সবাই প্রতীক্ষা করতে লাগলো না জানি কখন দুলে উঠবে জাহাজখানা ভীষণভাবে। কিন্তু আশ্চর্য আজ হুইসেলের তীব্র শব্দ এদিকে না এগিয়ে ক্রমান্বয়ে সরে যাচ্ছে দূরে–আরও দূরে। ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে এলো শব্দটা।
জাহাজের সবাই কান পেতে শুনছিলো এই শব্দ সম্বন্ধে নানাজনে নানারূপ মতবাদ করতে লাগলো। ততক্ষণে দূরে বহু দূরে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের উপর জ্বলে উঠেছে অসংখ্য আলোর প্রদীপ। আলোগুলো যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে।
হুইসেলের শব্দটা মিশে আসতেই কতকটা আশ্বস্ত হলো জাহাজের আরোহীগণ কিন্তু একেবারে ভয়শূন্য হলো না কেউ। আবার কোন মুহূর্তে জীবটা এসে আচমকা আক্রমণ চালিয়ে বসে বলা যায় না। সবাই শাশীর পাশে দাঁড়িয়ে দ্বীপের আলোর খেলা দেখতে লাগলো।
দিনের আলোতে যেখানে নেই কোনো কিছুর চিহ্ন, নেই কোনো মশাল বা প্রদীপের ভগ্নাংশ। অথচ এখন সেই দ্বীপে অসংখ্য আলোর বন্যা।
আজকের রাতটা তেমন কোনো বিপদের সম্মুখীন হলো না। অবশ্য কৃতিত্ব বনহুরেরই কারণ সে আজ নিজে ইঞ্জিন চালিয়ে জাহাজটাকে একেবারে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ ছেড়ে অনেক দূরে নিয়ে। গিয়ে নোঙর করেছিলো।
আবু সাঈদ আর অন্যান্য পর্যটক পরদিন সবাই বনহুরকে ধন্যবাদ জানাতে লাগলেন।
সবাই যখন দ্বীপে অবতরণ নিয়ে ব্যস্ত তখন একসময় নীহার নীচের ডেকে বনহুরের ক্যাবিনে প্রবেশ করলো।
বনহুর তখন তার নাবিক ড্রেস পরা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। কয়েক মিনিট পূর্বে জাহাজ দ্বীপের সন্নিকটে এসে নোঙর করেছে। এবার বোটযোগে সবাই নামছে।
বনহুর জামাটা পরে নিয়ে সম্মুখে তাকাতেই চমকে উঠলো। নীহার কখন এসে দাঁড়িয়েছে তার ক্যাবিনের মধ্যে। একটু পূর্বে কেশব বেরিয়ে গেছে খনন যন্ত্রপাতি নিয়ে। বনহুর আজ ঐ অদ্ভুত সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করবে, কাজেই সেইভাবে ড্রেসটা মজবুত করে নিয়েছিলো।
হঠাৎ নীহারকে দেখে দৃষ্টি স্থির হলো বনহুরের, বললো–নীহার তুমি নেমে যাওনি?
গম্ভীর কণ্ঠে বললো নীহার–না।
সে কি, যাবে না? কয়েক পা সরে এলো বনহুর নীহারের পাশে।
বনহুরের কথা কানে না নিয়ে বললো নীহার–আলম, সুড়ঙ্গ মধ্যে তুমি প্রবেশ করতে পারবে না।
অবাক হয়ে বললো বনহুর-নীহার, তুমি আজও নাবিক আলমকে চিনলে না? সে যা একবার বলে তা সে করবেই। শত বাধাও তাকে তার সঙ্কল্প থেকে বিরত করতে সক্ষম হয় না।
নীহার বনহুরের জামার সম্মুখভাগ এটে ধরে বলে–তুমি আমার অনুরোধ রাখবে আলম? আমি তোমাকে অনুরোধ করছি। তুমি যেও না, যেও না, আলম ঐ মৃত্যুভয়াল সুড়ঙ্গ-মধ্যে–
নীহারের হাত দু’খানা চেপে ধরলো বনহুর নীহার, এতে ভয় পাবার কিছু নেই। আর মরণে আমার দুঃখও নেই। নীহার, আমার জীবনটাও বড় অভিশপ্ত জীবন–গলা ধরে আসে বনহুরের।
নীহার অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে বনহুরের ছলছল আঁখি দুটির দিকে। হঠাৎ নীহার বনহুরের বুকে মাথা রেখে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠে–আলম, জানি না কেন আমি নিজকে হারিয়ে ফেলেছি তোমার মধ্যে। অনেক ভেবেছি, আকাশের চাঁদ চাইলেই কোনোদিন পাওয়া যায় না, তবু কেন কেন পারি না নিজকে সংযত রাখতে..
নীহার, এ তোমার মনের দুর্বলতা, না হলে আমার মত একজন নগণ্য নাবিককে তুমি এভাবে মনে স্থান দিতে পারতে না।
না না, তুমি নগণ্য নও আলম, তুমি নগণ্য নও। তুমি অমূল্য সম্পদ, যা কল্পনা করা যায়– কিন্তু পাওয়া যায় না। নীহার বনহুরের বুকে গলায় গণ্ডে হাত বুলিয়ে চলে।
বনহুর নির্বাক নিস্পন্দ, কোনো কথা সে বলতে পারে না। তার সমস্ত দেহমনে যেন একটা শিহরণ নাড়া দিয়ে যায়। বনহুর সংযত রাখতে পারে না নিজেকে, গভীর আবেগে নীহারকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে। ওর মুখখানা তুলে ধরে নিজের মুখের কাছে।
নীহার ওকে বাধা দেয় না।
তারপর বনহুর নীহারকে বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়ে বলে–চলো নীহার, বড্ড দেরি হয়ে গেলো।
নীহার আর বনহুর জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়ালো, প্রায় সকলেই অবতরণ করেছে। একখানা বোট সিঁড়ির মুখে অপেক্ষা করছে বনহুরের জন্য।
বনহুর নীহারের হাত ধরে নামিয়ে নিলো জাহাজ থেকে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় নীহারের দেহটা যেন কাঁপছিলো, ভয়ে নয়–আশঙ্কায়। হয়তো আলমের সঙ্গে এই তার শেষ জাহাজ ত্যাগ। হয়তো আলম ঐ সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করে আর ফিরে আসবে না। হয়তো তাকে ঐ ভয়ঙ্কর দ্বীপে চিরদিনের জন্য বিসর্জন দিয়ে আসতে হবে…।
বোটে বসে বললো বনহুর–অমন গম্ভীর হয়ে কি ভাবছো নীহার?
কিছু না। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে নিলো নীহার।
বনহুর বুঝতে পেরেছে, তার সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ-আশঙ্কায় নীহার বেশি উতলা এবং চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
এরপর বনহুর আর কোনো কথা বলে না, নিশুপ হয়ে বসে বোটের স্পীড বাড়িয়ে দেয়।
অল্প সময়ে বনহুর আর নীহারসহ বোটখানা দ্বীপের কিনারে গিয়ে পৌঁছে যায়।
জাহাজখানা ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের কয়েক রশি দূরে নোঙর করেছিলো।
বনহুর বোট থেকে নেমে পড়ে নীহারকে হাত ধরে সাবধানে নামিয়ে নেয়। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে যাতে পড়ে না যায় সেইদিকেও খেয়াল রাখে।
বনহুরের হাতে হাত রেখে যখন নীহার বোট থেকে নামছিলো তখন অদূরে দাঁড়িয়ে নাসের এবং জলিল লক্ষ্য করছিলো। ইদানীং নাবিক আলমের প্রতি তাদের ঈর্ষাগত মনোভাব বলিষ্ঠ না। থাকলেও একেবারে বিনষ্ট হয়নি। তবে সম্প্রতি ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের মৃত্যুভয়াল ভয়ঙ্কর অবস্থার জন্য শান্ত আছে তারা, কারণ আলমের মত দুঃসাহসী শক্তিশালী একজন ব্যক্তির নিতান্ত প্রয়োজন তাদের কর্তব্য। তাই আজকাল নাসের বা জলিলের দল হিংসায় জ্বলে মরলেও প্রকাশ্যে কোনোরকম কু-মতলব আঁটে না। তারা চায় দ্বীপ থেকে কোনোরকমে উদ্ধার পেয়ে ফিরে যাবার পথে ওকে খতম করতে হবে এবং সেই প্রতীক্ষাতেই আছে তারা।
