পর-পর কয়েকটা দিন বেশ ভালই কেটে চলেছে। এ ক’দিন সাংঘাতিক তেমন কোনো বিপদ ঘটেনি বা প্রাণহানি হয়নি। জাহাজে সকলের মনেই অনেকটা সাহস এসেছে।
জাহাজ নোঙর করার পর সকাল-সকাল খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নিলো সবাই। আবু সাঈদ জানিয়েছেন, রাত্রি দশ ঘটিকায় আলম ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের মৃত্তিকা তলের রহস্য ব্যক্ত করবে, যা সে আজ সেখানে স্বচক্ষে দেখে এসেছে।
নাসের জলিলকে সেই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত করে নিলো। আলম যেন রহস্য উদঘাটনে সক্ষম না হয়।
জাহাজের প্রতিটি ব্যক্তি বিপুল আগ্রহ নীয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগলো, না জানি কি রহস্য আজ ব্যক্ত করবে আলম। রাত্রি নয় ঘটিকার মধ্যেই সবাই আজ আবু সাঈদের ক্যাবিনে এসে জড়ো হলো। জাহাজের সবচেয়ে বড় এবং প্রশস্ত হলো এই ক্যাবিনটা।
অন্যান্য দিনের মত আজও নিচের ডেকে বা ক্যাবিনে কেউ রইলো না। সবাই আশ্রয় নিলো জাহাজের উপরের ক্যাবিনগুলোতে।
আবু সাঈদের অন্তরে আজ এক পূর্ণতার আনন্দ। পিতার মতই আনন্দিতা নীহার, দ্বীপের রহস্য উদঘাটনের জন্য নয়, আলম সুস্থ দেহে মৃত্যুভয়াল সুড়ঙ্গমধ্য হতে ফিরে এসেছে বলে।
আলমকে আবু সাঈদ তাঁর নিজ হস্তের মূল্যবান হীরক আংটি খুলে উপহার দিয়েছেন, আরও প্রচুর অর্থ তিনি তাকে দেবেন বলে জানিয়েছেন। আলম এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব, পুরস্কার-আশায় সে উন্মুখ বা উদগ্রীব নয়।
ফৌজিন্দিয়ার ভূগর্ভ-রহস্য জানার বাসনায় আবু সাঈদের ক্যাবিনে রীতিমত ভীড় জমে গেছে। নাসের এবং জলিলের দল ছাড়া সবাই আজ এসে জমায়েত হয়েছে এই ক্যাবিনে। সকলেরই চোখেমুখে বিপুল আগ্রহ।
আবু সাঈদ নিজের পাশে বসিয়েছেন নাবিক আলমকে। নীহারও ঠিক তার অনতিদূরে বসেছে, স্থির নয়নে তাকিয়ে আছে সে আলমের দীপ্তময় মুখমন্ডলের দিকে। নীহার যেন আনন্দে আত্নহারা হয়ে পড়েছে, আলম যে ঐ মৃত্যুভয়ঙ্কর সুড়ঙ্গমধ্য হতে ফিরে আসবে, এ আশা তার ছিলো না এবং সেই কারণে সে বেশি মুষড়ে পড়েছিলো।
কেশবও দাঁড়িয়ে আছে আলমের পাশে, আনন্দে আপুত সে। আর একজনও ঠিক কেশবের মতই খুশি হয়েছে–সে হলো ফুলমিয়া। যদিও সে এখনও জলিলের সঙ্গেই রয়েছে তবু তার মনে তৃপ্তি, তার জীবন রক্ষকের জীবনলাভ ঘটেছে।
আবু সাঈদের ক্যাবিনে যখন বনহুর সেই ভয়ঙ্কর সুড়ঙ্গমধ্যের কাহিনী শোনানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে নিচ্ছিলো তখন নাসেরের ক্যাবিনে তৈরি হয়ে নিচ্ছে জলিল। পিস্তলে গুলী ভরে নাসের। পিস্তলটা জলিলের হাতে দেয়–এই নাও, অত্যন্ত সাবধানে কাজ শেষ করবে।
জলিল পিস্তলটা লুকিয়ে রাখলো পকেটে, তারপর হেসে বললো–সাবধান আমাকে করে। দিতে হবে না ছোট স্যার। ঠিক আমি আজ আলম বেটাকে খতম করে তবে ছাড়বো। কিন্তু আমার বখশীসটা..
ও ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, পথের কাঁটা সরে গেলেই আমি তোমাকে সন্তুষ্ট করবো।
নাসের আর জলিল যখন আলমকে হত্যা করা নিয়ে গভীর আলোচনায় মত্ত, তখন ফুলমিয়া সব শুনছিলো দলের মধ্য হতে। ভাবছিলো, এবার জলিলের হাত থেকে পরিত্রাণ নেই আলম সাহেবের, হায় কি করে তাকে বাঁচানো যায়। কোনো উপায় স্থির করতে না পেরে ফুলমিয়া খোদাকে স্মরণ করতে লাগলো। হে পাক পরওয়ার দেগার, আমি একজন গোনাহগার বান্দা, তোমার কাছে আমি অপরাধী,তবু একটি দোয়া আমার কবুল করো, আমার জীবন যে রক্ষা করেছে তার জীবন তুমি রক্ষা করো, এই আমার মোনাজাত…
*
সমস্ত ক্যাবিন নিস্তব্ধ। সবাই ব্যাকুল আগ্রহে তাকিয়ে আছে আলমের মুখে। বলে চলেছে আলম–সুড়ঙ্গ মধ্যে প্রবেশ করতেই একটা তীব্র ভ্যাপসা গন্ধ আমার নিশ্বাসকে রুদ্ধ করে দিতে লাগলো! প্রথমে মনে হলো, আমি এ গন্ধ সহ্য করতে পারবো না। হতাশ হয়ে পড়লাম, সুড়ঙ্গে প্রবেশ করা আমার বৃথা হলো, এবার ফিরে যেতে হবে, তবু আমি সহ্য করার চেষ্টা করতে লাগলাম, ভাগ্যিস আমার সঙ্গে অক্সিজেন গ্রহণের যন্ত্রটা ছিলো তাই রক্ষা পেলাম। আমি মুখে মুখোস পরে অক্সিজেন গ্রহণ করতে লাগলাম। থামলো আলম।
কক্ষমধ্যে সকলে স্তব্ধ হয়ে শুনে চলেছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
পুনরায় বলতে শুরু করলো আলম–কিছুদূরে অগ্রসর হতেই বুঝতে পারলাম, সেটা কোনো সুড়ঙ্গপথ বা গুহা নয়। কোনো এককালে এখানে বাড়িঘর ছিলো, তাই বসে গেছে গভীর মাটির তলায়। টর্চের আলোতে আমি সব স্পষ্ট দেখতে লাগলাম। কক্ষগুলো শত শত বছর আগের অথচ ঠিক পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো কোনো স্থানে যদিও কিছু কিছু অংশ ধসে পড়েছে তবু কক্ষগুলোর কোনো রকম বিকৃতি ঘটেনি। আরও আশ্চর্য হলাম, কক্ষগুলোর মধ্যে নানা রকম আসবাবপত্র সাজানো রয়েছে, তবে মাটি এবং ধূলোবালিতে সেসব জিনিসপত্র কিসের তৈরি বা কি জিনিস বোঝা মুস্কিল। যদিও আমার খুব ভয় হচ্ছিল, হয়তো বেশিক্ষণ এখানে ঠিক থাকতে পারবো না ভাবছিলাম–কারণ অক্সিজেন গ্রহণেও আমি ঠিকভাবে নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না।
বললেন আবু সাঈদ–কি ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে তুমি ফিরে এসেছো আলম!
হাঁ স্যার, সে কথা মিথ্যা নয়। আমি টর্চের আলো নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলাম। ভেবেছিলাম, বহুকালের ভূগর্ভে ধসে পড়া এসব কক্ষে নিশ্চয়ই নানারকম জীবজন্তু বসবাস করছে। কিন্তু অবাক হলাম, একটি মাকড়সাও আমার নজরে পড়লো না। সাপ বিছা বা ইঁদুর কিছুই নেই। হঠাৎ আমার টর্চের আলোতে এক অদ্ভুত জিনিস দেখলাম–ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিলাম একেবারে, দেখলাম মেঝেতে পড়ে আছে পাশাপাশি দুটো মানুষের দেহ…
