বনহুরের সঙ্গে নীহার যখন এগিয়ে যাচ্ছিলো তখন নাসের দাঁত কটমটিয়ে বলছিলো– বেটাকে আর কটা দিন ফুর্তি করে নিতে দাও জলিল, তারপর ওকে হজম করে ফেলবো।
জলিল বলে উঠে-দ্বীপটা ভয়ঙ্কর স্থান, কখন কোন বিপদ ঘটে, তাই আমিও চুপচাপ আছি, নইলে ওকে এতোদিনে যমালয়ে পাঠিয়ে তবে ছাড়তাম।
জলিল আর নাসেরের যখন কথাবার্তা হচ্ছিলো তখন ফুলমিয়া এবং দলবল এসে যোগ দেয় তাদের সঙ্গে। পিছনে চলতে চলতে সব শোনে ফুলমিয়া।
জলিল এবং নাসের তাদের সবাইকে একবার দেখে নেয়। এরা সবাই তাদেরই লোক, কাজেই কথাবার্তা চলতে থাকে, বলে নাসের–কতদিন আগেই বেটা চলে যেতো যমালয়ে, কিন্তু ভাগ্য ভাল তাই বেঁচে গেছে বারবার।
জলিল বললো–সেকথা অবশ্য ঠিক বলেছেন ছোট স্যার। না হলে কতবার আলমকে হত্যা করার চেষ্টা করেও আমরা বিফল হলাম কেন?
বললো নাসের–দ্বীপের বিপদটা একবার কেটে যাক তাহলে..
নাসেরের কথার মাঝখানে বলে উঠে জলিল–এবার শেষ বান নিক্ষেপ করবো ছোট স্যার, দেখে নেবেন বেটা কুপকাৎ না হয়ে যাবে না। কিন্তু স্যার–মোটা বখশীস চাই…জলিল, নাসেরের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো।
ফুলমিয়া সজাগ হয়ে সব শুনছিলো, শিউরে উঠলো সে। কিন্তু মুখোভাবে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো না তার। নীরবে শুনছে আর দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফুলমিয়ার মনে ঠিক বিপরীত চিন্তা, নাসের এবং জলিল চায় আলমকে ধ্বংস করতে, আর ফুলমিয়া চায় তার মঙ্গল।
ওদিকে আলমসহ নীহার তখন অনেকদূর এগিয়ে গেছে। অবশ্য তাদের সকলেরই গন্তব্যস্থান আজ একই জায়গায়–যে স্থানে বেরিয়েছে সেই সুড়ঙ্গমুখটা।
বনহুর আর নীহার যখন পৌঁছলো তখন সেখানে সবাই এসে জড়ো হয়ে গেছে। আশেপাশে বিভিন্ন স্থানে চলেছে তখন খননকাজ।
অনেক দালান-কোঠার ভগ্নাংশ বেরিয়ে এসেছে মাটির তলা হতে। অনেক জীবজন্তুর কঙ্কাল। এবং নর-কঙ্কালও বেরিয়েছে প্রচুর। আবু সাঈদ এবং ভূতত্ববিদগণ গবেষণা করে আশ্চর্য হলেন– শত শত বছর আগের মাটিচাপা-পড়া জীবের কঙ্কাল কি করে আজও বিনষ্ট না হয়ে ঠিক আছে!
গবেষণা চলতে লাগলো এ ব্যাপার নিয়ে।
এদিকে বনহুর সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলেন। কেশবের মুখ ফ্যাকাশে কালো হয়ে উঠেছে।
নীহার যেন মনকে কিছুতেই ধরে রাখতে পারছে না, বার বার তার চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠছে। বনহুরের দিকে চাইতেই দৃষ্টি বিনিময় হলো, আশ্চর্য হলো নীহার-ওর মুখে নেই। এতোটুকু ভয় বা দুশ্চিন্তার ছাপ।
বনহুর সড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশের জন্য টাইট জামা-কাপড় পরে নিলো। পায়ে বুট, মাথায় ক্যাপ, হাতে গ্লাবস্। বামহস্তে তীব্র আলোদায়ক টর্চ এবং দক্ষিণ হস্তে গুলীভরা রিভলভার।
আবু সাঈদের অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফার বনহুরের পর-পর ফটো নিয়ে চলেছে। যদিও এতোক্ষণ সে দ্বীপের খনন অংশের বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করছিলো, এখন সে ব্যস্ত হয়ে উঠলো বনহুরের ছবি গ্রহণে।
বনহুর যখন সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করলো তখন সে সকলের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লো, তার মুখমন্ডল দীপ্ত উজ্জল। ফটোগ্রাফার ছবি নিলো সেই মুহূর্তে।
উপস্থিত সকলের মুখ বিষাদময় হলো, আবু সাঈদ এবং অন্যান্য সকলের মুখেও গভীর একটা দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠলো। নীহার ও কেশব অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলো।
শুধুমাত্র খুশি হলো নাসের এবং জলিল ও তার দলবল। কিন্তু ফুলমিয়ার মুখ কালো হয়ে উঠেছে, তার জীবন যে রক্ষা করেছে সে আজ মৃত্যুর গহ্বরে প্রবেশ করলো। মনেপ্রাণে ফুলমিয়া খোদাকে স্মরণ করছে, তিনি যেন আলম সাহেবকে সুস্থদেহে ফিরিয়ে আনেন।
কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে চললো, আলমের ফিরবার কথা নেই। সুড়ঙ্গমুখে সবাই বিপুল আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষা করছে। সমস্ত জাহাজের লোকজন সবাই এসে জড়ো হয়েছে সেই স্থানে।
বেলা গড়িয়ে এলো কিন্তু আলমের আর সন্ধান নেই। আবু সাঈদ এবং বয়স্ক পর্যটকগণ সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন, তা ছাড়াও অন্যান্য সকলের মুখেই দুশ্চিন্তার ছাপ। কেশব আশঙ্কিতভাবে সুড়ঙ্গমুখে দাঁড়িয়ে আছে।
নীহার বারবার পিতাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলেছে, এতোক্ষণও আলম আসছে না কেন? কোনো বিপদ ঘটেনি তো তার? এতোক্ষণ আসছে না সে, আর একজন গিয়ে দেখা উচিত নয় কি?
কেশব এবার অধৈর্য হয়ে উঠেছে, হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে সে। আবু সাঈদের মুখে কোনো কথা সরছে না, কারণ আলমের যদি কোনো অমঙ্গল ঘটে থাকে তাহলে এজন্য দায়ী যে তিনিই। আবু সাঈদ নিজে পায়চারি শুরু করে দিয়েছেন, ললাটে ফুটে উঠেছে গভীর চিন্তারেখা।
সম্পূর্ণ কয়েকটা ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে চলেছে।
বিপুল উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে সবাই।
সূর্য পশ্চিম আকাশে গড়িয়ে গেছে অনেকদূরে। শ্রমিক এবং নাবিকদের মধ্যে চঞ্চলতা দেখা। দিলো, সবাই জাহাজে ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিয়েছে।
আবু সাঈদ ক্ষিপ্তের ন্যায় উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছেন, সহকারী এবং সঙ্গিগণ সবাই আবু সাঈদের উৎকণ্ঠায় যোগ দিয়ে নানাজনে নানারকম মতবাদ প্রকাশ করছেন।
শুধু নাসেরের দল মনে মনে খুশি হয়েছে চরম আকারে। এতোদিন নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েও যা করতে সক্ষম হয়নি আজ তা আপনা আপনি হয়ে গেলো। নাসের জলিলসহ দলবল নিয়ে জাহাজে ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিয়েছে। আনন্দ তাদের ধরছে না যেন।
