এমন দিনে জলিলের সঙ্গে পরিচয় ঘটলো কোনো এক মুহূর্তে। ফুলমিয়ার বলিষ্ঠ চেহারা দেখে পছন্দ করে নিলো তাকে। তারপর হতে ফুলমিয়া জলিলের দলে লাঠিয়ালের কাজ করে।
যদিও লাঠিয়াল জীবন তার কাছে ভাল লাগে না তবু বাধ্য হয় সে এ কাজ করতে। জলিলের আদেশে তাকে অনেক কু-কর্ম করতে হয়। নিরীহ কত মানুষের মাথায় আঘাত করেছে সে ঐ জলিলের নির্দেশে। কত অসহায় মানুষের সর্বনাশ করতে হয়েছে তাকে। অবশ্য এসব করার পর অনুশোচনায় মন তার ভরে উঠেছে, কিন্তু কি করবে–এ কাজ না করেও কোনো উপায় নেই। বাধ্য হয়েই সে আজও টিকে আছে জলিলের দলে।
জলিলের আদেশে কু-কর্ম করলেও মন তার কোনোদিন সায় দেয়নি একাজে। তবুও তাকে করতে হয়েছে, না হলে সংসার চলবে না। কিন্তু আজ তার মন বিদ্রোহী হয়ে উঠে। একজন নিরপরাধ ব্যক্তির জীবননাশ করতে এতো তৎপরতা কেন তাদের। মিথ্যা নয়–কেন যেন নাবিক অলিমকে ওর ভাল লাগে। ওর সান্নিধ্য লাভের কামনা জাগে মনে। কিন্তু মনের ইচ্ছা প্রকাশের কোনো উপায় নেই। তাদের দলের সবাই ঈর্ষা করে ওকে। যদি কোনোক্রমে প্রকাশ পায় ফুলমিয়া নাবিক আলমকে মনে মনে সমীহ করে–তাহলে নির্ঘাত মৃত্যু তাতে কোনো ভুল নেই।
ফুলমিয়া অন্তরের কথা কোনোদিন ব্যক্ত করে না এসব কারণেই। মনের বাসনা গোপনে চেপে নিশ্চুপ থাকে সে। কিন্তু আজ আর যেন সহ্য হয় না, বিবেক মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তার মধ্যে।
ফুলমিয়া আড়ালে লুকিয়ে পড়ে, দেখবে সে কি করে জলিল আর তার দলবল। কেমন করে ঝুলন্ত সিঁড়ির মুখ নষ্ট করে দেয়। দেবে না ফুলমিয়া এতোবড় একটা হৃদয়হীন অন্যায় করতে।
অনেকক্ষণ হয় চলে গেছেন আবু সাঈদ নীহার আর আলম সহ। জাহাজের প্রায় সবাই নেমে গেছে।
কয়েকজন জাহাজে আছে, এখনও তারা ইঞ্জিন পরিস্কারে ব্যস্ত। আর আছে জলিলের দলবল, কয়েকজন অবশ্য নেমে গেছে যদিও, তবুও ফুলমিয়া যায়নি।
ফুলমিয়া আড়ালে আত্বগোপন করে দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ।
কিছুক্ষণ কেটে যায়–হঠাৎ ফুলমিয়ার নজর পড়ে তাদের দলেরই একজন একটা হাতুড়ি এবং বাটাল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সিঁড়িটার দিকে। এ দুটো জিনিস গোপনে কাপড়ের তলায় লুকিয়ে নিয়েছে লোকটা। জলিল, শম্ভু, ও জম্বুও এলো, ওরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে চারদিকে লক্ষ্য করছে সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে।
আশেপাশে কেউ নেই।
জলিল লোকটাকে ইংগিত করলো এবার কাজ শুরু করতে–কারণ এইতো সুযোগ। ধূর্ত শিয়ালের মতই সে ইশারা করতে লাগলো–সেইভাবে কাজ করে চললো বাদল। বাটাল আর হাতুড়িওয়ালা লোকটার নাম ছিলো বাদল।
জলিল জানে, হঠাৎ যদি কেউ দেখে ফেলে বা কারো নজরে পড়ে যায় তাহলে বাদলকে খুব করে ধমকে দেবে সে এই কাজের জন্য। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ থেকে যাবে এ ব্যাপারে।
বাদল সিঁড়ির মুখ এমনভাবে নষ্ট করে দিলো যে, সিঁড়িতে পা দিতেই সিঁড়ি খসে পড়বে সাগরবক্ষে।
কাজ শেষ করে চলে গেলো বাদল।
জলিল আর তার অন্যান্য অনুচর খুশি হলো, কারণ এ সিঁড়িতে শুধু আবু সাঈদ, নীহার আর আলমই উঠে আসবে। বিপদ ঘটবে ওদেরই।
ফুলমিয়া আলগোছে সরে পড়লো। দ্বিতীয় সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো বন্দরে। যেমন করে থোক। প্রথম সিঁড়িতে ওরা যেন না আসে সেই কাজ তাকে করতে হবে।
নিজের দলের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা এসে গেছে তার। এমন নিষ্ঠুর হৃদয়হীন কাজ তার সহ্য হবে না কিছুতেই। বিদ্রোহী মন নিয়ে সে এগিয়ে চললো কিন্তু ইরুইয়া বন্দর ছোটখাট নয়– কোথায় খুঁজে ফিরবে সে ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ, তার কন্যা নীহার এবং আলমকে। চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এগোয় ফুলমিয়া।
বন্দরের সংলগ্ন ইরুইয়া নগরী।
কৌশলী শিল্পীর নিপুণ হস্তের তুলিতে আঁকা ছবির মত সুবিস্তৃত ইরুইয়া। উঁচু-নীচু টিলা আর সমতলভূমির উপরে ছোট-বড় কাঠের ঘরগুলো ঠিক গুছিয়ে তৈরি না করলেও দেখতে প্রায়। সবগুলোই এক সমান এবং একই ধরনের। কাঠের খুঁটি আর তক্তা দিয়ে মজবুত করে তৈরি এগুলো। তক্তার তৈরিই ছাদ। খাচ-কাটা সুন্দর নক্সা-করা ঘরের ধারগুলো দেখতে বেশ ঝালরের। মত মনে হয়।
টিলা আর ঢিবির পাশ কেটে সরু পথ চলে গেছে আঁকা-বাঁকা হয়ে দূর হতে দূরে। পথের দু’ধারে দোকানপাট রয়েছে আর মাঝে মাঝে সরাইখানা। কোথাও বা ফলমূলের দোকান আছে। ফুল এবং ফুলের মালার দোকানও আছে এ শহরে।
জিনিসপত্র কেনার পর আবু সাঈদ, কন্যা নীহার ও আলম সহ ফিরে চললেন। হঠাৎ নীহারের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো সামনে ফুল ওয়ালার দোকানে। গোলাপ আর বেল ফুলের সমারোহ নীহারকে মুগ্ধ করে ফেললো।
এগিয়ে গেলো নীহার একটা মালা ক্রয়ের উদ্দেশ্যে।
সেই সময় ফুল ওয়ালার দোকানে ইরুইয়ার রাজমন্ত্রী ফারহু তার দু’জন অনুচরসহ ফুলের মালা ক্রয় করছিলো। নীহারকে দেখামাত্রই ফারহুর দৃষ্টি ফুলের মালা হতে চলে এলো ওর উপর। ফারহু ছিলো ইরুইয়ার একজন অতি অসৎ কু-মনোবৃত্তিপূর্ণ লোক। নীহারকে দেখে হঠাৎ তার মধ্যে একটা লোলুপ লালসাপূর্ণ মনোভাব জেগে উঠলো।
নীহার বা তার পিতা আবু সাঈদ কোনো দিকে লক্ষ্য করেনি, তারা ফুল ওয়ালার দোকানের ভিতর প্রবেশ করে দেখছে কোন্ মালাটা ক্রয় করবে।
আবু সাঈদ এবং নীহার যখন ফুলের মালা পছন্দ নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়েছেন, নাবিক আলম বেশি দস্যু বনহুর তখন কিছুটা পিছন হতে লক্ষ্য করছিলো। ফারহু’র পোশাক পরিচ্ছদ এবং তার দেহরক্ষীদ্বয়ের সাজসজ্জা দেখেই সে বুঝতে পেরেছিলো, এরা ইরুইয়ার কোনো রাজকর্মচারী। এক নজরেই অনুমান করে নিয়েছিলো তাদের মতলবটা, কাজেই বনহুর প্রস্তুত হয়ে ঠিক নীহারের পিছনে এসে দাঁড়ালো।
