চলো আলম, তাই চলো।
নীহার বনহুরের সম্মুখে এগিয়ে এলো, দু’চোখে কৃতজ্ঞতার আভাস। মুখে কিছু না বললেও অন্তরে শ্রদ্ধা জানালো সে মনে মনে।
আর কেউ না বুঝলেও বনহুর বুঝলো নীহারের মনের কথা। বনহুর একটু হেসে বললো– মেম সাহেব, আপনিও নামবেন তো?
হাঁ, আমিও নামবো। বললো নীহার।
বনহুর এবার সমস্ত নাবিক এবং খালাসিকে নিয়ে দ্বীপে অবতরণ করলো। আবু সাইদ আর তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ কেউ বাদ রইলো না। অগত্যা নাসের জলিলের দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে নেমে পড়লো ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের উপর।
বনহুর আর নীহার আজ আবু সাঈদকে প্রথমেই সেই স্থানটিতে নিয়ে হাজির করলো, তাঁকে দেখালো গতদিন যে ফাটলটার মধ্যে তারা সিঁড়ির ধাপের মত কিছু আবিষ্কার করেছিলো।
আবু সাঈদের আনন্দ আর ধরে না, তিনি জড়িয়ে ধরলেন বনহুরকে–আলম, তুমি সত্যিই একজন জ্ঞানবান লোক। তোমার জন্য এতো সহজে আমি কৃতকার্য হতে চলেছি।
বনহুর শ্রমিকদের নিয়ে সিঁড়ির ধাপটির খননকার্যে আত্ননিয়োগ করলো। অন্যান্য শ্রমিকদের বিভিন্ন স্থানে খননকাজে লাগিয়ে দেওয়া হলো।
আবু সাঈদ নিজেও একটি শাবল নিয়ে এখানে-সেখানে মাটিতে আঘাত করতে লাগলেন।
সমস্ত দ্বীপময় চললো নানাভাবে গবেষণা।
অনেক স্থান খনন করে ইট-পাথর বা ঐ ধরনের কিছু কিছু পাওয়া গেলো। আবু সাঈদের বিস্ময়ের অন্ত নেই, তিনি মনোযোগ সহকারে সব লক্ষ্য করে চলেছেন।
বনহুর শ্রমিকদের নিয়ে ফাটলটা খনন করে চলেছিলো। অল্পক্ষণেই দেখা গেলো, সেটা কোনো দোতলায় উঠার সিঁড়ির ধাপ।
একজন শ্রমিক এসে জানালো, প্রায় মাইলখানেক দূরে মাটির নিচে একটি দালানের ছাদের কিছুটা অংশ দেখা গেছে।
আবু সাঈদ এবং বনহুর চললেন সেই জায়গাটায়।
অল্পক্ষণেই আজ তারা আবিষ্কারে সক্ষম হলো–এ দ্বীপটা কোনো এক ডুবন্ত নগরী। একদিন এখানে ছিলো অসংখ্য লোকের বাস। কালক্রমে সেই নগরী সাগরবক্ষে নিমজ্জিত হয়েছিলো এবং সেই নগরীর লোকজন সবাই জলের অতলে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলো।
সেদিন বেশি কিছু আবিষ্কার না হলেও দ্বীপের আসল অস্তিত্ব খুঁজে পেলো তারা। সবচেয়ে আনন্দে আপ্লুত হলেন আবু সাঈদ। তার এতো শ্রম সার্থক হলো। ফৌজিন্দিয়া দ্বীপটা যে একটি ডুবন্ত শহর বা নগর তাতে কোনো সন্দেহ রইলো না। এই দ্বীপের তলায় আছে অসংখ্য দালান কোঠা আর ইমারত। কিন্তু রাতের বেলায় এতো আলোর খেলা হয় কি করে? এবং গভীর রাতে ট্রেনের হুইসেলের মত কিসের শব্দ কানে তালা লাগিয়ে দেয়। এসব রহস্য রয়ে গেলো অজ্ঞাত। বেলা পড়ে আসতেই সবাই ফিরে এলো জাহাজে।
আজ জাহাজের নিচের ডেকে কেউ থাকবে না বলে জানানো হলো এবং জাহাজ ফৌজিন্দিয়া দ্বীপে নোঙর না করে গভীর সাগরবক্ষে ভাসমান অবস্থায় থাকবে।
সেইমতই কাজ হলো, বনহুর নিজে জাহাজ চালনা করে এমন এক জায়গায় জাহাজ নোঙর করলো যেখানে কোনো রকম বিপদের আশঙ্কা রইলো না।
জাহাজের কোনো শ্রমিক, নাবিক বা খালাসি নিচের ডেকে বা ক্যাবিনে রইলো না। সবাইকে উপরের ক্যাবিনে রাখা হলো এবং সাবধানে প্রত্যেকটা জানালার শাশী আটকে দেওয়া হলো।
এতো সাবধানতা সত্ত্বেও সকলেরই মনে ভয় আর আশঙ্কা না জানি আজ আবার কার মৃত্যু ঘটতে পারে–কে জানে।
আবু সাঈদ আর নীহারের অনুরোধে বনহুর আর কেশব তাদের ক্যাবিনে রয়েছে। কারণ নীহার অত্যন্ত ভয় পেয়েছে, সে কিছুতেই শয্যা গ্রহণ করতে পারছিলো না।
রাত হয়।
সমস্ত জাহাজ নিস্তব্ধ।
কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই।
প্রত্যেকটা ক্যাবিনে সবাই জেগে, সকলেরই মনে উৎকণ্ঠা কখন কি ঘটে!
বনহুর আর কেশবকে বসিয়ে আবু সাঈদ আলাপ-আলোচনা করছিলেন।
নীহার জেগে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। আজ কদিন তার ঠিকভাবে ঘুম নেই, হাজার হলেও মেয়েমানুষ তো নেতিয়ে পড়েছে একেবারে।
যতই ভীত এবং আতঙ্কগ্রস্ত হোক, বেশিক্ষণ নিস্তব্ধ থাকায় সকলেরই কেমন যেন প্রচন্ডভাবে দুলে উঠলো।
মুহূর্তে জাহাজের মধ্যে একটা আর্তগুঞ্জনধ্বনি ফুটে উঠলো যে যেখানে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো সবাই জেগে উঠেছে তৎক্ষণাৎ। নীহারও বিছানা হতে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিলো, জেগে উঠে আঁকড়ে ধরলো খাটের ধারটা।
আবু সাঈদ এবং বনহুর সজাগ হয়ে রিভলভার বাগিয়ে ধরে উঠে দাঁড়ালেন। কারো মুখে কোনো কথা নেই, সবাই ভয়বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে এ-ওর দিকে।
নীহার পিতাকে আঁকড়ে ধরলো-আব্বা!
ভয় নেই মা, ভয় নেই–কন্যাকে মিথ্যা আশ্বাস দিতে লাগলেন আবু সাঈদ।
জাহাজখানা খানিকক্ষণ ভীষণভাবে দুলতে লাগলো। তারপর একবার একেবারে সম্পূর্ণ কাৎ হয়ে যাবার মত হলো। এইবার বুঝি আর রক্ষা নেই, জাহাজটা এবার ডুববে।
কিন্তু পরক্ষণেই জাহাজ একটা ঝাঁকি খেয়ে সোজা হয়ে গেলো। আর নড়ছে না জাহাজটা।
ক্রমে জাহাজের অভ্যন্তরে ভয়-বিহ্বল আর্তনাদ থেমে এলো। জাহাজের ক্যাপ্টেন মাইকে বার বার ঘোষণা করছেনঃ কেউ যেন ক্যাবিনের বাইরে বের না হয়।
জাহাজখানা স্থির হলেও মনে হলো, সাগরের ঢেউ-এর উপর যেন ধীরে ধীরে দোল খাচ্ছে।
বনহুর দ্রুত ক্যাবিনের শাশীর পাশে গিয়ে সাগরের জলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলো। কিন্তু কিছুই নজরে পড়লো না শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার।
কয়েক মিনিট পর হঠাৎ সেই হুইসেলের তীব্র শব্দ। কানফাটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ। যেন। জাহাজের অনতিদূরে কোথাও ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে।
