আবু সাঈদ দূরবীক্ষণ চোখে লাগিয়ে দেখলেন–সত্যিই দূরে বহু দূরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু যেন ছুটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। কখনও বা জ্বলছে কখনও নিভছে। কখনও একেবারে আলোর বিন্দুগুলো মিশে গিয়ে শুধু গাঢ় অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে সব।
আবু সাঈদ বন্ধুর মুখে যা শুনেছিলেন এ যে একেবারে খাঁটি সত্য। তিনি বিস্ময়কর ঘটনা উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে ডেকে পাঠালেন নাবিক আলমকে। আবু সাঈদের দক্ষিণ বাহু যেন ঐ নাবিক আলম। জাহাজে সে না থাকলে তিনি যেন বিব্রত হয়ে পড়তেন।
অন্যদিন হলে নীহার আপত্তি তুলে বসতো, হয়তো বলতো, থাক না আব্বা আলমকে না হলে কি তোমার চলে না? কিন্তু আজ সে নিশ্চুপ রইলো বরং আলমকে না হলে এ বিপদ যেন কাটবে না। অন্ধকারে আলম যেন একটি উজ্জ্বল আলো।
বনহুর জাহাজের ইঞ্জিন-ক্যাবিনে ছিলো, কাজেই সে এই অদ্ভুত শব্দ শুনতে পায়নি এবং আলোকরশ্মি সম্বন্ধেও জানতে পারেনি। ইঞ্জিন-ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে আসতেই এই তীব্র শব্দটা সে শুনতে পেয়ে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলো, কয়েক মিনিট কান পেতে শুনেছিলো বনহুর স্তব্ধ হয়ে।
আবু সাঈদের পাশে আসতেই তিনি ব্যস্তকণ্ঠে বললেন– আলম, শুনতে পাচ্ছো?
হাঁ স্যার, শুনতে পাচ্ছি।
তোমার কি মনে হয়?
হঠাৎ বলে উঠে নাসের–আপনি একজন অভিজ্ঞ পর্যটক হয়ে একটা অজ্ঞ নাবিককে জিজ্ঞাসা করছেন এসব কথা? ওকি জানে যে বলবে? আমি বলছি–
নীহার নাসেরের কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে, রাগতঃ কণ্ঠে বলে–নাসের সাহেব, আপনাকে তো কোনো কথা জিজ্ঞাসা করা হয়নি?
থেমে যায় নাসের, ডেকে অন্ধকারে তাকায় সে নীহারের মুখে ক্রুদ্ধভাবে।
বনহুর বলে–স্যার, আমার মনে হয় শব্দটা কোনো যন্ত্রের নয়।
বলে উঠে নাসের–দেখলেন তো কেমন নিরেট মূর্খ। এমন তীব্র শব্দ তবে কি কোনো মানুষ বাঁশী মুখে নিয়ে ফুঁ দিয়ে করছে?
আবু সাঈদ বললেন–মানুষ তো নয়ই, কিসের শব্দ জানার জন্যই আমাদের আগমন।
বনহুর বললো–স্যার, আমার মতে জাহাজ আজ রাতে এখানেই নোঙর করা উচিত। কাল দিনের আলোতে অগ্রসর হলেই চলবে। কারণ আমরা ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের প্রায় নিকটে এসে পড়েছি।
নাসের মনে মনে কম ভীত হয়নি, তবু মুখে সাহস টেনে বললো–স্যার, এতো দূর অগ্রসর হয়ে মাঝপথে থেমে পড়া মোটেই উচিৎ নয়। আমরা কাপুরুষ নই যে ভয়ে মুষড়ে পড়বো।
নাসেরের বীরত্বপূর্ণ কথায় মৃদু হাসলো বনহুর।
আবু সাঈদ নাসেরের কথায় কান না দিয়ে বললেন–আলম, দূরবীক্ষণ চোখে লাগিয়ে দেখো আমাদের আর অগ্রসর হওয়া চলবে কি না? দূরবীক্ষণ যন্ত্রটা বনহুরের হাতে দেন আবু সাঈদ।
আলম আবু সাঈদের হাত হতে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখলো তারপর বললো–স্যার, এক্ষুণি জাহাজ নোঙর করতে হবে। কারণ সম্মুখে আমাদের জন্য নানারকম বিপদ ওৎ পেতে থাকতে পারে।
হাঁ, তোমার কথাই শ্রেয় আলম, জাহাজ নোঙর করতে বলো। নাসের কোনো কথা না বলে চলে গেলো সেখান হতে। বনহুর একবার নীহারের মুখে তাকিয়ে দেখলো তারপর চলে গেলো সে জাহাজে, ইঞ্জিন-ক্যাবিনের দিকে।
জাহাজ ‘পর্যটন’ মাঝ-সাগরে নোঙর করলো।
রাত্রির অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না তাদের অবস্থান-জায়গা হতে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ কত দূর। এখন সেই তীব্র হুইসেলধ্বনি সম্পূর্ণরূপে থেমে গেছে। কিন্তু দূরে বহু দূরে আলোক রশ্মির টুকরোগুলো তখনও অসংখ্য তারার মত ছুটাছুটি করে ফিরছে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে অনেকেই দেখছে এই অদ্ভুত আলোর খেলা।
কিন্তু কতক্ষণ সবাই জেগে কাটাতে পারে, এক সময় যে-যার ক্যাবিনে গিয়ে শুয়ে পড়লো।
একটা নিভৃত কামরায় তখনও চলেছে নাসের আর জলিলের দলের গোপন আলোচনা। যতক্ষণ আলমকে তারা এই জাহাজ থেকে সরাতে না পেরেছে ততক্ষণ তাদের কোনো শান্তি নেই। বা নেই কোনো কাজে কৃতিত্ব। মালিক সব সময় সব কাজে শুধু ঐ বেটা নাবিক আলমটাকেই ডাকবেন। একেবারে এ ব্যাপারটা অসহ্যনীয় তাদের কাছে। কাজেই ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের বিস্ময়কর এই রহস্য উদ্মাটনের পূর্বেই সরাতে হবে ওকে, নাহলে কোনো কৃতিত্বই তাদের হবে না, সব সুনাম দখল করে নেবে ঐ বেটা নাবিক।
রাত গম্ভীর হতে গভীরতম হয়ে আসে।
জাহাজের সবাই নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে। শুধু গোপন সলা-পরামর্শ চলেছে নাসেরের গোপন কামরায়।
নিচের ক্যাবিনে বনহুর আর কেশব ঘুমিয়ে পড়েছে। তবে বনহুরের নিদ্রা খুব গাঢ় হয়নি, সে একটু তন্দ্ৰামত হয়ে পড়েছিলো।
আবু সাঈদ কিছুতেই ঘুমাতে পারছেন না, তাঁর মনে নানা-রকম চিন্তার উদ্ভব হচ্ছে। তিনি ঐ শব্দ এবং আলোকরশ্মি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছিলেন।
সমস্ত জাহাজ নিস্তব্ধ।
জমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন চারিদিক।
ডেকের উপর কয়েকজন খালাসী শুয়ে আছে কম্বলমুড়ি দিয়ে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। এমন সময় হঠাৎ একটা তীব্র আর্তনাদ ভেসে এলো জাহাজের ডেক থেকে। রাত্রির জমাট অন্ধকার যেন সে শব্দে ভেঙে পড়লো খান খান হয়ে।
যে যেদিক থেকে পারলো ছুটে এলো ডেকে, আর্তনাদের শব্দটা যেখান হতে ভেসে এসেছিলো সেই জায়গায় এসে দাঁড়ালো, সকলের চোখেমুখেই আতঙ্ক–ব্যাপার কি?
আবু সাঈদ এবং নীহার এসেছেন–আবু সাঈদের হস্তে পিস্তল।
ওদিক থেকে নাসের, জলিল এরাও গোপন সলা-পরামর্শ ভুলে লাঠি,শরকী বল্লম নিয়ে বীর পুরুষের মত হন্তদন্ত হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
