পিতার কথাটা শুনে মুহূর্তে নীহারের মুখমন্ডল বিষণ্ণ মলিন হয়ে উঠলো, কারণ পিতার আশা বাসনা কোনো দিনই সফল হবার নয়। আলম বিবাহিত এবং তার একটি সন্তানও আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে চেপে নিয়ে বললো নীহার–কেন আব্বা, অভিজাত ঘরে জন্মালে কি নাবিক হয় না?
হাঁ, সে কথা অবশ্য সত্য। আমার মনে হয় আলম নাবিক হলেও সে অভিজাত ঘরের সন্তান।
ঐ সময় পিছন থেকে শোনা যায় একজনের উচ্চ কণ্ঠস্বর–স্যার, স্যার–
থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকাতেই দেখতে পান আবু সাইদ এবং নীহার একজন শ্রমিক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে।
অল্পক্ষণেই নিকটে এসে পড়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে সে স্যার দেখবেন চলুন, একটা সুড়ঙ্গপথ বেরিয়ে পড়েছে। একটা সুড়ঙ্গ মুখ—
আবু সাঈদ এবং নীহার একরকম প্রায় ছুটেই চললেন যেখানে বনহুর শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে চলেছে। নিকটে পৌঁছতেই অবাক হলেন আবু সাঈদ এবং নীহার। কিছুক্ষণ পূর্বে যে স্থানটিতে ওরা খনন করছিলো এক্ষণে সেই স্থানে একটা গভীর গর্ত বেরিয়ে পড়েছে এবং সেই গর্তমধ্যে নেমে গেছে পূর্বের ঐ ভগ্নসিঁড়ির ধাপগুলো।
আবু সাঈদের মুখে ফুটে উঠলো বিস্ময়, তিনি কন্যা নীহার সহ বনহুর এবং শ্রমিকদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
বনহুর বললো–স্যার, নিশ্চয়ই এই সিঁড়ির ধাপগুলো নিচে কোনো কক্ষমধ্যে নেমে গেছে।
হাঁ, আমারও সেইরকম মনে হচ্ছে আলম।
বনহুর এবার বললো-”স্যার, আমি নিচে নেমে দেখতে চাই।
আবু সাঈদ এবং নীহার এক সঙ্গে বলে উঠলো–কি ভয়ঙ্কর কথা বলছো বাবু ও কিছুতেই হবে না।
বনহুর বললো–আমাকে আপনারা বাধা দেবেন না। কারণ আমি এই সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করবোই।
নীহারের মুখ ফ্যাকাশে হলো, বললো সে–আলম এই বিপদসঙ্কুল দ্বীপে ভয়ঙ্কর এক গর্তে প্রবেশ করতে চাও?
না প্রবেশ করলে ভিতরে কি আছে মোটেই জানা যাবে না।
আবু সাঈদ এবং নীহারের নিষেধ উপেক্ষা করে, কেশবের বাধা না মেনে বনহুর দুর্গম ভয়ঙ্কর গতমধ্যে অবতরণে প্রস্তুত হয়েছিলো। কিন্তু ঐ দিন সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করা আর সম্ভব হলো না। বনহুরের। কারণ বেলা গড়িয়ে এসেছে, এবার জাহাজে ফিরতে হবে।
নীহার যেন নিশ্বাস নিলো এতোক্ষণে, যাক আজকের দিনটা এবং রাতটা তবু নিশ্চিন্ত সে। কেন যে ওর জন্য নীহারের এতো চিন্তা, নিজেই ভেবে পায় না যেন সে।
কেশব কিন্তু ভয়ানক ঘাবড়ে গেছে, বাবুকে সে কিছুতেই সুড়ঙ্গমধ্যে একা প্রবেশ করতে দেবে না। শত শত বছর আগের ধ্বংসপ্রাপ্ত সুড়ঙ্গমধ্যে না জানি কত কত ভয়ঙ্কর জীব বাস করছে। ওর মধ্যে প্রবেশ করলে আর সে ফিরে আসবে না।
এক সময় সবাই ফিরে গেলো জাহাজে।
আজও পূর্বদিনের মত জাহাজটিকে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ হতে প্রায় মাইলকয়েক দূরে সাগরবক্ষে ভাসিয়ে রাখা হলো এবং নিচের ডেকে বা ক্যাবিনে কেউ রইলো না। সবাই আশ্রয় নিলো জাহাজের উপর ক্যাবিনগুলোতে।
খাওয়া-দাওয়া-পর্ব সন্ধ্যার অনেক আগেই চুকিয়ে নেওয়া হলো।
বনহুর আজ আবু সাঈদকে বললো–স্যার আমি আজ নিচের কোনো ক্যাবিনে থাকতে চাই।
সঙ্গে সঙ্গে আবু সাঈদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–জাহাজের সবাই যদি আমার কাছে অনুরোধ জানায় তবু আমি তোমাকে নিচের কোনো ক্যাবিনে থাকতে দিতে পারি না।
নীহার বনহুরের কথাটা শুনে চমকে উঠেছিলো, স্থির হলো পিতার উক্তি শুনে। বললো। নীহার–আলম তুমি সাহসী জানি, কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি কিছুতেই ভাল নয়, বুঝলে?
হ বুঝেছি মেম সাহেব। কিন্তু কি সেই জীবটা যা আমাদের জাহাজের দু’জনকে ভক্ষণ করেছে, তা জানাও তো প্রয়োজন? বেশ, আমি নীচে না থাকলেও উপরে যে কোন অন্য ক্যাবিনে থাকতে চাই।
নীহার অভিমানভরা গলায় বললো বুঝতে পেরেছি তুমি আমাদের ক্যাবিনে থাকলে বাইরে বেরুতে পারবেনা, এজন্যই তো অন্য ক্যাবিনে থাকতে চাও, না?
হাঁ, কারণ আমি জানতে চাই সেই ভয়ঙ্কর হস্তিশুড়ের ন্যায় মোটা হস্তখানা কোন জীবের এবং যতক্ষণ না আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়েছি ততক্ষণ আমাকে কেউ আপনারা আটকাতে পারবেন না।
নীহার মাথা নীচু করে বসে রইলো, অজানিত এক আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠলো তার।
আবু সাঈদ বললেন–হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া অসম্ভব নয়, তাই বলছিলাম রাতে ক্যাবিনের বাইরে বের না হওয়াই সমীচীন।
কিন্তু কোনো আপত্তিই বনহুর শুনলো না, জীবনে ভয় কাকে বলে সে জানে না। আর আজ তাকে আবু সাঈদ বা নীহার ক্ষান্ত করতে সক্ষম হবে।
বনহুর পাশের ক্যাবিনে রইলো–যেখানে রয়েছে নাসের এবং জলিলসহ লাঠিয়ালগণ। কেশবও রইলো তার কাছে। সে কোনোমতেই বনহুরের সঙ্গ ত্যাগ করতে রাজি নয়।
রাত এখনও বেশি হয়নি।
কারো চোখে এখনও নিদ্রাদেবী আসন গেড়ে বসেনি, সবাই নানারকম গল্প-সল্প নিয়ে ব্যস্ত আছে। কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তিই অতি নিম্ন ও চাপাস্বরে আলাপ-আলোচনা করছিলো।
সকলের মনেই রয়েছে আতঙ্ক, কখন সেই অদ্ভুত জীবের মোটা হাতখানা এসে কাকে তুলে নিয়ে সাগর মধ্যে ডুব মারবে।
এমন সময় হঠাৎ শোনা গেলো সেই কানফাটা তীব্র হুইসেলের শব্দ।
সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ পর্যটনের প্রত্যেকটা ব্যক্তির মুখশুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। সাহসী জলিলের লাঠিয়ালদল পর্যন্ত কুঁকড়ে গেলো কেঁচোর মত।
নাসের এসে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে, ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে তার মুখটা।
