বনহুর আর নীহার চলতে লাগলো।
বনহুরের কথাগুলো এখনও নীহারের কানে ভাসছে যেন।–আমার সান্নিধ্যে যে এসেছে সে শুধু ব্যথা আর দুঃখই পেয়েছে। যার কাছে যখন গিয়েছি এতোটুকু আনন্দ নিতে, সেই আমাকে উপহার দিয়েছে অশ্রু। অশ্রু ছাড়া আমি কারো কাছে আনন্দ খুঁজে পাইনি।–নীহারের মন করুণায় ভরে উঠে, সত্যি আলম বড় অসহায়। কি করে ওকে সুখী করা যায় ভাবতে লাগলো সে। আলম কি পেলে আনন্দ পাবে, কি চায় সে?–
হঠাৎ নীহারের চিন্তাধারায় বাধা পড়ে, কয়েকজন লোক-সহ আবু সাঈদ এদিকেই এগিয়ে আসছেন, আলম আর নীহারকে দেখে তাদের সম্মুখে এলেন, কন্যাকে সম্বোধন করে বললেন এই যে মা এসে গেছো? তবে যে নাসের বললো আলম তোমাকে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেছে?
নীহার একবার নাসেরের দিকে ক্রুদ্ধদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বললো–আলম আলম আমাকে নিয়ে যায়নি আব্বা, আমিই আলমকে সঙ্গে করে দ্বীপের ওদিকটা দেখছিলাম।
ও তাই বলো। এসো আলম, হ নতুন কিছু দেখলে ওদিকে?
হাঁ স্যার দেখেছি এবং আমি একটা স্থির সিদ্ধান্তেও পৌঁছেছি।
বলো কি আলম? আমরা এতোদূর অগ্রসর হলেও এখনও এ দ্বীপ সম্বন্ধে কোনোরকম কিছু আবিষ্কারে সক্ষম হলাম না। আচ্ছা বলো দেখি কি ব্যাপার?
স্যার, আমি ওদিকে একটা ইটের টুকরা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম।
ইটের টুকরা!
হ্যাঁ স্যার।
নাসের বলে উঠলো–এ আবার এমন কি জিনিস?
বলো কি নাসের, এইরকম মনুষ্যবিহীন দ্বীপে ইটের টুকরা কম কথা।
অন্য একজন বলে উঠলো–কোনো জাহাজ থেকে হয়তো ইটের টুকরাটা দ্বীপে নিক্ষেপ করা হয়ে থাকবে।
নাসের লোকটার কথায় সায় দিয়ে বলে উঠলোহ, আমারও ঐরকম মনে হয়।
বনহুর নিশ্চুপ রইলো কারণ সে তর্ক ভালবাসে না।
নীহার বললো এবার–শুধু ইটের টুকরাই নয় আব্বা, এই অল্প সময়ে আলম এমন একটা জিনিস আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছে যা আপনারা এখনও পারেননি।
আবু সাঈদ হাস্যোজ্জ্বল দীপ্তমুখে তাকালেন।
বললো নীহার–আরও পরে বলবো, তার পূর্বে তোমরা কি আবিষ্কার করেছো দেখি?
এখনও তেমন কিছু আবিষ্কারে সক্ষম হইনি মা, তবে দ্বীপটা বড় আশ্চর্য এবং অদ্ভুত। কোথাও কোন বন-জঙ্গল বা আগাছা জন্মায়নি আজও। শুধু বালি আর মাটি। হাঁ আজ বেশিক্ষণ এ দ্বীপে বিলম্ব করা উচিৎ নয়।
নীহার এবং আলম সম্পূর্ণ গোপন করে গেলো সেই ফাটলে সিঁড়ির ধাপের কথা।
সেদিন বেশিক্ষণ দ্বীপে বিলম্ব না করে সবাই ফিরে এলো জাহাজে। কারণ নতুন দ্বীপ, তাছাড়া নানারকম বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে।
নীহার পিতার নিকটেও কোনোরকম কিছু বললো না। আলম বলেছিলো প্রথমে সে দেখবে ঐ সিঁড়ির ধাপের নিচে কি আছে। কাজেই এ ব্যাপারে নিশ্চুপ রইলো সে।
দ্বীপে রাতে কিসের আলো দেখা যায়, কিসের শব্দ শোনা যায়, জানার বাসনায় উদগ্রীব রইলো সবাই। দ্বীপের অনতিদূরে জাহাজ নোঙর করে রাখা হলো। গতরাতে একজন খালাসি নিরুদ্দেশ হয়েছে, কাজেই সকলের মনেই আতঙ্ক–আজ রাত কেমন কাটবে কে জানে!
প্রত্যেকেই রাত্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে নিচ্ছে।
আবু সাঈদ জানেন, এ দ্বীপে এমন কিছু আছে যার জন্য এ দ্বীপ সম্বন্ধে আজও কেউ সম্পূর্ণ অভিজ্ঞ নয়। মনের মধ্যে নানারকম চিন্তাধারা নিয়ে রাত্রির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন আবু সাঈদ এবং জাহাজের সবাই।
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে আসতে লাগলো। অজানা দ্বীপটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো, জাহাজের ডেকেও নেমে এলো গভীর অন্ধকার।
পর্যটকগণ প্রত্যেকেই যার যার ক্যাবিনে আশ্রয় নিলেন। নাসের আবু সাঈদের পাশে পাশে রইলো তার লাঠিয়াল সর্দার জলিলকে নিয়ে। কারণ কোনো বিপদ দেখা দিলে লাঠিয়াল পাহারাদারগণ যেন তাদের রক্ষার্থে এগিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে আবু সাঈদের সন্তুষ্টির কারণে মনোযোগী হয়েছে নাসের।
সন্ধ্যার পরই খাওয়া-দাওয়া পর্ব চুকিয়ে নেয় সবাই। আবু সাঈদ সাহেবের নির্দেশে সকলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হয়ে রইলো।
রাত বেড়ে আসছে।
সমস্ত জাহাজ নিস্তব্ধ। যার-যার চ্যাবিনে সবাই স্তব্ধ নিশ্বাসে প্রতীক্ষা করছে, কিন্তু সকলের দৃষ্টিই রয়েছে শার্শীর মধ্য দিয়ে অদূরস্থ দ্বীপটার দিকে। ত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপটা জমাট অন্ধকারে গাঢ় হয়ে উঠেছে।
আবু সাঈদ দূরবীক্ষণ চোখে লাগিয়ে দেখেছেন, পাশে দাঁড়িয়ে নাসের–তার হস্তেও একটি দূরবীক্ষণ।
জলিল এবং আরও কয়েকজন লাঠিয়াল ক্যাবিনের সম্মুখস্থ ছোট ক্যাবিনটার মধ্যে বসে বসে বিড়ি ফুকছে। ক্যাবিনের দেয়ালে ঠেশ দিয়ে রেখেছে তাদের লাঠি আর শরকীগুলো।
যে-যার ক্যাবিনের কাঁচের মধ্য দিয়ে তাকিয়ে দেখছে, দ্বীপের আলোগুলো কখন জ্বলে উঠে।
বনহুর রিভলভার হাতে ক্যাবিন থেকে বাইরে বের হতে যাচ্ছিলো, কেশব পথরোধ করে দাঁড়ালোবাবু, জাহাজের ডেকে একটি প্রাণীও নেই, আমি আপনাকে যেতে দেবো না।
হেসে বললো বনহুর–দ্বীপের রহস্য ভেদ করতে এসে সবাই যদি আমরা ক্যাবিনের মধ্যে লুকিয়ে থাকি, তাহলে রহস্য উঘাটন হবে কি করে? যেতে দাও কেশব।
তাহলে আমিও যাবো আপনার সঙ্গে?
বেশ তাই চলো। আবু সাঈদ সাহেব তোমাকে দেহ রক্ষার্থে যে বন্দুক দিয়েছেন ওটা তাহলে সঙ্গে নিয়ে নাও।
কেশব এবার খুশি হলো বনহুরের কথায়, সে দ্রুত তার বন্দুকটা নিয়ে বললো–চলুন বাবু।
বনহুর আর কেশব ক্যাবিন থেকে যখন বাইরের ডেকে বেরিয়ে এলো তখন অন্ধকারে কে যেন সম্মুখে এসে দাঁড়ালো তাদের।
