নীহার যখন একটি মালা হাতে তুলে নিয়েছে এবং নেড়েচেড়ে দেখছে সেই সময় রাজমন্ত্রী ফারহু খপ করে নীহারের হাতখানা চেপে ধরলো, মুখে তার বিদঘুঁটে কুৎসিত হাসি। ইরুইয়া ভাষায় বললো–সুন্দরী ফিরে চাও আমার দিকে..
ফারহু’র কথা শেষ হয় না, বনহুরের প্রচন্ড এক ঘুষি গিয়ে পড়ে তার চোয়ালে। ঘুরপাক খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়ায় ফারহু। দু’চোখে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঠিকরে পড়ে।
সঙ্গে সঙ্গে ফারহু’র দেহরক্ষীদ্বয় ধরে ফেলে বনহুরকে।
বনহুর এক ঝটকায় নিজকে ওদের হাত থেকে মুক্ত করে নেয়।
আবু সাঈদ এবং নীহার থ’মেরে গেছে। হঠাৎ এমন একটা ব্যাপার ঘটবে কল্পনাও করতে পারেনি তারা।
ফারুহু দাঁত পিষে নিজ ভাষায় বললো–জানো আমি কে?
বনহুর ইরুইয়া ভাষা না জানলেও অনুমানে কতকটা বুঝে নিলো তার কথা বলার ভঙ্গী দেখে। শুদ্ধ ইংরেজিতে বললো বনহুর–তোমার ব্যবহারেই আমি তোমার পরিচয় পেয়েছি।
নাবিক আলমকে সুন্দর ইংরেজি বলতে দেখে আবু সাঈদ মুগ্ধ হলেন। আরও বেশি বিমুগ্ধ হয়েছেন তিনি আজ তার শক্তির চাক্ষুস পরিচয় পেয়ে।
বনহুর তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথাটা বলে একটি ঝুড়ি কাঁধে তুলে নিলো, যেন তার কিছু হয়নি, বললো–চলুন।
এতক্ষণ অদূরে দাঁড়িয়ে ফুলমিয়া সব লক্ষ্য করছিলো। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ দেখা পেয়েছিলো আবু সাঈদ, নীহার এবং আলমের। কিন্তু এমন সময় সন্ধান পেলো সে, যখন আলম রাজমন্ত্রীর চোয়ালে মুষ্ঠিঘাত করে ফেলেছে।
স্তব্ধ হয়ে দেখছিলো ফুলমিয়া নাবিক আলমের অদ্ভুত রূপ। শ্রদ্ধায় মাথাটা নত হয়ে আসছিলো ওর। সে আরও লক্ষ্য করলো, আলম ঘুষি চালানোর পর দেহরক্ষীদ্বয় যখন তাকে ধরে ফেললো তখন এক ঝটকায় ওদের কবল থেকে নিজকে অতি সহজে মুক্ত করে নিলো আলম। কিন্তু এরপর বিপক্ষদল আর যেন ওকে ঘাটতে সাহসী হলো না। বৃথা আস্ফালন করে ক্রুদ্ধভাব প্রকাশ করতে লাগলো রাজমন্ত্রী এবং তার সঙ্গীদ্বয়।
বনহুর বোঝাটা তুলে নিয়ে সচ্ছভাবে অগ্রসর হলো। তার চলার ভঙ্গী দেখে মনে হলো কিছু যেন হয়নি।
ফুলমিয়া এবার সামনে এসে দাঁড়ালো, আলমকে লক্ষ্য করে বললো–ভাই, বোঝাটা আমাকে দাও, আমি তো খালি হাতে যাচ্ছি।
বনহুর ফুলমিয়াকে চিনতো, ও-যে লাঠিয়াল জলিলের একজন–তাও জানতো, বললো বনহুর–আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।
ফুলমিয়া নাছোড়বান্দা–সে জেদ ধরে বললো, সে খালি হাতে যাচ্ছে অথচ আলম বোঝা বয়ে নিয়ে যাবে এটা বড় অশোভনীয়।
আবু সাঈদ বললেন–আলম, বোঝাটা ওকে দাও।
অগত্যা বাধ্য হলো বনহুর নিজের বোঝাটা ওকে দিতে।
আবু সাঈদ, নীহার আর বনহুর এগিয়ে চললো।
ফারহু ইংগিৎ করলো তার সঙ্গীদ্বয়কে ওদের অনুসরণ করতে। তৎক্ষণাৎ গোপনে রাজকর্মচারীদ্বয় অনুসরণ করে চললো।
সিঁড়ির মুখে এসে বুকটা কেঁপে উঠলো ফুলমিয়ার। বহু চিন্তা করে সে মনস্থির করে নিয়েছে, নিজের জীবন দিয়েও রক্ষা করবে আলম এবং মালিক আবু সাঈদ ও তাঁর কন্যা নীহারকে। সিঁড়ির মুখ নষ্ট করার কথা এদের কাছে বললে জলিলের দল তাকে ক্ষমা করবে না। উত্তপ্ত লৌহশলাকা দ্বারা তার চক্ষুদ্বয় অন্ধ করে দেওয়া হবে। কারণ সে জানে, তাদের দলের কেউ অবিশ্বাসী কাজ করলে তার এই শাস্তিই দেওয়া হয়ে থাকে। নৃশংস পরিণতির চেয়ে স্বাভাবিক মৃত্যু তার কাছে। অনেক শ্রেয়ঃ। মরতে হয় এদের বাঁচিয়ে তবে মরবে।
ফুলমিয়া বোঝাটা নিয়ে পথ চলতে চলতে এ কথাই ভাবছিলো–মন বলছিলো, কি হবে অন্যের জন্য নিজকে বিসর্জন দিয়ে? বিবেক মাথাচাড়া দিয়ে মনকে দাবিয়ে দিচ্ছিলো, একটি জীবন দিয়ে যদি তিনটি জীবন রক্ষা করতে পারো তাহলে তুমি নশ্বর পৃথিবীর বুকে একটা কাজের মত কাজ করে যাবে। মরতে তোমাকে হবেই একদিন, তবু যদি পারো মানুষের কিছু উপকার করে যাও। ফুলমিয়ার মন পরাজয় স্বীকার করেছিলো তার বিবেকের কাছে।
ফুলমিয়া বোঝাটা কাঁধে নিয়ে তাকালো সিঁড়ির নিচে সাগরের উচ্ছল জলরাশির দিকে। কি প্রচন্ডভাবে ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে সরে যাচ্ছে জলরাশি। একবার পড়ে গেলে আর তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ফুলমিয়া ইচ্ছা করলে দ্বিতীয় সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে পারতো বা ওদের সেইভাবে যেতে বলতে পারতো কিন্তু সে জানে, আজ জলিলের দল নিতান্ত মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করে চলেছে, কোনোরকম চালাকি তার চলবে না। ইচ্ছা করলে এদের বাঁচাতে পারে কিন্তু তাকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হবে, তার চেয়ে সাগরের জলে জীবন দেওয়া অনেক শ্রেয়ঃ।
ফুলমিয়া বোঝাটা মাথায় খোদার নাম স্মরণ করে ঝুলন্ত সিঁড়ির ধাপে পা রাখলো।
সঙ্গে সঙ্গে ফুলমিয়া এবং বোঝাটাসহ সিঁড়িটা ঝপাং করে খসে পড়লো সাগরবক্ষে।
আর্তচিৎকার করে উঠলো আবু সাঈদ এবং নীহার।
বনহুর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলো না, মুহূর্তে দেহ থেকে কোটটা খুলে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়লো জলতরঙ্গের মধ্যে।
জাহাজের উপর থেকে সব লক্ষ্য করছিলো নাসেরের দল। ভেবেছিলো এক, হলো আলাদা। ফুলমিয়া সাগরবক্ষে নিমজ্জিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই জলিল তার লোকদের আদেশ দিলো শীঘ্র জাহাজে বিপদসংকেত ধ্বনি করতে এবং কয়েকখানা বোট পানিতে নামিয়ে নিতে। ব্যস্ত হয়ে পড়লো জলিলের দল, কারণ ফুলমিয়া তাদের দলের লোক, ফুলমিয়ার এ অবস্থার জন্য জলিল বেশ ঘাবড়ে গেলো। অবশ্য জলিল জানে না ফুলমিয়ার মনের কথা তাই, না হলে ওকে বাঁচানোর জন্য ওরা এমন ব্যস্ত হয়ে পড়তো না।
