নীহারের বিস্ময় চরমে উঠে–কি বলতে চায় আলম তাকে? কি-ই বা জবাব দেবে সে আলমের প্রশ্নে! নীহার ঢোক গিললো, সাধারণ এক নাবিক যুবকের কাছে আজ সে বাকহীন হয়ে পড়েছে যেন।
বনহুর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে বললো–মানুষ চায় প্রেম-প্রীতি-স্নেহ-ভালবাসা আর সেই মোহেই আকৃষ্ট হয়ে পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকতে চায়…থামলো সে।
নীহার নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুরের দীপ্ত মুখ-মন্ডলের দিকে–তার সমস্ত অনুভূতি যেন লুপ্ত হয়ে গেছে, নির্বাক হয়ে শুনছে ওর কথাগুলো।
বলে চলেছে বনহুর–এসবের কিছু নেই আমার মধ্যে। নীহার, আমি একটা শুষ্ক নারিকেলের ছোবড়ার মতই উচ্ছিষ্ট।
এবার অস্ফুট ধ্বনি করে নীহার–আলম!
হাঁ, জানো না বলেই তো তুমি আমাকে তোমার মনের কোণে স্থান দিয়েছে। যদি আমার ভিতরের কথাটা জানতে…
না না, আমি কোনো কথা তোমার জানতে চাই না আলম…নীহার বনহুরের মুখে হাতচাপা দেয়। তারপর বলে মিথ্যা কথা! মিথ্যা কথা বলছো তুমি। প্রেম-প্রীতি-স্নেহ-ভালবাসা ছাড়া মানুষ কোনোদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে না। এসব যদি তোমার মধ্যে না থাকবে তাহলে তুমি বেঁচে আছো কি করে?
সেই প্রশ্নই আমি তোমাকে করেছিলাম নীহার। তুমি জানো, আমি বেঁচে আছি কিন্তু আসলে আমি মৃতের চেয়েও অধম। অবাক হচ্ছো আমার কথা শুনে, তাই না?
নীহার নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে আছে, নাবিক আলম বলে কি?
বনহুর এবার রেলিং-এ ঠেশ দেয়–কেন মৃতের চেয়েও অধম জানো? সব বলবো তোমাকে। কারণ মানুষ হয়েও আমি মানুষ নই। মানুষ কোনোদিন পারে না মানুষকে পরিহার করে চলতে। আমি পারি…বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে বনহুরের কণ্ঠ। নিজকে সংযত করে নেয় বনহুর, একটু কেশে নিয়ে বলে সে মায়ের একমাত্র সন্তান হয়ে মাকে কোনোদিন সুখী করতে পারিনি। মায়ের চোখের পানি আমাকে কোনোদিন বিচলিত করতে সক্ষম হয়নি। মায়ের স্নেহ আমাকে পারেনি। আবদ্ধ করতে। স্ত্রীর প্রেম আমাকে…
অস্ফুট ধ্বনি করে নীহার–আলম, তুমি বিবাহিত!
হাঁ, আমি বিবাহিত। বিয়ে দিয়ে মা আমাকে গৃহকোণে আটকে রাখতে চেয়েছিলো কিন্তু পারেনি, স্ত্রীর প্রেম আমাকে আকৃষ্ট করতে পারলো না। শুধু তাই নয়, আমার সন্তান আছে। সন্তানের মায়াও আমাকে কোনোদিন চঞ্চল করেনি–নীহার, বলো আমি জীবিত না মৃত?
বনহুর তাকিয়ে দেখলো, নীহারের মুখ ফ্যাকাশে ছাই-এর মত বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। দুলছে। নীহার, হয়তো এই মুহূর্তে পড়ে যাবে সে। বনহুর ধরে ফেললো সাবধানে ওকে।
অল্পক্ষণে নিজকে সামলে নিলো নীহার, গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা।
বনহুর বললো–তাই আমি পারি না কাউকে ভালবাসতে বা কারো ভালবাসা গ্রহণ করতে…
নীহার মাতালের মত টলতে টলতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, কোনোরকম উক্তিই আর তার মুখ দিয়ে বের হলো না, এগুলো সম্মুখের দিকে।
বনহুর বললো–চলো, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
না, লাগবে না! কথাটা বলে নীহার কোনোরকমে দ্রুত চলে গেলো সেখান থেকে।
বনহুর প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট-কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলো, তারপর চললো নিজের ক্যাবিনের দিকে।
বনহুর ক্যাবিনের দিকে পা বাড়াতেই আড়াল থেকে সরে গেলো একজন, সে এতোক্ষণ বনহুর আর নীহারের সব কথাবার্তা শুনছিলো। বনহুর ক্যাবিনে প্রবেশ করবার পূর্বেই সে শয়ন করলো নিজ বিছানায়।
বনহুরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে সে আত্মগোপন করতে পারলো না, ক্যাবিনে প্রবেশ করেই বুঝতে পারলো, কেশব এতোক্ষণ কক্ষে ছিলো না, সে এইমাত্র শয্যা গ্রহণ করলো।
বনহুর সুইচ টিপে আলো নিভিয়ে ডিমলাইট জ্বেলে ফেললো, তারপর শয়ন করে বললো– কেশব, এতোক্ষণ ঘুমাওনি কেন?
নড়ে উঠলো কেশব, ঘুমের ভান করে রইলেও সে ঘুমায়নি জানতে পেরেছেন বাবু; সে। নড়েচড়ে বললো–বড় গরম বাবু…
ওঃ তাই ডেকে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলে?
আমতা আমতা করে বললো কেশব–না বাবু, ক্যাবিনের বাইরে যাইনি।
কেশব, আমার চোখে তুমি ধূলো দিতে চাও?
বাবু!
তুমি আড়ালে দাঁড়িয়ে নীহার আর আমার কথাবার্তা শুনছিলে না?
বাবু, আপনার জন্য আমার সব সময় আশঙ্কা, তাই…
পাহারা দিচ্ছিলে আমাকে, তাই না?
ঠিক পাহারা নয় বাবু, দেখছিলাম হঠাৎ কেউ…
আক্রমণ করে কিনা?
কেশব কোনো কথা বলে না, নিশ্চুপ থাকে। অবশ্য সে কথা মিথ্যা নয়। এ জাহাজে আসার পর বাবু কতবার যে কতরকম বিপদে পড়েছে তার ঠিক নেই। আবার কখন কোন বিপদ যে তার জন্য কোথায় ওৎ পেতে আছে তাই বা কে জানে। কেশবের সদা ভয় তার বাবুকে নিয়ে। বোন। ফুলকে হারিয়েছে–এখন একমাত্র বাবু তার সম্বল। এ জাহাজে আর কে আছে তার–
কেশব!
বনহুরের ডাকে সম্বিৎ ফিরে আসে কেশবের। ধমমড় করে বিছানায় উঠে বসে বলে–বাবু!
কেশব, তুমি আমাকে অত্যন্ত ভালবাস জানি, কিন্তু আমি বড্ড অপদার্থ, তার প্রতিদানে তোমাকে কিছুই দিতে পারলাম না।
কেশব উঠে এসে বনহুরের হাত দু’খানা চেপে ধরে–বাবু, আপনি যা দিয়েছেন তা আমাকে মানুষ হিসেবে অনেক উপরে তুলে দিয়েছে। আপনি আমাকে কোনোদিন দূরে সরিয়ে দেবেন না।
বনহুর কেশবের কথায় মুগ্ধ হলো বললো–পারবে আমার সঙ্গে দিন কাটাতে?
পারবো।
অনেক কষ্ট হবে আমার সঙ্গে থাকলে।
হোক, সব কষ্ট আমি সহ্য করতে পারবো বাবু।
বেশ, যদি তাই মনে করো থেকে আমার সঙ্গে।
