আবু সাঈদ ক্রমান্বয়ে অস্থির হয়ে পড়লেন, সকলের নিকটে অনুরোধ জানালেন আরও এক ঘন্টা অপেক্ষা করার জন্য।
কেশব তো হাত জুড়ে সকলের নিকটে অনুনয়-বিনয় শুরু করলো–তারা যেন তার বাবুকে ছেড়ে না যায়।
নাসের সবাইকে উস্কানি দিতে লাগলো, যাতে তারা আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করতে রাজি না হয়।
আবু সাঈদের কথামত আরও একটা ঘন্টা কেটে চললো। তবুও ভিতর হতে ফিরে এলো না। আলম। এবার সকলে জাহাজের দিকে রওয়ানা দিলো।
তখনও আবু সাঈদ কেশব আর নীহার এবং কয়েকজন আবু সাঈদের বন্ধুত্থানীয় লোকজন অপেক্ষা করছেন। আর দেখা গেলো, ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ফুলমিয়া। তার মুখে-চোখেও দারুণ উদ্বিগ্নতার ছাপ।
কিন্তু আর যে অপেক্ষা করা চলে না, এবার দ্বীপের বুকে নেমে আসবে সন্ধ্যার অন্ধকার। তার সঙ্গেই শুরু হবে দ্বীপময় এক মৃত্যুভয়াল আলোর খেলা। অসংখ্য প্রেত-আত্নার অদৃশ্য হস্তের কঠিন চাপে প্রাণ দিতে হবে সকলের।
আর বিলম্ব করা চলে না।
মৃত্যুভয় কার না আছে!
সবাই যখন জাহাজে ফিরে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে তখন আবু সাঈদ আলমের আশা ত্যাগ করে নীহারকে বললেন–মা, এবার আমাদের ফিরে যেতে হবে।
নীহার বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো-আব্বা, আলমকে এই মৃত্যুকূপে নিক্ষেপ করে কোন মন নিয়ে তুমি বাঁচতে চাও।
মা!
বাবা, তোমরা সবাই চলে যাও, আমি একা প্রতীক্ষা করবো আলমের।
একি বলছিস মা? তুই কি পাগল হলি?
কেশব এগিয়ে এলো-স্যার, আপামনি পাগল হয়নি। তিনি ঠিকই বলেছেন, বাবুকে এই বিপদে ফেলে আপনারা কি করে ফিরে যেতে চান? সবাই চলে গেলেও আপামনির সঙ্গে আমি থাকবো। মরতে হয় বাবুর সঙ্গে আমরাও মরবো।
কয়েকজন গণ্যমান্য বয়স্ক লোক ছিলেন আবু সাঈদের সঙ্গে, তাঁরা চরম বিপদে পড়েছেন– আবু সাঈদ সাহেবকে ছেড়ে যেতেও পারছেন না অথচ জীবনের মায়া কাটানোও মুস্কিল। নীহারের কথায় এবং কেশবের উক্তি শুনে সবাই প্রতিবাদ করে বসলেন।
প্রবীণ এক ব্যক্তি বললেন–একজনের জন্য এতোগুলো জীবন বিনষ্ট করার কোনো যুক্তি নেই। কেশব তার বাবুর জন্য অপেক্ষা করতে চায় করুক কিন্তু আমরা মা নীহারকে এই ভয়ঙ্কর স্থানে রেখে যেতে পারি না।
আবু সাঈদ কন্যাকে অনেক বোঝাতে লাগলেন।
আশ্চর্য, নীহার কিছুতেই ফিরে যাবে না জাহাজে!
ওদিকে লোকজন সবাই ফিরে চলেছে, নাসের দলবল নিয়ে এগিয়ে গেছে অনেকদূর।
আবু সাঈদ যখন ব্যথিত মর্মাহত হয়ে ফিরে চলার জন্য মন স্থির করে নিয়েছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ঐ ভয়ঙ্কর মৃত্যুভয়াল সুড়ঙ্গমধ্য হতে ভেসে আসে গুলীর শব্দ।
সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে স্ফীত হয়ে উঠে আবু সাঈদ, নীহার এবং উপস্থিত অন্যান্য সকলের মুখ। কেশব তো খুশিতে চিৎকার করে উঠলো–বাবু–বাবু…
ফুলমিয়া অন্যান্যের মধ্যে আত্নগোপন করে এতক্ষণ খোদার নাম স্মরণ করছিলো। সেও ভুলে যায় তার সর্দার আর দলবলের হিংসার কথা, ছুটে চলে আসে সুড়ঙ্গমুখে।
ঠিক সেই দন্ডে সুস্থদেহে সুড়ঙ্গমধ্য হতে বেরিয়ে আসে নাবিক আলম। সূর্যাস্তের শেষ রশ্মিতে তাকে পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক মনে হয়। আবু সাঈদ ছোট্ট বালকের মতই ছুটে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তাঁর চোখে ঝরে পড়ে আনন্দ-অশ্রু। আবেগভরা মধুর কণ্ঠে ডাকলেন–আলম!
নীহারের চোখ খুশিতে জ্বলে উঠলো যেন, সেও পিতার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক চোখে দেখছে, সত্যি আলম জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছে।
কেশবের কণ্ঠে কোনো কথা সরলো না, সে কি করবে যেন ভেবে পাচ্ছে না।
ফুলমিয়া এবার হাত তুলে খোদার কাছে শুকরিয়া করতে লাগলো।
অন্যান্য সবাই এগিয়ে এসে বনহুরের সঙ্গে করমর্দন করতে লাগলো। নাসের আর জলিলের দল যদিও অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিলো তাদের মুখ পুনরায় কালো হলো। কারণ, তারা মনে করেছিলো, আলম আর সুড়ঙ্গমধ্য হতে ফিরে আসবে না। এ দ্বীপেই হবে তার জীবন্ত সমাধি, কিন্তু সে কল্পনা তাদের ধূলিসাৎ হলো।
আবু সাঈদ দলবল নিয়ে আলমসহ ফিরে এলেন জাহাজে। জাহাজে পৌঁছেই তিনি আনন্দ আপুত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, আলম ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের গোপন রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছে, তাকে তিনি অন্তরের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
জাহাজের প্রতিটি ব্যক্তি এ সংবাদে খুশি হলো। এবার সবাই আশ্বস্ত হয়েছে, ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের গোপন রহস্য জানতে পারবে বলে। কিন্তু জাহাজের একটি গোপন স্থানে নাসের জলিলের দলসহ সলা-পরামর্শ শুরু করলো, কোনোরকমে আলম যেন এ কৃতিত্ব লাভ করতে সক্ষম না হয়। সুড়ঙ্গ মধ্যের রহস্য উদঘাটনের পূর্বেই তাকে শেষ করতে হবে, রুদ্ধ করে দিতে হবে চিরতরে তার কণ্ঠ। এবার ছোরা দ্বারা বা জাহাজের ইঞ্জিনে নিষ্পেষিত করে নয়, পিস্তলের গুলীতে হত্যা করতে হবে। অতি সাবধানে কাজ করতে হবে যাতে এবার রেহাই না পায়।
নাসের জলিলকে একশত স্বর্ণমুদ্রা দিতে রাজি হয়েছে। কার্যসিদ্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হবে। তাকে এই স্বর্ণমুদ্রাগুলো।
এতোবড় একটা লোভ কম নয়, একশত স্বর্ণমুদ্রা পেলে আজীবন বসে চলে যাবে তার। লাঠিয়ালদের সর্দারী আর তাকে করতে হবে না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার কিছু পরই তাদের জাহাজ ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ ত্যাগ করে কয়েক মাইল দূরে চলে এলো। পূর্বদিনের জায়গা হতেও আজ আরও কিছুটা দূরে জাহাজ নোঙর করলো।
