আলমের কথায় কারো মুখে কোনো উক্তি উচ্চারণ হলো না। সবাই একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে কোনো এক ক্যাবিনের মধ্য হতে ভেসে এলো তীব্র ভয়ার্ত একটা আর্তনাদ। পরক্ষণেই পরপর বন্দুকের আওয়াজ। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেলো-বাচাও বাঁচাও গেলো গেলো–
ভয়ে থর থর করে কাঁপছে সবাই, এমনকি আবু সাঈদের মুখমন্ডলও ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে।
নাসের এবার বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মুখও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।
বনহুর কান পেতে শুনছিলো, বললো–নিশ্চয়ই গত রাতের সেই হস্ত আজ আবার কাউকে টেনে নিয়ে গেছে–
আবু সাইদ আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন–একি আজগুবি কান্ড শুরু হলো আলম?
তাই তো ভাবছি স্যার। পরক্ষণেই বনহুর পা বাড়ালো ক্যাবিনের দরজার দিকে–স্যার দেখে আসি–
আবু সাঈদ বাধা দিলেন–আলম, এখন যেও না। যেও না বাইরে—
বনহুর আবু সাঈদের নিষেধ শোনার জন নয়, তার ধমনির রক্ত তখন উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
নীহার হঠাৎ আচমকা ধরে ফেললো বনহুরের জামার পিছন অংশটা–আলম, যেও না।
এবার বনহুর দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলো, ফিরে দাঁড়িয়ে বললো–বাধা দিবেন না মেম সাহেব। ছেড়ে দিন আমাকে।
না না, তুমি যেও না আলম। বললেন আবু সাঈদ।
নীহার বনহুরের জামার অংশ আরও দঢ়হস্তে চেপে ধরলো–আমি তোমাকে যেতে দেবো না।
রাগতকণ্ঠে বললো বনহুর-সমস্ত মাটি করে দিলেন আপনারা! আবু সাঈদের দিকে লক্ষ্য করে বললো আবার –এতো ভীতু হলে কোন রহস্যই উঘাটন হবে না। ছেড়ে দিন আমাকে–
নীহারের শিথিল হাতখানা আস্তে খসে এলো, বনহুরের জামার অংশ মুক্ত হওয়ায় সে দ্রুত বেরিয়ে গেলো। কেশবও অনুসরণ করলো বনহুরকে।
আবু সাঈদ নাসেরকে লক্ষ্য করে বললেন–যাও নাসের, জলিলকে বলো লাঠিয়ালদের সবাইকে নিয়ে আলমের সঙ্গে যেতে–
নাসের ভয়-বিহ্বলভাবে তাকলো লাঠিয়াল সর্দার জলিলের দিকে।
জলিল বললো–স্যার, এ সব ভূতের ব্যাপার, লাঠিতে কিছু হবে না—
ধমক দিলেন আবু সাঈদ –যাও, কোনো কথা বাড়িও না।
অগত্যা জলিল আবু সাঈদের ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে গেলো, সম্মুখের একটা ক্যাবিনে অপেক্ষা করছিলো তার দলবল, মালিকের হুকুম–না গেলেও নয়। জলিলের দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বের হলো বটে কিন্তু এক পা এগোেয় তো তিন পা পিছোয়।
ওদিকে বনহুর আর কেশব দ্রুত পৌঁছে গেলো যেদিক থেকে আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসছিলো সেইদিকে।
নিকটে পৌঁছতেই বিস্মিত হলো বনহুর–একটা ক্যাবিনের ভিতর হতেই আর্তনাদের শব্দ বেরিয়ে আসছিলো। বনহুর ক্যাবিনের দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকলো–দরজা খোল, দরজা খোল
অনেক ডাকাডাকির পর দরজা খুলে গেলো।
বনহুর আর কেশব ভিতরে প্রবেশ করে প্রথমে কিছু বুঝতে পারলো না, জিজ্ঞাসা করলো সে–কি হয়েছে?
হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো একজন –ঐ দেখো, ঐদিকের শার্শী ভেঙে একজনকে নিয়ে গেছে। সেকি ভয়ঙ্কর মোটা কালো একখানা হাত–
বলো কি, হাত?
অন্যান্য সবাই বললো এক সঙ্গে–হাঁ ঠিক হাতের মত।
অন্য একজন ভীতকণ্ঠে বললো–হাতের মত কিন্তু হাত নয় ভাই, হাতির শুড়ের মত দেখতে
আর একজন বললো–যেমন মোটা তেমনি কালো।
ওদিকে একজন ঠক ঠক করে কাঁপছিলো সরে এলো সামনে ভাই আমি স্পষ্ট দেখেছি, দুটো চোখ আছে–যেন আগুনের গোলা–ওরে বাবা, ভাগ্যিস আমাকে তুলে নেয়নি বাচ্চু ঠিক আমার পাশেই শুয়েছিলো ওকে ধরে নিয়েই সড় সড় করে বেরিয়ে গেলো সুড়টা ভাঙা শাশী দিয়ে–
প্রথম ব্যক্তির হস্তে বন্দুক ছিলো সে বললো–আমি তাড়াতাড়ি গুলী ছুঁড়লাম, কিন্তু ততক্ষণে বাচ্চুকে নিয়ে শুড়টা অন্ধকারে পানির মধ্যে তলিয়ে গেছে–
বনহুর দ্রুত ভাঙ্গা শার্শীর মধ্য দিয়ে ঝুঁকে পড়লো কিন্তু গাঢ় অন্ধকার ছাড়া কিছুই নজরে পড়লো না।
ততক্ষণে আবু সাঈদ আরও কয়েকজন সঙ্গী-সাথী নিয়ে ভয়চকিত চিত্তে হাজির হলেন, তাঁর পিছনে নাসের এবং জলিলসহ লাঠিয়ালগণ।
সব শুনলেন এবং দেখলেন আবু সাঈদ। বাচ্চু নাবিকদের একজন ছিলো, দক্ষ কর্মঠ নাবিক ছিলো সে।
আবু সাঈদ একেবারে যেন বিহ্বল হয়ে পড়লেন। অন্যান্য সকলের মনেই ভয় আর আতঙ্ক না জানি কোন মুহূর্তে কার মৃত্যু ঘটতে পারে!
খালাসি এবং নাবিকদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিলো, তারা আর এ দ্বীপে একটি দিনও থাকতে রাজি নয়। পয়সার জন্য তারা জীবন দিতে পারবে না। হতো যদি কোনো অসভ্য জংলী বা বাঘ ভলুকের আক্রমণ তবু তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতো এবং লড়াই করে তবে মরতো। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর মৃত্যু তারা গ্রহণ করতে চায় না।
আজকের রাতটাও কাটলো নানা উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। সমস্ত রাত কেউ ঘুমাতে পারলো না।
ভোর হতেই সবাই ধরে বসলো, এবার তারা ফিরে যেতে চায়। গত প্রভাতে একজনকে হারিয়েও খালাসিদের মনে ছিলো অফুরন্ত উৎসাহ আর আজ ঠিক তার বিপরীত–সবাই মুখ। কালো করে ফেলেছে, কেউ আর দ্বীপে অবতরণে সম্মত নয়।
আবু সাঈদ হৃদয়ে এতোদিন যে একটা চুড়ান্ত জানার বাসনা নিয়ে বিপুল আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলেন, সব যেন আজ প্রভাতে নিঃশেষ হয়ে যায়। খালাসি এবং নাবিকদের নিরুৎসাহ ভাবভঙ্গী তাকে একেবারে হতোদ্যম করে দেয়। তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন, তাঁর আদেশও অমান্য করেছে আজ তার বিশ্বস্ত কর্মচারিগণ।
বেলা বেড়ে আসছে। ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন আবু সাইদ, এখন কি করবেন–এতোদূর এসে এতো অর্থব্যয় করে শেষ পর্যন্ত বিফলকাম হয়ে ফিরে যাবেন! শুধু অর্থব্যয়ই নয় পথে অনেক বিপদ-আপদ গেছে কয়েকটি জীবনও বিনষ্ট হয়েছে, এতো হওয়ার পর ফিরে যাওয়া কেমন যেন একটা চরম পরাজয়–চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লেন আবু সাঈদ।
