নীহার তো পিতার জামার আস্তিনে নিজের দু’চোখ ঢেকে ফেলে রোদন করে উঠলো–আব্বা একি হলো? সর্বনাশ হলো যে! ফুলমিয়ার সঙ্গে আলমও যে মারা পড়লো।
আবু সাঈদও ব্যস্তভাবে বন্দরে ছুটাছুটি করতে লাগলেন আর চিৎকার শুরু করলেন–শীঘ্র। বোট নামাও…শীঘ্র বোট নামাও…
নীহার মন-প্রাণে খোদাকে স্মরণ করছে। তার নারী-হৃদয় একেবারে ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়েছে। কি ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক অবস্থা!
নীহার নিজকে কিছুতেই স্থির রাখতে পারছিলো না, সে অবিরত রোদন করে চলেছে।
ওদিকে জলিলের দল এবং জাহাজের অন্যান্য নাবিক জাহাজের পিছনে এবং সম্মুখভাগে কয়েকখানা বোট নামিয়ে নিয়েছে। দু’জন সাঁতারুও বোটে চেপে সাগরবক্ষে অবতরণ করেছে।
বনহুর কিন্তু ফুলমিয়াকে অনেক কষ্টে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো। ফুলমিয়া যেন জাহাজের চাকার ফাঁকে আটকে না যায় সেজন্য সে আপ্রাণ চেষ্টায় চাকার বিপরীত দিকে সাঁতার কাটছিলো।
প্রচন্ড জলস্রোতে ফুলমিয়ার মত একজন বলিষ্ঠ জোয়ান লোককে ধরে নিয়ে সাঁতার কাটা কম কথা নয়। যদিও বনহুর হাপিয়ে পড়ছিলো তবু কিছুতেই ওকে মুক্ত করে দেয়নি।
ততক্ষণে বোটসহ উদ্ধারকারিগণ জাহাজের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিলো। নানাভাবে জলতরঙ্গ ভেদ করে সন্ধান করে ফিরছিলো ওরা নাবিক আলম আর ফুলমিয়ার।
নীহার এবং আবু সাঈদ বন্দরের জেটিতে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল আগ্রহে তাকিয়ে দেখছিলো, বুকের মধ্য ঢিপ ঢিপ করছিলো তাদের। জেটিতে ডেকের উপর আশেপাশে লোকজনে ভীড় জমে। উঠেছে। সকলের চোখেমুখেই ভীতিকর আশঙ্কাভরা ভাব।
দু’খানা জাহাজ ইতিমধ্যে বন্দর ত্যাগ করবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। জাহাজ ‘পর্যটন’ থেকে বিপদসঙ্কেত ধ্বনি প্রচার হবার সঙ্গে সঙ্গে সে জাহাজ দুটি স্থির হয়ে পড়েছে।
দিনের আলো বলেই রক্ষা, উদ্ধারকারী বোটগুলো অল্পক্ষণেই ফুলমিয়াসহ বনহুরকে উদ্ধার করে বন্দরে নিয়ে এলো।
সর্বপ্রথমে নীহার সব ভুলে বনহুরের অর্ধ-সংজ্ঞাহীন দেহটার উপর ঝুঁকে পড়লো–আলম, এখন কেমন বোধ করছো?
বনহুর একেবারে জ্ঞান হারায়নি, সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো, বললো–আমি ভাল আছি, ফুলমিয়া কেমন আছে?
অদূরে সংজ্ঞাহীন ফুলমিয়াকে তখন ডাক্তার চিকিৎসা করছেন। আবু সাঈদ একবার আলম, একবার ফুলমিয়ার কাছে ছুটছেন। ডাক্তার ফুলমিয়ার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানালেন। তিনি নাবিক আলমের প্রশংসা করে বললেন–ফুলমিয়াকে কিছুতেই রক্ষা সম্ভব হতো না যদি আলম তাকে ঠিকভাবে ধরে রাখতে সক্ষম না হতো। ফুলমিয়া অনেক আগেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলো, নাবিক আলম তাকে কঠিন-মজবুত হস্তে ধরে রেখেছিলো বলেই উদ্ধারকারিগণ তাকে উদ্ধার করতে পেরেছে।
বনহুর অল্পক্ষণ মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠলো।
ফুলমিয়ার তখনও জ্ঞান ফিরে আসেনি। তাকে অজ্ঞান অবস্থাতেই জাহাজ ‘পর্যটনে উঠিয়ে নেওয়া হলো।
জাহাজে গমন করেই আবু সাঈদ খেয়াল করলেন সিঁড়ির মুখ হঠাৎ কি করে নষ্ট হলো ভাগ্যিস, নীহার বা তিনি যদি সিঁড়ির ধাপে পা রাখতেন তাহলে কি ভয়ঙ্কর অবস্থা হতো কিছুতেই বাঁচতেন না। শিউরে উঠলেন আবু সাঈদ সাহেব। তৎক্ষণাৎ গভীরভাবে অনুসন্ধান শুরু করলেন।
সিঁড়ির মুখ পরীক্ষা করে বিস্মিতই শুধু হলেন না তিনি, স্তম্ভিত হলেন। বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারলেন–কে বা কারা সিঁড়ির মুখ বাটাল বা ঐ ধরনের অস্ত্র দ্বারা নষ্ট করে দিয়েছিলো। সেই স্থানে ছিলো নাসের এবং জলিলের দল। নাসের ভীড় ঠেলে সম্মুখে এসে বললো-স্যার, নিশ্চয়ই আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো সেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করার জন্য ফুলমিয়াকে উদ্ধারের উদ্দেশ্য নিয়ে সাগরবক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো..
নাসের নাম ধরে না বললেও চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো,–সিঁড়ির মুখ নষ্ট করেছে আলম।
আবু সাঈদ ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন–খবরদার, অমন কথা বলো না। আলম প্রথম থেকেই আমাদের সঙ্গে ছিলো, তাছাড়া সে তেমন লোক নয়।
অনেক সন্ধান করেও আবু সাঈদ সিঁড়ির মুখ নষ্টকারিগণকে আবিষ্কারে সক্ষম হলেন না। তিনি ইরুইয়া বন্দর ত্যাগ করার জন্য জাহাজের নাবিকগণকে আদেশ দিলেন।
জাহাজ ‘পর্যটন’ ইরুইয়া বন্দর ত্যাগ করে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের দিকে রওয়ানা দিলো। জাহাজে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলেও আবু সাঈদের মন সচ্ছ হলো না। পর পর একটার পর একটা দুর্ঘটনা তাকে বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এবারের মত কোনোবার তাঁর জীবনে এমন বিপর্যয় আসেনি বা ঘটেনি। এবার যেন কেমন একটা এলোমেলো ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে তার পর্যটনে’।
ফুলমিয়া ক্রমে সংজ্ঞা লাভ করে।
একটু সুস্থ হয়েই সে জানতে পারে, নাবিক আলম নিজের প্রাণ বিপন্ন করে তাঁকে সাগরবক্ষ হতে উদ্ধার করেছে। অনাবিল এক আনন্দে আপ্লুত হয় ফুলমিয়ার মন। নাবিক আলমের প্রতি তার হৃদয়তা আরও গম্ভীর হতে গভীরতম হয়ে উঠে।
ফুলমিয়া আরোগ্য লাভ করলো।
আবু সাঈদ আর নীহার সবচেয়ে খুশি হয়েছে। দিন দিন আলমের প্রতি পিতা এবং পুত্রীর অনুরাগ আরও বেশি নিগূঢ় হয়ে উঠেছে। আলম যেন তাদের অতি আপন জন একটি মুহূর্ত ওকে না হলে তাদের যেন চলবে না।
ফুলমিয়াকে মৃত্যুর কবল থেকে উদ্ধার করার জন্য আবু সাঈদ নাবিক আলমের কাছে। কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলেন। সেই বিপদকালে নিজের জীবন বিপন্ন করে কেউ সাহসী হতো না ভীষণ জলতরঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কত বড় মহান আর হৃদয়বান হলে সে এমন কাজ করতে পারে– ভেবে আবু সাঈদ অবাক হলেন।
