আবু সাঈদ যতই মুষড়ে পড়ছেন ততই জাহাজে কর্মচারীবৃন্দ বেঁকে বসছে, কেউ আর একটি দিন এ দ্বীপে রাত্রি কাটাতে রাজি নয়।
শেষ পর্যন্ত আবু সাঈদ প্রচুর অর্থের লোভ দেখালেন, যা টাকা তাদের দেওয়া হয় তার দ্বিগুণ পরিমাণ দেওয়া হবে। কিন্তু কিছুতেই তারা এ দ্বীপে অবতরণে সম্মত হলো না।
আবু সাঈদ যখন হতাশায় ভেঙে পড়েছেন তখন বনহুর তার পাশে এসে দাঁড়ালো–স্যার, ভাববেন না! চলুন আমি যাবো আপনার সঙ্গে।
আলম!
হাঁ স্যার। আর যতদিন আমাদের সন্ধান-কার্য শেষ না হবে ততদিন জাহাজ এ দ্বীপেই থাকবে।
আবু সাঈদ কথাটা ঘোষণা করে জানিয়ে দিলেন জাহাজের সবাইকে।
সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত খালাসি এবং নাবিকগণ বিদ্রোহী হয়ে উঠলো, সবাই দল বেঁধে এসে দাঁড়ালো। আবু সাঈদের ক্যাবিনের সম্মুখে, সমস্বরে বললো সবাই আমরা আর এক দিনও এ দ্বীপে অবস্থান করতে রাজি নই।
আবু সাঈদ অসহায়ভাবে তাকালেন বনহুরের মুখের দিকে, বললেন–এখন উপায়?
নীহারও পিতার পাশে পঁড়িয়েছিলো এখন তাদের একমাত্র ভরসা যেন নাবিক আলম। জাহাজের সকলের মুখই ভয়-বিহ্বল, এমন কি আবু সাঈদের সঙ্গী-সাথী যারা এতোদিন তার একান্ত বন্ধু হিসাবে পর্যটন জীবনের সহচর ছিলেন তাঁরাও সবাই কেমন যেন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, কারো মনেই যেন আর উৎসাহ-উদ্দীপনা নেই। সবাই আবু সাঈদের কথায় অমত জানিয়ে ফিরে যাবার বাসনা জানাচ্ছেন কারণ সকলেরই তো স্ত্রী-পুত্র-সন্তান-সন্ততি আছে, কে এভাবে মরতে চায়? চারিদিকে যখন নিরুৎসাহের চরম অবস্থা, তখনও নাবিক আলমের মুখ দীপ্ত ভয়শূন্য; ঠিক পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক।
শুধু নীহারই নয় স্বয়ং আবু সাঈদ পর্যন্ত তাকে যত দেখেন ততই বিস্মিত হন, সত্যি এমন ব্যক্তি তিনি খুব কমই দেখেছেন। শত বিপদেও যার মধ্যে কোনোরকম ভাবান্তর পরিলক্ষিত হয় না। নির্ভীক যুবক এই আলম।
আবু সাঈদের প্রশ্নে জবাব দিলো বনহুর–স্যার, বিচলিত হবেন না। আমি সবাইকে ঠান্ডা করে নিচ্ছি।
বনহুর ক্যাবিনের বাইরে বেরিয়ে এলো।
জাহাজের প্রায় কর্মচারী–খালাসি হতে নাবিক, ক্যাপ্টেন সবাই এসে জড়ো হয়েছে, সবাই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে–আর তারা এ দ্বীপে বিলম্ব করতে চায় না।
বনহুর এসে দাঁড়ালো সবার মধ্যে।
এ জাহাজে একমাত্র নাসের এবং জলিলের দলের কয়েকজন সঙ্গী ছাড়া সবাই আলমকে গভীরভাবে ভালবাসতো এবং সমীহ করতো। বনহুর এসে দাঁড়াতেই ক্ষণিকের জন্য সবাই স্তব্ধ। হলো, উন্মুখ হৃদয় নিয়ে তাকালো তার দিকে।
বনহুর শান্ত-ধীর-স্থির কণ্ঠে বললো-”ভাইগণ, আমরা যে অবস্থায় উপনীত হয়েছি তাতে ঘাবড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। মৃত্যু ভয় কার না আছে! কিন্তু মৃত্যু প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই অবশ্যম্ভাবী। জন্মালে মরতে একদিন হবেই, কাজেই মৃত্যু-ভয়ে অত্যন্ত কাতর হওয়া আমাদের কোনো সময় সমীচীন নয়।
সবাই এক সঙ্গে বলে উঠলো–আলম ভাই, আমরা আর কোনো কথাই শুনতে রাজি নই।
বললো বনহুর–দেখো আমি জানি এবং নিজেও বেশ উপলব্ধি করছি, এ দ্বীপটা আমাদের জন্য অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল একটা ভয়ঙ্কর জায়গা। কিন্তু আমরা কাপুরুষ নই–আমরা যে কারণে বা যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ দ্বীপে এসেছি সে কাজ আমাদের সমাধা করা একান্ত কর্তব্য। এর চেয়েও যদি ভয়াবহ স্থানে আমাদের যাওয়া প্রয়োজন হয় তাই যেতে হবে। নূতন কিছু আবিষ্কার করতে হলে বিপদ-আপদ আসবেই–ভয়ঙ্করকে জয় করাই হলো পুরুষোচিত কাজ। বন্ধুগণ, আমার অনুরোধ, তোমরা মৃত্যু ভয়ে কাতর না হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে শেখো। মরতে যখন একদিন হবেই তখন ভয় কি মরণে–
বনহুরের দীপ্ত গম্ভীর কথাগুলো শুনে অনেকের মনেই পরিবর্তন আসছিলো কেউ কোনো কথা না বলে নিশ্চুপ শুনতে লাগলো। আলম যা বলছে, মিথ্যা নয় একটি বর্ণও।
বলে চলেছে বনহুর তখনও ঠিক তার পিছনে কখন যে আবু সাঈদ আর নীহার এসে দাঁড়িয়েছেন বনহুর বুঝতে পারেনি। আবু সাঈদ আর নীহারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে–সামান্য একজন নাবিক বৈতো কিছু নয় আলম, কিন্তু তার মধ্যে এতো বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ ভাব! তাদের চোখেমুখে বিস্ময়ভাব ফুটে ওঠে।
বনহুর বলে চলেছে–কোনো কাজে আত্মনিয়োগ করে সেকাজ যদি সমাধা না কর তাহলে তৃপ্তি কোথায়? কাজেই আমাদের মন থেকে ভয়-ভীতি আতঙ্ক মুছে ফেলতে হবে। দুর্দমনীয় সাহসে বুক বাঁধতে হবে। দেখতে হবে এর শেষ কোথায় এবং কি? ভাইগণ, তোমরা কোন্ মনে ফিরে যেতে চাও? যে শত্রু তোমাদের বন্ধু-সাথীদের এমন নির্মমভাবে নিহত করেছে তোমরা চাও না কি তার প্রতিশোধ নিতে?
এবার প্রায় অর্ধেকের বেশি লোক বলে উঠে–চাই, প্রতিশোধ চাই আমরা–
বনহুর আনন্দধ্বনি করে উঠে–সাবাস! তাহলে তোমরা সবাই এসো আমার সঙ্গে। মৃত্যুকে আমরা জয় করে আমাদের বন্ধুদের হত্যাকারী সেই অদ্ভুত জীবকে আবিষ্কার করি। বলো– তোমরা আমাকে সাহায্য করতে রাজি আছো?
এক সঙ্গে বললো এবার সবাই রাজি!
মরতে যদি হয় মরবে?
হাঁ মরবো!
বনহুরের মুখে অদ্ভুত এক আনন্দের দ্যুতি খেলে যায়। আবু সাঈদ তার পিঠ চাপড়ে বলেন– আলম, তোমাকে আমি কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।
বনহুর বললো–স্যার, এতে ধন্যবাদ জানাবার কিছু নেই, এখন চলুন দ্বীপে অবতরণের জন্য প্রস্তুত হয়ে নিন।
