কক্ষমধ্যে নীলাভ আলোর বেলুন ভেসে উঠলো। আশ্চর্য হলাম–এ যে ঐ আলো যে আলো, আমরা জাহাজে বসে অন্ধকারময় দ্বীপের বুকে দেখে থাকি।
কক্ষমধ্যে নীরব, সূঁচ পতনের শব্দও যেন শোনা যায়। সবাই যেন বনহুরের কথাগুলো গিলছে একটির পর একটি করে। আবু সাঈদ স্তম্ভতি হতবাক হয়ে শুনে চলেছেন।
নীহারের মুখেও কোনো কথা নেই, সেও যেন নির্বাক হয়ে পড়েছে। অন্যান্যেও চুপচাপ শুনে। যাচ্ছে–বলে চলেছে বনহুর। ওদিকে জলিল ডেকের অন্ধকারে সন্তর্পণে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক আবু সাঈদের ক্যাবিনের পিছনে, দক্ষিণ হস্তে পিস্তল। কোনদিক দিয়ে সে গুলী ছুঁড়বে তাই ভাবছে। মনোযোগ দিয়ে।
