জাহাজের সবাই কানে হাত-পা চাপা দিয়ে কাঁপতে লাগলো। এবার আর রক্ষা নেই, জাহাজের সঙ্গে বুঝি ট্রেনের সংঘর্ষ হবে।
নীহার আর্তকণ্ঠে ডাকলো–আলম এসো–সরে এসো, আমার বড় ভয় করছে—
বনহুর শান্ত এবং চাপা স্বরে বললো–ভয় নেই, এখানে কেউ আসতে পারবে না।
আবু সাঈদের মুখ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।
আজকের রাতটাও এভাবেই কাটলো। কারো চোখে ঘুম এলো না। ভোর হলো যখন তখন। সবাই ঢলে পড়লো নিদ্রার কোলে কারণ আজ রাতে কেউ মারা পড়েনি।
বনহুর কখন নিদ্রিত হয়ে পড়েছিলো হঠাৎ জেগে উঠলো সে। ইচ্ছা করেই সে নিদ্রাকে ঠেলে দিয়ে হাই তুলে চেয়ারে সোজা হয়ে বসলো। বনহুর চেয়ারে বসতেই নিজের কাঁধে একটা কোমল কিছুর স্পর্শ অনুভব করলো।
রাতে যখন হুইসেলের ধ্বনি হচ্ছিলো তখন নীহার ভয় পেয়ে তাকে নিকটে এসে বসার জন্য। বার বার বলছিলো। আবু সাঈদও বলেছিলেন খাটের পাশে এসে বসতে। অগত্যা বনহুর নিজের চেয়ারখানা টেনে নিয়ে বসেছিলো এসে খাটের পাশে।
একি, নীহার কখন যে বনহুরের চেয়ারের পাশে মাথা রেখে এমন করে ঘুমিয়ে পড়েছে সে জানে না। কখন যে তার মাথাটা গড়িয়ে চলে এসেছে বনহুরের কাঁধের ধারে তাও টের পায়নি। বনহুর দেখলো নীহারের গন্ডটা ঠিক তার চিবুকের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে এসেছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে ললাটে।
বনহুরের সমস্ত দেহে একটা অনুভূতি নাড়া দিয়ে গিলো। হঠাৎ সে নীহারের মাথাটা সরিয়ে দিতে পারলো না। আস্তে তার ঠোঁট দু’খানা স্পর্শ করলো নীহারের শুভ্র গন্ডটার উপর। পরক্ষণেই বনহুরের সম্বিৎ ফিরে এলো, নীহারের মাথাটা সাবধানে নামিয়ে রেখে সোজা উঠে দাঁড়ালো। তাকিয়ে দেখলো বৃদ্ধ আবু সাঈদ খাটে ঠেস দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছেন। কেশবও তার চেয়ারে বসে বসে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে হয়তো।
বনহুর রিভলভারটা পকেটে রেখে বেরিয়ে এলো বাইরে।
*
আজ রাতে নানারকম ভয়ঙ্কর কিছুর উদ্ভব ঘটলেও কোন প্রাণনাশ ঘটেনি। আবু সাঈদ আশ্বস্ত হলেন–আজকের সাবধানতা তাহলে ব্যর্থ হয়নি। এজন্য বারবার ধন্যবাদ দিলেন তিনি নাবিক আলমকে। কারণ তার পরামর্শেই আবু সাঈদ এভাবে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। সকলের মনে ভয়ভীতি আর আতঙ্ক থাকলেও কেউ দ্বীপে অবতরণ নিয়ে আজ কোনো রকম মতবাদ করলো না। সবাই দ্বীপে নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য উদগ্রীব হয়ে কাজ করে চললো।
বেশ কিছু সময়ের মধ্যে দ্বীপটার ভিতর হতে বেরিয়ে এলো নানারকম অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিসপত্র আর নানারকম দালান-কোঠার ভগ্নাংশ।
এককালে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপটা যে মস্তবড় একটা শহর ছিলো তাতে কোনো সন্দেহ রইলো না।
বনহুর নিজেও আবু সাঈদের সঙ্গে গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করলো। যতই মৃত্তিকা খনন করে চললো ততই দ্বীপটাকে রহস্যময় বলে মনে হতে লাগলো। অনেক নীচ অবধি খনন করায়। বেরিয়ে এলো সব চাপা-পড়া কক্ষের মেঝের অংশ। বনহুর কয়েকজনকে নিয়ে পূর্বের ঐ সিঁড়ির ভগ্নধাপ লক্ষণীয় জায়গাটা খনন করে চললো। নিজ হস্তে সে শাবল চালাতে লাগলো।
প্রখর রৌদ্রে বনহুরের সুন্দর মুখমন্ডল রক্তাক্ত হয়ে উঠলো। ঘামে ভিজে গেলো তার জামাকাপড়। তবু অক্লান্তভাবে মৃত্তিকা খনন করে চলেছে।
কেশব তাকে বাধা দিয়ে বললো–বাবু, আপনি এসব করছেন কেন? আপনি শুধু আদেশ করুন, আমরাই তো আছি।
কেশবের কথার কোনো জবাব দিলো না বনহুর, সে যেমন কাজ করে যাচ্ছিলো তেমনি করে চললো।
অগত্য কেশবও নীরবে কাজ করতে লাগলো।
বেলা ক্রমান্বয়ে বেড়ে উঠেছে।
সূর্যের তাপ আরও তীব্র জ্বালাময় হয়ে উঠেছে।
শ্রমিকগণ যে যার কাজে ব্যস্ত।
বৈকালের আগেই তাদের কাজ শেষ করে ফিরে যেতে হবে জাহাজে। কাজেই কেউ বিশ্রাম গ্রহণ না করে অবিরাম মৃত্তিকা খনন করে যাচ্ছে।
এমন সময় আবু সাঈদের সঙ্গে নীহার এসে দাঁড়ায় সেইস্থানে যেখানে বনহুর কয়েকজন শ্রমিকসহ কাজ করে চলেছে।
বনহুরকে নিজ হস্তে শাবল চালাতে দেখে আবু সাঈদ এবং নীহার বিস্ময় প্রকাশ করলো। আবু সাঈদ বললেন– আলম, তুমি নিজে না করে শ্রমিকদের আদেশ করলেই পারতে?
নীহারের আঁখি দুটিতে প্রশংসনীয় দৃষ্টি, নিষ্পলক নয়নে সে তাকিয়ে আছে বনহুরের ঘর্মাক্ত পৌরুষদীপ্ত মুখমন্ডলের দিকে। সমস্ত দেহ ভিজে চুপসে উঠেছে বনহুরের–নীহারের বড় মায়া হলো।
বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ালো হাতের পিঠে ললাটের ঘাম মুছে নিয়ে বললো–স্যার, আমার তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।
তাহলেও এই প্রখর রৌদ্রে–বললো নীহার।
হেসে বললো বনহুর অভ্যাস আছে মেম সাহেব।
বনহুর কথাটা বলে পুনরায় কাজে আত্মনিয়োগ করলো। আবু সাঈদ আর নীহার এগিয়ে চললো অন্যদিকে। চলতে চলতে বললেন সাঈদ–সত্যি আলম অদ্ভুত ছেলে।
বললো নীহার–হাঁ আব্বা বড় অদ্ভুত।
দেখো মা, ওকে আমি যত দেখি ততই যেন আশ্চর্য হই। ওর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে আমি হতবাক স্তম্ভিত হয়ে যাই। শুধু তাই নয়, এমন চেহারার যুবক আমার চোখে আজ পর্যন্ত একটিও পড়েছে কিনা সন্দেহ—
আবু সাঈদ কথাগুলো বলতে বলতে এগুচ্ছিলেন। নীহারের মনে বয়ে যাচ্ছিলো একটা আনন্দের উৎস। পিতার উক্তিগুলো যেন তার কানে মধু বর্ষণ করছিলো।
আবু সাঈদ বললেন আবার ছেলেটা যদি নাবিক না হয়ে কোনো অভিজাত ঘরের হতো। তাহলে আমি নাসেরের সঙ্গে তোমার বিয়ে না দিয়ে আলমকেই জামাতা করে নিতাম–
