কেশবের মুখ দীপ্তময় হয়ে উঠলো, বললো–বাবু, আজ আমি শান্তি পেলাম!
*
নীহার একেবারে যেন মুষড়ে পড়েছে। সেই জ্যোত্স প্লাবিত রাত্রির কথাগুলো তাকে যেন দুঃস্বপ্নের মতই চঞ্চল করে তোলে। সর্বক্ষণ কি যেন ভাবে, নির্জন ক্যাবিন ছেড়ে বাইরেই আসে সে আর। নাবিক আলমকে সে নিজের অজ্ঞাতে ভালবেসে ফেলেছিলো, শুধু ভালই বাসেনি, মনের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো ওকে। কত আকাশ-কুসুম স্বপ্ন যে দেখেছিলো তাকে নিয়ে। কিন্তু কালবৈশাখীর ঝড়ের মত এক নিমিষে সেই রাতে তার মনের সাজানো সৌধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
আবু সাঈদ কন্যাকে হঠাৎ এমন বিমর্ষ আনমনা হয়ে যেতে দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। নীহার এমন তো কোনোদিন ছিলো না। কন্যার মনে আনন্দ ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে লাগলেন।
প্রথমেই বলেছি, আবু সাঈদ সাহেব তার পর্যটনে সব কিছুরই ব্যবস্থা রেখেছিলেন। খেলাধুলো, গান-বাজনা করার জন্য নিপুণ ব্যবস্থা ছিলো। লাইব্রেরীতে ছিলো সবরকম বই পুস্তক, যার যার ইচ্ছামত পড়াশোনা করতে পারতো। টেলিভিশনও ছিলো সন্ধ্যায় ভীড় জমাতো সবাই টেলিভিশন ক্যাবিনে। জাহাজ পর্যটনে আবু সাঈদের সঙ্গিগণের কোনো রকম অসুবিধা যেন না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি ছিলো তার।
নীহার আবু সাঈদের চঞ্চলা কন্যা, ইচ্ছামত সে সমস্ত জাহাজে বিচরণ করে ফিরতো। খেলাধুলো, গান-বাজনায় দক্ষ ছিলো সে। পড়াশুনাও করতো সে যখন ইচ্ছা তখন লাইব্রেরী ক্যাবিনে বসে। সন্ধ্যায় সবার পূর্বে এসে বসতো সে টেলিভিশন ক্যাবিনে।
সেদিনের পর থেকে নীহার এসব ছেড়ে দিয়েছে, সদা বিমর্ষ মনে নিজের ক্যাবিনের মুক্ত গবাক্ষে বসে তাকিয়ে থাকে ফেনিল জলরাশির দিকে।
বনহুর জাহাজের কাজে ব্যস্ত থাকলেও সে লক্ষ্য করেছে– নীহার সেদিনের পর হতে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছে, কোনো রকম সাড়াশব্দ নেই তার মধ্যে। যতক্ষণ বনহুর তার ইঞ্জিনের কাজে ব্যস্ত থাকতো ততক্ষণ সে ভুলে থাকতো, তেমন করে কোনোকিছু ভাববার সময় হতো না। যখনই সে অবসর পেতো তখন মনটা আনচান করতো, কেমন যেন একটা উদাস ভাব এসে আচ্ছন্ন করে ফেলতো তাকে। মাঝে মাঝে বনহুর টেলিভিশন ক্যাবিনে এসে বসতো বা দেয়ালে। ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো। দেশ-বিদেশের সংবাদ পেতে রেডিও আর টেলিভিশনের মাধ্যমে।
আজকাল বনহুর খেলাধুলোর জায়গায় বা লাইব্রেরী ক্যাবিনে কিংবা টেলিভিশন কেবিনে কোথাও নীহারকে দেখতে পেতো না। আবু সাঈদ বা জাহাজের কেউ নীহারের এই নীরবতার কারণ না জানলেও জানতো একমাত্র বনহুর।
কখনও কখনও বনহুর ব্যথিত হতো, নীহারকে সেদিন ওভাবে কথাগুলো না বললেও চলতো, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হতো, বলে সে ভালই করেছে কারণ নীহার ক্রমান্বয়ে তাকে যেভাবে নিবিড়তম আকর্ষণে আকৃষ্ট করে চলেছিলো তাতে অমঙ্গলের আশঙ্কা কম ছিলো না। এখন বনহুর নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে চলে, সময়-অসময়ে এসে নীহার তাকে আনমনা করে তোলে না।
ইরুইয়া বন্দর ত্যাগ করার দুদিন পরই জাহাজ ‘পর্যটন ফৌজিন্দিয়া দ্বীপে পৌঁছানোর কথা। ছিলো, কিন্তু হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন এবং রেডিও আবহাওয়া সংবাদে বিপদ-সংকেত জানা যাওয়ায় আবু সাঈদ সাহেব সম্মুখে ছোটখাটো যে-কোন এক বন্দরে জাহাজ নোঙর করার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। এসব কারণেই পথে কয়েকদিন বিলম্ব ঘটে গেলো।
এখন জাহাজ সোজা ফৌজিন্দিয়া মুখে অগ্রসর হচ্ছে। আকাশ স্বচ্ছ–মেঘমুক্ত। দ্বাদশীর চাঁদ ডুবে গেছে অনেকক্ষণ!
রাত গভীর।
হঠাৎ তীব্র একটা শব্দ সমস্ত জাহাজের আরোহিগণকে সজাগ করে তুললো। শব্দটা যেন দূর। দূরান্ত থেকে শোনা যাচ্ছে। ঠিক যেন ট্রেনের ইঞ্জিনের হুইসেলের শব্দ।
যারা জেগে ছিলো তারা ঘুমন্ত জনকে জাগিয়ে দিলো। সবাই কান পেতে শুনতে লাগলো। শব্দটা। যদিও বহুদূর হতে ভেসে আসছে তবু তীক্ষ্ণ ছুরিফলার মতই মনে হচ্ছে আওয়াজটাকে।
আবু সাঈদ বুঝতে পারলেন তাঁরা ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের অনতি দূরে পৌঁছে গেছেন। তাঁর মুখমন্ডল দীপ্ত হয়ে উঠলো বটে কিন্তু মনের মধ্যে একটা ভীতি ভাব উঁকি দিলো তার সঙ্গে।
পিতার সঙ্গে নীহারও জেগে উঠেছিলো, ভয়-বিহ্বল কণ্ঠে বললো–আব্বা, তোমার সেই শব্দ না?
হাঁ মা, আমরা ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের নিকট এসে পড়েছি।
আব্বা, শব্দটা শুনে আমার কেমন ভয় হচ্ছে।
ছিঃ মা ভয় কি! ঐ শব্দটা কিসের জানার জন্যই তো আমাদের আগমন। চলো আমরা ডেকে গিয়ে দাঁড়াই নিশ্চয়ই দ্বীপের সেই অজ্ঞাত আলোকরশ্মি দেখতে পাবো।
সেই মুহূর্তে নাসের ছুটে এলো দূরবীক্ষণ হস্তে, আবু সাঈদ এবং নীহারকে লক্ষ্য করে বললো–আপনারা আসুন, দেখবেন আসুন, দূরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোর টুকরা দেখা যাচ্ছে।
আবু সাঈদ ওভারকোটটা গায়ে জড়িয়ে বললেন–নীহার, চল মা দেখিগে।
নীহারের বুকের মধ্যেও দুরু দুরু করে কম্পন শুরু হয়েছে, ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে তার মুখ; পিতার কথায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্লিপিং গাউনটা গায়ে দিয়ে বললো– চলো আব্বা।
আবু সাঈদ ডেকে এসে দাঁড়ালেন, হুইসেলের শব্দটা একটানা শোনা যাচ্ছে। গভীর রাত্রির নিচ্ছিদ্র অন্ধকার ভেদ করে কেমন যেন এক ভয়ঙ্কর আঁতঙ্কময় শব্দ। জাহাজের পর্যটক দল প্রায় সবাই এসে আবু সাঈদের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়েছেন। যেমন তাঁরা সাহসী তেমনি উৎসাহী কিন্তু সকলের মুখেই যেন একটা ভীতিকর ভাব ফুটে উঠেছে। কেউ কেউ দূরবীক্ষণ চোখে লাগিয়ে দেখছেন। প্রায় সকলেরই ইচ্ছা, জাহাজ আর অগ্রসর না করাই শ্রেয়।
