বনহুর বললো কে?
আমি! চাপা একটা কণ্ঠস্বর।
তুমি কে?
ফুলমিয়া!
ফুলমিয়া?
হ।
এখানে কি করছিলে?
কিছু না। কেমন যেন সঙ্কোচিত কণ্ঠস্বর।
বনহুর বললো–আমাকে হত্যা করতে এসেছিলে বুঝি?
ফুলমিয়ার গলা থেকে প্রথমে কোনো কথা বের হলো না, অন্ধকারেও তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো, বললো সে–বাবু! বাবু আপনাকে হত্যা করবো আমি! আপনি আমার জীবন রক্ষা করেছেন–কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে ফুলমিয়ার।
বলে বনহুর–তবে কি জন্য এসেছিলে ফুলমিয়া?
বাবু, শুধু আজ নয়, আমি রোজ রাতে আপনার ক্যাবিনের দরজায় পাহারা দেই।
হেসে বললো বনহুর–কেন?
বাবু, এ জাহাজে আপনার শত্রুর অভাব নেই।
তা জানি, কিন্তু তুমি—
বাবু ঐ দিন সিঁড়ির মুখ নষ্ট করে দিয়েছিলো ওরা আপনাকে বাঁচানোর জন্যই আমি জেনে শুনে সিঁড়িতে পা দিয়েছিলাম–
বলো কি ফুলমিয়া!
হ বাবু, আমাদের লাঠিয়াল সর্দার ছোট স্যারের যুক্তিতে আপনার পিছু লেগেছে।
সব জানি, তোমাকে বলতে হবে না ফুলমিয়া। যাও এভাবে বাইরে থাকা তোমার কোনোমতেই ঠিক নয়। হঠাৎ কোনো বিপদ ঘটতে পারে।
ফুলমিয়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
বনহুর বললো–চলো তোমার ক্যাবিনে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি, রাত দুটো বেজে গেছে, বাইরে কেউ নেই।
ফুলমিয়াকে ক্যাবিনে রেখে ফিরে চললো বনহুর আর কেশব। নির্জন ডেকে একটিও জনপ্রাণী নেই, প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্যাবিনে আত্মগোপন করে বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে।
সাগরবক্ষ অমাবস্যার অন্ধকারের মতই কালো। ডেকের উজ্জ্বল আলোকরশ্মিও কেমন নিষ্প্রভ স্নান লাগছে।
বনহুর আর কেশব পাশের ডেকে এসে দাঁড়ালো, বনহুরের হস্তে রিভলভার আর কেশবের হাতে বন্দুক। ডেকে দাঁড়িয়ে তাকালো তারা দুজন ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের দিকে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো বনহুর আর কেশব। দেখতে পেলো, কতকগুলো নীলাভ আলোর বল দ্বীপটার বুকে। ছুটোছুটি করছে।
কেশব ভীতকণ্ঠে বললো–বাবু, ভূতের আলো—
বনহুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে সত্যি আলোগুলো যেন কোনো অদৃশ্য হস্তের উপর নড়াচড়া করছে। আলোগুলো আকারে ছোটবড় অনেক রকম কিন্তু প্রায় সবগুলোই নীলাভ।
এই তো ঘন্টাকয়েক আগেও তারা ঐ দ্বীপে বিচরণ করে ফিরেছে কিন্তু কোথাও তো কিছু দেখতে পেলো না।
বনহুর যখন ডেকে দাঁড়িয়ে আলোর খেলা দেখছে তখন কেশব ভয়বিহ্বল কণ্ঠে বললো বাবু, বাইরে থাকবেন না।
বললো বনহুর–কেন?
বাবু, ভূতেরা অশরীরী–ওদের আমরা দেখতে না পেলেও ওরা আমাদের ঠিক দেখতে পাচ্ছে। হঠাৎ এদিকে এসেও পড়তে পারে।
হাতে অস্ত্র থাকতে কোনো ভয় নেই কেশব।
বাবু, অস্ত্র ভূতের কিছু করতে পারে না, ওদের তো দেহ নেই। দেখছেন না আলোগুলো কেমন শূন্যের উপর যেন নেচে বেড়াচ্ছে। দেহ থাকলে তো গুলী ছুঁড়বেন?
বেশ চলো, তোমার যখন এতো ভয়! বনহুর কথাটা বলে ফিরে দাঁড়াতেই দু’জন লোক এসে দাঁড়ালো তার পাশে। একজন বললো–স্যার আপনাকে ডাকছেন।
বনহুর বুঝতে পারলো, দ্বীপের আলোকরশ্মির ব্যাপারেই তাকে ডাকছেন আবু সাঈদ, বললো–চলো।
কেশব বললো–বাবু, আমিও যাবো আপনার সঙ্গে।
বেশ চলো। বনহুর অগ্রসর হলো।
বনহুরের পিছনে চললো কেশব আর ঐ লোক দু’জন।
কেশব যেমন ভয়ে কুঁকড়ে গেছে তেমনি লোক দু’টিও ভয়ে এতোটুকু হয়ে গেছে যেন, মুখে। যেন কারো কথা সরছে না। মালিকের হুকুম বলেই লোক দু’টি এই ভীতিকার মুহূর্তেও বাইরে বেরিয়ে এসেছে আলমকে ডাকতে। কোনোরকমে পৌঁছতে পারলে তবে হয়। লোক দুটি এবং কেশব বার বার ভয়াতুর দৃষ্টি মেলে তাকাচ্ছিলো দূরে দ্বীপের বুকে আলোর বলগুলোর দিকে। এখন আরও বেড়ে গেছে যেন।
বনহুর কেশব, আর লোক দু’জন আবু সাঈদের ক্যাবিনে এসে হাজির হলো।
আবু সাঈদ কক্ষমধ্যে উদ্বিগ্ন মুখে পায়চারি করছেন। অদূরে কাঁচের শাশীর পাশে দাঁড়িয়ে নীহার এবং আরও বেশ কয়েকজন লোক। তাদের মধ্যে নাসেরও আছে দেখতে পেলো বনহুর। নাসেরের মুখেও ভীতির ভাব। কেমন যেন বিবর্ণ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে সবাইকে।
বনহুর, কেশব আর লোক দু’টি ক্যাবিনে প্রবেশ করতেই আবু সাঈদ দাঁড়ালেন, এগিয়ে এলেন বনহুরের পাশে–দেখেছো আলম?
বললো বনহুর–হ্যাঁ স্যার।
কিসের আলো বলে তোমার মনে হয়?
বনহুর কিছু বলবার পূর্বেই বলে উঠে কেশব–স্যার, ওগুলো ভূতের আলো ছাড়া কিছু নয়। দেখছেন না আলো গুলো কেমন শূন্যের উপর নড়াচড়া করছে। ভূত অশরীরী কিনা, তাই ওদের দেখা যায় না, শুধু ওদের মুখের আগুন দেখা যায়।
নীহার তো পিতার পাশে কুঁকড়ে দাঁড়িয়েছে, ভয়ে বিবর্ণ তার মুখমন্ডল। কিঞ্চিৎ সাহস সঞ্চয়ের জন্য মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে সে নাবিক আলমের মুখে। ভূতের নামে তার হৃদকম্প শুরু হয়েছে, দেহটাও কাঁপছে বলে মনে হচ্ছে।
নাসেরের মুখেও অসহায় ভাব ফুটে উঠেছে। সেও ক্রমান্বয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে এসেছে তাদের পাশে।
আবু সাঈদ বললেন–বাজে কথা, ভূত বলে কিছু নেই।
বললো বনহুর–স্যার, ভূত না থাকলেও এমন কোনো জিনিস ঐ দ্বীপে আছে যাদের শক্তি ভূতের শক্তির চেয়েও বেশি।
বনহুর কথাটা এমন করে বললো যাতে কক্ষমধ্যে সকলের মনে ভীতি-ভাবটা আরও দৃঢ় হয়।
আবু সাঈদ বললেন–তবে কি কোনো–
হাঁ স্যার, কোনো অশরীরী আত্মা ছাড়া এমন আলো কে জ্বালতে পারবে বলুন? দেখছেন না আলোগুলো কেমন নীলাভ?
আবু সাঈদ আলমের মুখে কথাটা শুনে একটু হকচকিয়ে গেলেন, কারণ তিনি কোনো ভূত প্রেত বা অশরীরী আত্মা বিশ্বাস করেন না। শুধু আবু সাঈদ কেন, ক্যাবিনে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা এসব কোনোদিন কানেও নেননি বা নেন না। নাসেরের তো কোনো কথাই নেই, সে কোনোদিন কোনো সময় এসব বিশ্বাস করে না। আজ এমন এক মুহূর্তে কথাটা তাদের কানে গেলো যখন তারা দিনকে রাত আর রাতকে দিন বললেও বিশ্বাস করে বসতো।
