নীহার বনহুরের হাতখানা মুঠায় আঁকড়ে ধরলো। এই বিপদ মুহূর্তেও একটা তড়িৎ-প্রবাহ যেন বয়ে গেলো নীহারের শিরায় শিরায়। ভয়-ভীতি মুছে গেলো সঙ্গে সঙ্গে, গভীর জলতরঙ্গে পড়ে গেলেও আর সে মরবে না জানে।
বনহুরের সাহায্যে নিচে নেমে এলো নীহার।
আবু সাঈদ হেসে ফেললেন ফ্যাকাশে মুখে, কৃতজ্ঞতাপূর্ণ কণ্ঠে ধন্যবাদ জানালেন–সাধে কি মা মনি তোমাকে এতো সমীহ করে! দেখো দেখি, কত বড় উপকারটা হলো তোমার দ্বারা…গদগদ হয়ে এলো আবু সাঈদের গলার স্বর।
নীহার চোখ তুললো, কোনো কথা না বললেও তার দৃষ্টির মধ্যে একটা কৃতজ্ঞতার ছাপ ফুটে উঠলো।
বনহুর ছোট্ট করে উচ্চারণ করলো–এমন কি আর করলাম!
আবু সাঈদ, নীহার আর নাবিক আলম যখন সিঁড়ির উপর এগুচ্ছিলো তখন নাসেরের দল ডেকের অদূরে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ্য করছিলো। বনহুর যখন নীহারের হাত ধরে সিঁড়ি পার করে নিচ্ছিলো তখন নাসের বললো–দেবো নাকি শেষ করে দুটোকে?
জলিল ক্ষিপ্রহস্তে নাসেরের পিস্তলের মুখটা নিচু করে দিয়ে বললো–প্রকাশ্যে এ কাজ করলে সব ফাস হয়ে যাবে। আমও যাবে, বস্তাও যাবে। সবুর করেন ছোট স্যার, সব ঠিক করে নেবো।
জম্বু দাঁত পিষে বললো–সেদিন আমার হাঁটুতে যেভাবে শটু করেছিলো, আজও ভাল করে হাঁটতে পারি না। সুযোগ পেলে দেখাবো না মজাটা কেমন?
জলিল পেটের দক্ষিণ দিকটা টিপে ধরে মুখটা কালো করে বলে–খেলে এখনও পেটে ব্যথা করে। ভাগ্যিস, পেটের নাড়ী ছিঁড়ে যায়নি সেদিন, তাই রক্ষা।
এতোক্ষণ শম্ভু তার ভীমকায় দেহ নিয়ে পান চিবুচ্ছিলো, বললো–আমাকেও কম আছড়ে দেয়নি বেটা। যতদিন বেঁচে থাকবো মনে থাকবে। দাঁতটা আজও নড়ছে, তবে রক্ত পড়ে না, এই যা।
রক্ত পড়ে না বলেই ছেড়ে দেবে নাকি ওকে?
ছেড়ে দেবো মানে? এই দাহ দিয়ে ওর বুকের রক্ত শুষে নেবো না?
জলিল বললো–দেখা যাবে কে কতটুকু বাহাদুর।
বললো নাসের–শয়তানটা এতো শক্তি পেলো কোথায়? ওকে সাধারণ মানুষ বলে মনে হয় না। জানো ওর এক একটা ঘুষির ওজন কতো?
জানি ছোট স্যার, জানি। কিন্তু জলিলের কাছে সব মিছে হয়ে যাবে। জলিল যখন কৌশল প্রয়োগ করবে তখন আলম কেন, আলমের বাবা এলেও পারবে না মনে রাখবেন। জলিল এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে এক খিলি পান মুখে গুঁজে দিলো।
নাসের বললো–চলো এবার। আমরাও নেমে পড়ি, কিন্তু মনে রেখো ওদের পূর্বেই আমরা জাহাজে ফিরবো এবং যে সিঁড়ি দিয়ে ওরা জাহাজে ফিরে আসবে সেই সিঁড়ির একটা দিক নষ্ট করে দিতে হবে।
ঠিক বলেছেন ছোট স্যার, একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
নাসেরের সঙ্গে হাত মিলালো জলিলের দল।
জলিলের দলের একজন লাঠিয়াল–নাম তার ফুলমিয়া, এতোক্ষণ ওদের পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো। যদিও সে ওদের লোক কিন্তু তার মন এতোখানি হীন নয়। অন্তরে তার মায়া-দয়া সব আছে, আছে বিবেক-বিবেচনা। এদের কথাবার্তা মোটেই তার যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত হয় না। বিশেষ করে নাবিক আলম সম্পূর্ণ নিরপরাধ, কিন্তু তাকে হত্যার জন্য কিই না ষড়যন্ত্র চলেছে দিবারাত্রি!
ফুলমিয়া এতোদিন ধৈর্য ধরে এদের অন্যায় মেনে নিয়েছে নীরবে। শুনে গেছে কিন্তু কোনো জবাব সে দেয়নি কোনোদিন, জানতো, বলে কোনো ফল হবে না। হয়তো তাকেও সন্দেহ করে বসবে ওরা রীতিমত।
আজ ফুলমিয়া সহ্য করতে পারে না জলিলদের কুৎসিত নির্মম পরামর্শ। একটা নিষ্পাপ মানুষকে এরা সাগরবক্ষে প্রচন্ড জলস্রোতে ডুবিয়ে মারবে, এতোবড় অন্যায় হতে দেবে না সে।
ফুলমিয়া আস্তে সরে গেলো সেখান হতে। বড় ইচ্ছা ছিলো ইরুইয়া বন্দরে অবতরণ করে বন্দরটা একবার দেখবে ঘুরেফিরে কিন্তু সব বাসনা মুছে ফেললো সে মন থেকে, চিরদিন ওদের দলে থেকে ওদের কুৎসিত সংস্পর্শে অনেক কুকর্ম করেছে সে। হঠাৎ আজ ফুলমিয়ার মন ফিরে যায়, মনে মনে শপথ করে–আর লোকের মন্দ সে কোনোদিনই করবে না। বরং যদি জীবন দিয়ে কারো উপকার করতে পারে তবেই সার্থক হবে এ পৃথিবীতে আসা তার।
কাজেই ফুলমিয়া বন্দরে অবতরণ না করে একটা ক্যাবিনের আড়ালে লুকিয়ে রইলো, দেখবে কি করে সিঁড়ির মুখ ওরা নষ্ট করে। প্রকাশ্যে কিছু বলতে বা করতে পারবে না ফুলমিয়া, কারণ জানে, কতবড় হৃদয়হীন নরপিশাচ তার দলের লোক। এতোটুকু যদি টের পায় তার মনোভাব তাহলে তাকে হত্যা করবে সর্বপ্রথমে। যেমন নাবিক মকবুলকে হত্যা করা হয়েছে। তার চেয়ে নিশ্চুপ থেকে যদি কিছু করা যায়!
ফুলমিয়া আসলেই গরিবের ছেলে ছিলো না। মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান সে। যদিও প্রচুর অর্থ বা ঐশ্বর্য ছিলো না কিন্তু মন ছিলো বড়। পরের জন্য যতটুকু পারে করতো সে মন দিয়ে। ছোটবেলায় ফুলমিয়া লেখাপড়াও শিখেছিলো কিছুটা। তবে সংসারে মা না থাকায় এবং পিতা বৃদ্ধ হওয়ায় তাকেই সংসারের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছিলো। কাজেই বেশি লেখাপড়া করা তার ভাগ্যে ঘটে ওঠেনি।
বৃদ্ধ পিতা এবং ছোট-ছোট ভাই-বোনদের অন্ন-সংস্থানের জন্য ফুলমিয়াকে চাকরীর সন্ধানে ফিরতে হয় এখানে-সেখানে। অল্প লেখাপড়া এবং ভাল ব্যাকিং না থাকার জন্য কোথাও কোন চাকরি মেলে না। এদিকে সংসারের অভাবের তাড়নায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে–এমন দিনে বাপ মারা যায়। মাঝখানে বিয়েও করে নিয়েছিলো সে। ছোট-ছোট ভাই-বোন এবং নতুন বৌ-এর খাওয়া-পরা নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়লো ফুলমিয়া।
