বনহুর ও কেশব এসে দাঁড়ালো এক পাশে।
সবাই তাকিয়ে দেখলো, ডেকে যে কয়জন খালাসী শুয়েছিলো তারা থর থর করে কাঁপছে, সকলেরই চোখেমুখে ভয়ঙ্কর ভীতি-ভাব। আবু সাঈদ বললেন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে–কি হয়েছে তোদের?
খালাসিগণ কেউ কোনো কথা বলতে পারছে না, কেমন যেন বোবার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে।
ধমক দিলেন আবু সাঈদ–কে আর্তনাদ করেছে?
একজন কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালো, ভয়-বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে বার বার তাকাতে লাগলো ডেকের রেলিং পেরিয়ে সাগরের দিকে।
পুনরায় ধমক দিলেন আবু সাঈদ–ওদিকে কি দেখছিস?
কাঁপতে কাঁপতে বললো খালাসিটা–হুজুর, হাতির মত মোটা একখানা হাত—
বিস্ময়ে অস্ফুট শব্দ করে উঠলো সবাই, হাতির পায়ের মত মোটা হাত। সকলের মুখ ছাই এর মত বিবর্ণ হলো। সবাই নড়েচড়ে সরে এলো ঘনিষ্ঠ হয়ে।
বললেন আবু সাঈদ –একি বলছিস?
হাঁ হুজুর একটা হাতির পায়ের মত মোটা হাত অন্ধকারে সাগর-মধ্য থেকে উঠে এসে আমাদের একজনকে তুলে নিয়ে আবার ডুব মেরেছে–কথা শেষ না করে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে থাকে লোকটা।
বনহুর লোকটার কাঁধে হাত রাখে–তুমি সঠিক দেখেছো হাতটা?
হাঁ, দেখেছি। অন্ধকার হলেও আমি স্পষ্ট দেখেছি যে, ইয়া মোটা হাত; জমকালো ভূতের মত দেখতে–
এক দন্ডে জাহাজের ডেক ফাঁকা হয়ে গেলো।
কোথায় বা নাসের আর লাঠিয়াল সর্দার জলিল ও তার দলবল, সবাই যে-যার ক্যাবিনে লুকিয়ে পড়ে আত্মগোপন করলো। চাচা-আপন জান বাঁচা নীতি গ্রহণ করলো।
একটু পূর্বে যে নাসের আর জলিল বনহুরের হত্যার পরামর্শ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো এখন তাদের কারো মুখে কথা নেই। যে-যার ক্যাবিনে প্রবেশ করে খিল এঁটে দিলো।
বনহুর আবু সাঈদ ও নীহারকে ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে এসে খালাসিদের বিভিন্ন ক্যাবিনে শোবার ব্যবস্থা করে দিলো, তারপর ফিরে গেলো সে নিজের ক্যাবিনে। কিন্তু বাকি রাতটা জাহাজের কারো ঘুম আর হলো না।
সকলের মনেই ভয় আর আতঙ্ক, সবার চোখের সামনে ভাসছে বিরাট মোটা জমকালো একটা হাত।
*
পরদিন প্রভাতে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পর্যটন জেগে উঠলো। জেগে উঠলো পর্যটনের যাত্রিগণ, কিন্তু সকলেরই মুখ ভয়-বিহ্বল আতঙ্কগ্রস্ত। গত রাতের ব্যাপারটা সবাইকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।
আবু সাঈদ স্বয়ং সমস্ত রাত আর ঘুমাতে পারেননি। সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে নীহার, একেবারে কুঁকড়ে গেছে সে। এতোবড় বীর পালোয়ান লাঠিয়াল দল জলিল, শম্ভু, জম্বু এরাও ভয় পেয়েছে ভীষণভাবে।
জাহাজ ‘পর্যটন ফৌজিন্দিয়া দ্বীপে পৌঁছানোর পূর্বেই এমন অঘটন ঘটবে ভাবতে পারেননি আবু সাঈদ। বিশেষ করে খালাসিগণ মিথ্যা বলেনি, তারা দেখেছে–সত্যিই একটা বিরাট মোটা হাত সাগর-মধ্য হতে উঠে এসে জাহাজের ডেক থেকে একজন ঘুমন্ত খালাসিকে তুলে নিয়ে গেছে।
বনহুরও বাকি রাতটুকু ঘুমাতে পারেনি, গভীরভাবে চিন্তা করেছে–খালাসির ভয়-বিহ্বল কণ্ঠের কথাগুলো নিয়ে মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করে দেখেছে। রাতের ঐ হাতখানা কিসের হাত হতে পারে সেটা? আফ্রিকার জঙ্গলে বনহুর অনেক ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর জীবের কবলে পড়েছিলো। গরিলার লোমশ বাহুও খুব মোটা বটে, তাই বলে সাগরগর্ভে গরিলা বা কিং কং থাকতে পারে না। তবে কি অক্টোপাশের বাহু ছিলো সেটা? বনহুরকে একবার অক্টোপাশের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হয়েছে। সেদিনের কথা মনে পড়লে আজও তার সাহসী মন শিউরে উঠে। কি সাংঘাতিক কি ভয়ঙ্কর সেই নাগপাশের বন্ধন!
বনহুর আবু সাঈদের পাশে এসে দিনের আলোতে দূরবীক্ষণ চোখে লাগিয়ে তীক্ষ্ণভাবে দেখতে লাগলো। দূরে অনেক দূরে কচ্ছপের পিঠের মত উঁচু জমকালো বিরাট একটা কিছু নজরে পড়ছে। ঐ কচ্ছপের পিঠের মত জিনিসটাই হলো ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আবু সাঈদ যেখানে দাঁড়িয়ে দূরবীক্ষণ চোখে দেখছিলেন সেই স্থানে জাহাজের প্রায় সবাই। এসে ভীড় জমিয়েছিলো-ব্যাকুল আগ্রহে সবাই দেখছে, সকলের মুখেই গভীর উদ্বিগ্নতার ছাপ।
এতো লোক থাকতে আবু সাঈদ নাবিক আলমকে লক্ষ্য করে বললেন–আলম, এখন কি। আমাদের এগুনো চলে?
বনহুর বললো–হাঁ স্যার, দিনের আলোতে আমাদের ফৌজিন্দিয়া দ্বীপে অবতরণ করতে হবে।
তাহলে জাহাজ ছাড়ার জন্য বলো—
আচ্ছা স্যার।
হ শোন আলম, তুমি কিন্তু সব সময় আমার সঙ্গে থাকবে, জাহাজের কাজে অন্যান্য নাবিককে লাগিয়ে দাও।
আবু সাঈদ যখন কথা বলছিলেন তখন বনহুরের দৃষ্টি একবার তার অজ্ঞাতেই চলে গেলো নীহারের মুখে, দেখলো নীহার ব্যাকুল আগ্রহে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বললো বনহুর–আচ্ছা স্যার, তাই থাকবো।
জাহাজ এবার ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ অভিমুখে অগ্রসর হলো। সম্মুখ ডেকে দাঁড়িয়ে স্বয়ং আবু সাঈদ এবং তাঁর পর্যটক সঙ্গিগণ। নাসেরও রয়েছে, সে সব সময় আবু সাঈদের নিকট ঘনিষ্ঠ হয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। তার মনোভাব, ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের নতুনত্ব আবিষ্কারের কৃতিত্বটা। যেন তারই হয়।
আবু সাঈদ কিন্তু নাসেরকে তেমন করে গ্রাহ্যই করছিলেন না। তিনি তাঁর পর্যটকদলকে নিয়ে আলাপ-আলোচনার মধ্যে আলমকেই বার বার এটা-ওটা নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন এবং তার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা চলছিলো।
এমন এক অবস্থাতেও আলমের প্রতি নাসেরের ঈর্ষা কমলো না বরং বেড়েই চললো অগ্নিশিখার মত। মুখে-প্রসন্ন থাকার চেষ্টা করলেও মনে মনে কটমট করতে লাগলো হিংস্র শার্দুলের মত।
