নীহারও কম বিস্মিত হয়নি। দিন যতই গড়িয়ে যাচ্ছে ততই যেন আলমের আত্মপরিচয়ে সে আশ্চর্যের পর আশ্চর্য হচ্ছে। নাবিক আলম মানুষ না অন্য কিছু।
সাধারণ মানুষের মধ্যে তো এমন অদ্ভুত গুণ পরিলক্ষিত হয় না! আলম সম্বন্ধে নীহার যত ভাবে ততই ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, আরও গভীরভাবে ভাবতে যেন ইচ্ছা করে ওর কথা। নীহারের জীবনে আলম যেন এক জ্যোতির্ময় দ্যুতি এনে দিয়েছে। একটি মুহূর্ত যেন ওকে না দেখে থাকতে পারে না সে।
নীহার আলমের কথা যতই ভাবুক, যতই ওকে পাবার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠুক, আলম ততই নীহারকে এড়িয়ে চলবার চেষ্টা করে। সে বুঝতে পারে; নীহারের মনে সে দাগই শুধু কাটেনি, গভীরভাবে স্থান দখল করে নিয়েছে। কিন্তু সেকি তার অপরাধ? আলম নিজের মনকেই প্রশ্ন করে।
নীহারের সান্নিধ্য সে কোনোদিন কামনা করে না, তবে নীহার যখন তার পাশে এসে ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়ায় তখন পারে না সে তাকে নির্মমভাবে উপেক্ষা করতে। হয়তো এটা তার মনের সৎসাহস–দুর্বলতা নয়। কারণ তার জীবনে বহু নারী ধমনীতে প্রবাহিত হয়েছে উষ্ণ রক্তের ধারা, তবু সে সংযমচ্যুত হয়নি! কঠিন লৌহমানবের মত নিজকে শক্ত করে রেখেছে। আজ বনহুর নীহারের কাছে পরাজিত হবে না।
জাহাজ অবিরাম একটানা চলেছে।
রাত গভীর না হলেও বেশ রাত হয়েছে।
আকাশে আজ পূর্ণচন্দ্র।
জ্যোৎস্না-প্লাবিত সমস্ত পৃথিবী। উচ্ছল জলতরঙ্গের উপর জ্যোৎস্নার আলো পড়ে অপূর্ব লাগছিলো।
ডেকের রেলিং-এ ঠেশ দিয়ে সিগারেট পান করছিলো বনহুর। মনের মধ্যে নানা চিন্তার উদ্ভব হয়ে চলেছে। চিন্তাস্রোতে গা ভাসিয়ে আনমনা হয়ে পড়েছিলো সে।
এমন সময় চমকে উঠে বনহুর, ফিরে তাকিয়ে বলে–মেম সাহেব আপনি! সঙ্গে সঙ্গে সিগারেটটা নিক্ষেপ করে দূরে।
নীহারের সম্মুখে নাবিক আলম সিগারেট পান করতো না। কারণ সে তার মনিব-কন্যা, তাই আজও বনহুর নীহারের আগমনে অর্ধদগ্ধ সিগারেট দূরে নিক্ষেপ করলো। অসময়ে মালিক কন্যাকে তার পাশে আসতে দেখে অবাক না হলেও সে বিব্রত হলো।
নীহার হঠাৎ এসে পড়েছে; সেও বেশি করে ভেবে দেখেনি–কেন সে এলো, কি চায় সে নাবিক আলমের কাছে। আলম যখন বললো, “মেম সাহেব আপনি! ‘–তখন হঠাৎ নীহার জবাব দিতে পারলো না, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। সেদিনের পর থেকে–যেদিন নীহার আলমের ক্যাবিন থেকে বিমুখ হয়ে ফিরে এসেছিলো, বলেছিলো আলম, মেম সাহেব, আমার ক্যাবিনে আপনি আর আসবেন না। এখানে আসাটা আপনার মোটেই উচিৎ নয়। আমাকে আপনি মাফ করবেন।
নীহার অস্ফুট ধ্বনি করে উঠেছিলো, আলম, তুমি আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছে?
জবাব দিয়েছিলো আলম, না।
তবে অমন করে কথা বলছো কেন? বলেছিলো নীহার।
আপনি জানেন না, আমার ক্যাবিনে আসাটা আপনার জন্য সম্পূর্ণ অসঙ্গত। আমি অনুরোধ করছি, আপনি আমার ক্যাবিনে আর আসবেন না।
*
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলো নীহার–’আলম!
হাঁ মেম সাহেব! আমাকে মাফ করবেন, আমি অক্ষম
নীহার বেরিয়ে গিয়েছিলো আলমের ক্যাবিন থেকে। তারপর আর সে আসেনি আলমের পাশে। একটি ক্ষুদ্ধ অভিমান গুমড়ে কেঁদে ফিরেছে সদা তার মনের গহনে। নিজের মনেই নিজে ছটফট করে মরেছে তবু নাবিক আলমের কাছে সে যেতে পারেনি। কিন্তু ইরুইয়া বন্দরে ফুলওয়ালার দোকানে আলম যখন তাকে শয়তান ফারহু’র কবল থেকে উদ্ধার করে নিলো তখন সমস্ত মান-অভিমান ভুলে গিয়েছিলো নীহার। একটা অভূতপূর্ব অনুভূতি উপলব্ধি করেছিলো সে মনে–আলম তাকে নিশ্চয়ই ভালবাসে। সেই আত্নবিশ্বাসেই নীহার আজ আবার তার পাশে এসে। দাঁড়িয়েছে। আলম যখন কথা বললো তখন নীহার চট করে কোনো সাড়া দিতে পারলো না। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো পুতুলের মত মাথা নত
মৃদু হাসলো বনহুর, নীহারের অন্তরের কথা সে জানে। এ ক’দিন নীহার ক্যাবিনে না এলেও তার শ্যেনদৃষ্টি থেকে রেহাই পায়নি সে। লক্ষ্য করেছে বনহুর–গভীর রাতে কার যেন পদশব্দ তার ক্যাবিনের আশেপাশে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কার নিশ্বাসের শব্দ শুনেছে তার শিয়রে। কোনোদিন আচমকা ঘুম ভেঙে গেছে কোনো এক কোমল হস্তের স্পর্শে, কে যেন আলগোছে হস্তসঞ্চার করেছে তার কেশে। চমকে চোখ মেলেছে বনহুর, কাউকে দেখতে পায়নি। দেখতে না পেলেও বুঝতে পেরেছে নীহার ছাড়া এ কেউ নয়। নীহারের অন্তরের বেদনা উপলব্ধি করে স্নান হাসি হেসেছে, নির্বোধ যুবতী নীহার; জানে না সে কোনোদিন তার কামনা পূর্ণ হবার নয়। প্রেম-প্রীতি-স্নেহ-ভালবাসা কোনোদিন জোর করে আদায় করা যায় না।
একটু নড়ে দাঁড়ালো বনহুর, নিজেকে সচ্ছ করে নেবার জন্যই সে এমনভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, বললো শান্তকণ্ঠে–নীহার, আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?
বনহুরের স্বাভাবিক শান্ত কণ্ঠস্বর নীহারকে আশ্চর্য করলো। একজন সাধারণ নাবিকের গলায় এমন সুর বের হবার কথা নয়। সম্মুখে অবাক হবার মত কিছু দেখলে মানুষ যেমন করে তাকায় তেমনি দৃষ্টি নিয়ে তাকালো নীহার নাবিক আলমের মুখে, হঠাৎ কোনো শব্দ বের হলো না তার ঠোঁট দুটির ফাঁকে।
বনহুর তার বলিষ্ঠ বাহু দুটি বুকের উপর রেখে তাকালো জ্যোত্সা-প্লাবিত সীমাহীন জলরাশির দিকে। কিছুক্ষণ মৌন থেকে কি যেন ভাবলো, তারপর বললো–এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষ কি চায়? কিসের মোহে মানুষ বাঁচতে চায় বলতে পার?
