নীহার কিন্তু পিতার পাশে থেকে নীরবে সব লক্ষ্য করছিলো, যদিও সে আজকাল একেবারে নীরব হয়ে গেছে তবু পিতার সঙ্গ ছাড়া হয় না। কারণ কখন কি বিপদ এসে পড়ে কে জানে! আলমের সেদিনের কথার পর মন ভেঙে গেলেও তার উপর ভরসা কম ছিলো না নীহারের। এ জাহাজে তাদের কোনো বিপদ ঘটলে এক খোদাতায়ালা আর ঐ আলম ছাড়া কেউ যেন রক্ষার নেই। ওকে দেখলেই নীহারের মন যেন স্ফীত হয়ে উঠে। হৃদয়ের নিভৃত কোণে উঁকি দেয় একটা। আশার আলো। এ জাহাজে একমাত্র আলম ছাড়া তাদের আপন জন যেন কেউ নেই।
নীহার ভেবে পায় না, এতো জানার পরও কেন ওকে এতো বিশ্বাস হয়, কেন এত ভাল লাগে। কেনই বা আলমকে পাশে পাবার জন্য মন তার সদা উদগ্রীব থাকে। যতই সে আলমের। সান্নিধ্য এড়িয়ে চলতে চায় ততই নিজের কাছে নিজেই পরাজিত হয়। একদিন সে মনের সঙ্গে অনেক তর্ক করেছে কিন্তু জয়ী হতে পারেনি। আলমের প্রতিচ্ছবি মন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছে কিন্তু আরও গভীরভাবে দাগ কেটে বসেছে। ওকে একটিবার দেখার জন্য ক্যাবিনে ছট ফটু করেছে। কিন্তু জোর করে ধরে রেখেছে সে নিজকে।
কিন্তু গত রাতের ঘটনার পর আর পারেনি নীহার ক্যাবিনে আত্মগোপন থাকতে। একরকম বাধ্য হয়েই সে বেরিয়ে এসেছে আলমের সম্মুখে।
সম্মুখে এলেও নীহার কথা বলেনি একটিবারের জন্য আলমের সঙ্গে। ইচ্ছা থাকলেও বলতে পারেনি, একটি দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নীহারের গলা টিপে ধরে।
ঘন্টা কয়েকের মধ্যেই জাহাজ ‘পর্যটন ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের সন্নিকটে পৌঁছে গেলো।
জাহাজ নোঙর করা হলো দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। ঐ জায়গাটা কিছু সমতল বলে মনে হলো। অবশ্য নাবিক আলমের মত অনুসারেই জাহাজ নোঙর করা হলো। আবু সাঈদ আলমের। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি-কৌশলের জন্য মুগ্ধ হলেন।
জাহাজ নোঙর করার পর সবাই ফৌজিন্দিয়া দ্বীপে অবতরণ করলো। রাতের অন্ধকারে দ্বীপটাকে কত ভয়ংকর একটা কিছু মনে হয়েছিলো–দিনের আলোতো সব ভয়-ভীতি দূর হয়ে গেলো। এক এক করে নেমে পড়লো সবাই।
আবু সাঈদ ক্যামেরাম্যান এবং পর্যটকদল সহ ব্যস্তভাবে নেমে পড়লেন, ভুলে গেলেন তখন নীহারের কথা। নীহারও ইচ্ছা করেই চুপচাপ রইলো নিজের ক্যাবিনে।
সবাই অবতরণে ব্যস্ত।
আবু সাঈদ দলবলসহ নেমে গেছেন।
সবাই ভুলে গেলেও বনহুর কিন্তু লক্ষ্য করেছিলো, আবু সাঈদের পাশে নীহার নেই। আলগোছে সে সরে পড়েছিলো কখন, টের পাননি আবু সাঈদ।
বনহুর সোজা নীহারের ক্যাবিনে এসে দাঁড়ালো।
নীহার চেয়ারে বসে তাকিয়েছিলো বাইরের দিকে, পদশব্দে ফিরে তাকালো কিন্তু বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই পুনরায় চোখ দুটোকে মুক্ত গবাক্ষে নিবদ্ধ করলো।
বনহুর আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই–এগিয়ে গেলো নীহারের নিকটে, কাঁধে হাত রাখলো–নীহার, যাবে না?
বনহুর আজ প্রথম তাকে এভাবে স্পর্শ করলো। উপেক্ষা করতে পারলো না নীহার তাকে, নিজের মাথাটা কাৎ করে ওর হাতের উপরে গন্ডটা রাখলো, তারপর বললো–না যাবো না।
আশ্চর্য কণ্ঠে বললো বনহুর–কেন?
নীহার কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করলো।
বনহুর নীহারের চিবুকটা উঁচু করে বললো–একি, তুমি কাঁদছো? নীহারের চোখে পানি দেখে অবাক হলো সে।
নীহার উঠে দাঁড়ালো, নতদৃষ্টি তুলে ধরলো সে বনহুরের মুখে।
বনহুর পারলো না নিজকে সংযত রাখতে, নীহারের চোখের পানি নিজের হাত দিয়ে মুছিয়ে দিয়ে ডাকলো–নীহার।
নীহার হঠাৎ উচ্ছ্বসিতভাবে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বনহুরের বুকে মুখ লুকালো।
বনহুর কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে রইলো। একি এক সমস্যা তার জীবনে বিপর্যয় শুরু করলো। সে তো কোনো সময় নীহারকে প্রশ্রয় দেয়নি বা তার সান্নিধ্যে আসেনি, যতটুকু পেরেছে ওকে সে প্রথম থেকেই পরিহার করে চলেছে। তবু সে রেহাই পেলো না এই সমস্যা থেকে। বনহুর শান্ত কণ্ঠে বললো–তোমাকে ব্যথা দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। আমাকে ক্ষমা কর নীহার।
আলম–নীহারের ক্রন্দন যেন থামতে চায় না।
বলো? বনহুর স্থির কণ্ঠে বললো।
নীহার বনহুরের হাতের পিঠে নিজের গন্ড রেখে বললো–তোমার দেওয়া ব্যথা আমার জীবনের সম্বল হয়ে থাকবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে শোনা যায় নাসেরের কণ্ঠর নীহার, নীহার–
নীহার দ্রুত হস্তে চোখের পানি মুছে ফেলে সরে দাঁড়ালো।
নাসের এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে। নীহারের ক্যাবিনে আলমকে দেখে মুখমন্ডল তার গম্ভীর কঠিন হয়ে উঠলো, চোখ দুটো দিয়ে যেন অগ্নিশিখা নির্গত হচ্ছে।
বনহুর একবার নাসেরের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো–আসুন মেম সাহেব।
বনহুর নীহারের অনুরোধেই তাকে নাম ধরে এবং তুমি’ বলে সম্বোধন করতো কিন্তু লোকসম্মুখে নীহারকে ‘মেমসাহেব’ আর ‘আপনি’ বলতো।
বনহুর এক্ষণে এমন ভাব দেখালো সে যেন নীহারকে ডাকতেই এসেছে। নীহারও বললো– চলো আলম।
নাসেরকে সে গ্রাহ্যই করলো না, আলমের সঙ্গে বেরিয়ে গেলো ক্যাবিন থেকে।
নাসের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর গট গট করে চলে গেলো সে বনহুর আর নীহারের পাশ কাটিয়ে। কোনো কথাই সে আর বললো না তাদের।
নীহারের মন সম্পূর্ণ সচ্ছ না হলেও কিছুটা হাল্কা হয়ে এসেছে, বনহুরের সঙ্গে সে পাশাপাশি অবতরণ করলো ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের বুকে।
দূর থেকে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপটাকে কচ্ছপের পিঠের মত মনে হলেও এখন তারা দেখলো, দ্বীপটা একেবারে ছোট খাটো বা সমতল নয়। বেশ বড় এবং কয়েক মাইলব্যাপী তার পরিধি।
