পর্যটকদলসহ আবু সাঈদ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লেন। জাহাজের প্রায় সকলেই দ্বীপে অবতরণ করেছে। নাসেরের দলও বাদ যায়নি।
আলম আর নীহার এগিয়ে যাচ্ছে আবু সাঈদের দলে মিলিত হবার জন্য।
নাসের আর জলিল তাদের হতে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিলো, বললো নাসের জলিলকে লক্ষ্য করে–ফৌজিন্দিয়া থেকে নাবিক আলম যেন ফিরে যেতে না পারে বুঝেছো?
হাঁ ছোট স্যার সে কথা বলতে হবে না। জলিলের মুখটা যেন প্রতিহিংসায় বিকৃত হয়ে উঠলো। পকেট থেকে একটা ছোরা বের করে মেলে ধরলো–এটা দিয়েই ওকে শেষ করবো।
নাসের পিঠ চাপড়ে দিলো জলিলের।
ততক্ষণ দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে আলম আর নীহার।
নীহার অবাক হয়ে দেখছে সব। উঁচুনীচু আর অদ্ভুত টিলার মত সব জায়গাগুলো। কোথাও গাছ-গাছড়া বা কোনো রকম উদ্ভিদ জন্মেনি এখনও। শুধু বালি আর লালচে মাটির স্তূপ।
বনহুর নিপুণ দৃষ্টি মেলে সব লক্ষ্য করছে আর এগুচ্ছে। শরীরে তার স্বল্পদামী নাবিকের ড্রেস। পায়ে মজবুত বুট, মাথায় নাবিকের ক্যাপ। সকলের অজ্ঞাতে বনহুর পকেটে লুকিয়ে নিয়েছে সেদিনের নাসেরের হস্তচ্যুত সেই রিভলভারখানা। এখনও সেটাতে কয়েকটি গুলীই মওজুদ রয়েছে কারণ একটিও খরচ হয়নি।
নীহার এগুচ্ছে আর এটা-সেটা নিয়ে বনহুরকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছে। তাকে আজ বনহুর নতুন রূপে দেখতে পাচ্ছে যেন। এমন সচ্ছভাবে নীহার কোনোদিন আলমের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযোগ পায়নি, কোনো দ্বিধা নেই যেন আজ ওর মধ্যে।
অনেক দিন পর বনহুর নিজেও আজ বেশ আনন্দ উপভোগ করছে নতুন একটা দ্বীপে নতুন। কিছু আবিষ্কারের নেশায় মেতে উঠেছে সে।
চলতে চলতে হঠাৎ বনহুর মাটির উপর বসে একটা কিছু হাতে উঠিয়ে নিলো, নীহার বললো–ওটা কি আলম?
বনহুর জিনিসটা মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করে বললো “এটা একটা ইটের টুকরা বলে মনে হচ্ছে।
হেসে উঠলো নীহার ওটা এমন আর আশ্চর্যের কি?
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–মানুষের বসবাস থেকে লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে সাগরবক্ষে নিমজ্জিত এক দ্বীপে মানুষের তৈরি ইটের টুকরা কম আশ্চর্য নয়, নীহার। .
এতোক্ষণে নীহার বনহুরের ভাবান্তরের কারণ কিছুটা উপলব্ধি করলো। নীহার বনহুরের হাত থেকে ইটের টুকরাটা নিয়ে বললো–বহুকাল আগের ইট হবে, দেখছোনা কেমন অদ্ভুত ধরনের তৈরি?
হাঁ, বহুকাল আগের ইটই বটে! কিন্তু এই দ্বীপে ইট এলো কি করে? বনহুর চলতে শুরু করলো।
নীহার ওকে অনুসরণ করছে।
বললো বনহুর চলো এবার তোমার আব্বার কাছে তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
কেন, তোমার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে?
হেসে বললো বনহুর–আমার নয় তোমার হচ্ছে হয়তো। তাছাড়া শুধু অসুবিধা নয় নীহার, তোমাকে এতোক্ষণ না দেখে তোমার আব্বা হয়তো উদ্বিগ্ন হয়েছেন।
চলো তাহলে–বিমর্ষ কণ্ঠে বললো নীহার।
বনহুর বললো দ্বীপটা সত্যি অদ্ভুত।
আমার কিন্তু খুব ভাল লাগছিলো। কি সুন্দর সকাল, চলো না একটু বসি ওদিকে।
উঁ, কি বললে?
বললাম ঐ উঁচু টিবিটার উপর একটু বসি, পা ধরে গেছে আমার।
বেশ চলো।
বনহুর আর নীহার সামনের উঁচু একটা জায়গা দেখে বসে পড়লো। সেখান থেকে বেশ কয়েক হাত দূরে নিচে সমুদ্রের ঢেউগুলো ছুটে এসে আছাড় খেয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে।
সেদিকে তাকিয়ে বললো নীহার–আলম, তোমার মা-স্ত্রী সন্তান কি জীবিত আছে?
হ তারা জীবিত।
একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে ত্যাগ করে বললো নীহার–আলম, তোমার জননী সৌভাগ্যবতী মা–সত্য তিনি রত্নগর্ভা। আর তোমার স্ত্রী গৌরবান্বিতা নারী, তোমার মত স্বামী যার সে যে বড়। গর্বিতা–
হেসে উঠলো বনহুর নীহার তুমি ভুল বলছো। আমার সান্নিধ্যে যে এসেছে যে শুধু ব্যথা। আর দুঃখই পেয়েছে। তোমাকে সেদিন কি বলিনি আমার মা, আমার স্ত্রী এদের মত ভাগ্যহীনা নারী এ পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
আলম, আমি বিশ্বাস করি না তোমার একথা। আমি জানি, তুমি কোনোদিন মাকে কষ্ট দিতে পারো না। আমি জানি তোমার মত স্বামী পেয়েও কোনো নারী অসুখী হতে পারে না–
নীহার, তোমার কথা সত্য কিনা আমি জানি না, কারণ কারো মন নিয়ে ভাববার সময় আমার হয় না। আমি যতটুকু জানি, তাতে মনে হয় ওরা কেউ সুখী বা আনন্দিত নয়। জানো নীহার, আমি যার কাছে যখন গিয়েছি একটু আনন্দ নিতে সেই আমাকে উপহার দিয়েছে অশ্রু। অশ্রু ছাড়া আমি কারো কাছে আনন্দ খুঁজে পাইনি। বলো বলো নীহার তাহলে আমি কি করে জানবো তারা আমাকে পেয়ে খুশি বা সুখী।
বনহুরের মুখে তন্ময় হয়ে তাকায় নীহার, তার কথাগুলো ঠিক গভীরভাবে বুঝতে পারেনা।
বনহুর নীহারের মনকে সচ্ছ করার জন্য অন্য কথা পাড়ে–এখানে এভাবে বসে সময় নষ্ট করা উচিৎ নয়, চলো ওঠা যাক।
চলো! উঠে পড়ে নীহার আর বনহুর।
হঠাৎ পিছন ফিরতেই একটা ফাটল নজরে পড়লো বনহুরের। এগিয়ে গিয়ে ফাটলটার মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলো সে, বেশ বড়সড় ফাটলটা। ঠিক কোনো সিঁড়ির ধাপ ছিলো পূর্বকালে। ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলো, ফাটলটার মুখ বালি আর মাটিতে বন্ধ হয়ে গেছে। বনহুর অনেক্ষণ লক্ষ্য করলো ফাটলটা গভীর মনোযোগ সহকারে, তারপর বললো–নীহার, এ দ্বীপটা। কোনোকালে লোকালয় ছিলো, এই দেখো ফাটলের মধ্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কয়েকটা সিঁড়ির ধাপ।
হাঁ, ঠিক সেইরকম মনে হচ্ছে কিন্তু।
চলো দেখি, তোমার আব্বা এবং ওরা নিশ্চয়ই কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছেন।
