বনহুর যতই ভাবে ততই বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে…নীহার আজকাল সব সময় তাকে ঘিরে রাখতে চায়। তার শরীরে যেন আঁচড় না লাগে। জানে বনহুর, নীহারের আশঙ্কা অহেতুক নয়। নাসের যেভাবে তার পিছু নিয়েছে তাতে নিজকে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত মনে হয় না।
যত বেশি ভাবে বনহুর, নীহারের প্রতি একটা মায়াময় মনোভাব আচ্ছন্ন হয়ে আসে। দোষ কি ওর–আর তারই বা ত্রুটি কোথায়? নীহার তাকে ভালবেসে তার মঙ্গলের জন্যই সে এতোটা করে জানে বনহুর। তাই আজ সে নীহারকে অনেকটা ঘনিষ্ঠ আপনজন মনে করে।
এরপর আর এলো না নীহার নাবিক আলমের কক্ষে।
কিন্তু নীহার না এলেও সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতো, তার বিশিষ্ট এক ভৃত্যের দ্বারা সন্ধান নিতো সে সর্বক্ষণ আলমের।
দুটো দিন কেটে গেলো।
জাহাজ ইরুইয়া বন্দরে নোঙ্গর করলো তৃতীয় দিনে।
আবু সাঈদ স্বয়ং কন্যাসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করার উদ্দেশ্যে ইরুইয়া বন্দরে অবতরণ করবেন জানালেন।
এ দুদিনের মধ্যে নাসের নানাভাবে যুক্তি-পরামর্শ করেও নাবিক আলমকে কাবু করার কোনো উপায় অবলম্বন করতে সক্ষম হলো না। যত রাগ-ক্ষোভ আর বিষপূর্ণ মনোভাব অন্তরে চেপে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো দারুণভাবে।
জলিল, শম্ভু আর জম্বুও সাহস পেলো না আলমকে সহসা আক্রমণ করতে।
কদিন বেশ নিশ্চিন্তেই কাটলো বনহুরের।
ডিউটির সময় ইঞ্জিন-ক্যাবিনে কাটে তার, অবসর তার বেশিক্ষণ নয়–সামান্য কয়েক ঘন্টা মাত্র। আজকাল সেই সময় টুকুই যেন কাটতে চায় না। যতক্ষণ ইঞ্জিনের কাজে ব্যস্ত থাকে ততক্ষণ বেশ থাকে, তারপর ছুটি হলেই একটা ক্লান্তি আর অবসাদ তার সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে। ফেলে। নানা চিন্তা জট পাকায় এক সঙ্গে তার মনের গহনে।
*
ইরুইয়া বন্দরে জাহাজ নঙ্গোর করার পর জাহাজের যাত্রিগণ সবাই বন্দরে অবতরণ-আশায় চঞ্চল হয়ে উঠলো। কয়েকটি দিন একটানা জাহাজে কাটিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে যেন ওরা বেলুনের বদ্ধ হাওয়ার মত।
সবাই প্রস্তুত হয়ে নিলো বন্দরে নামবার জন্য।
ক্যাপ্টেন জানালেন, ইরুইয়া বন্দরে মাত্র একটি দিন তারা অপেক্ষা করবেন। এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সব সংগ্রহ করে নিতে হবে।
বনহুরের নিজের জন্য কয়েক বান্ডিল সিগারেট ছাড়া আর কিছু প্রয়োজন নেই। বললো বনহুর এক সময় কেশবকে–কেশব, তোমার যদি কিছু দরকার মনে করো নিতে পারো ইরুইয়া থেকে।
কেশব মাথা চুলকালো–আপনি নামবেন না বাবু?
হ, ইরুইয়া বন্দরটা দেখবার সখ আমার আছে, নামবো।
তাহলে চলুন না বাবু, মেম সাহেব আপনাকে যাওয়ার জন্য আমাকে বললেন।
ভ্রূ কুঁচকে তাকালো বনহুর–মেম সাহেব আমাকে যাওয়ার জন্য তোমাকে বলেছে?
হাঁ, তিনি বললেন আমাকে ডেকে–কেশব, তোমার বন্ধুকে বলো ইরুইয়া বন্দরে অবতরণকালে সে যেন আমার সঙ্গে যায়।
তার এ সখ কেন, জানতে চাইলে না?
বাবু…কেশব কিছু বলতে চাইলো কিন্তু মুখ দিয়ে বের হলো না।
এমন সময় আবু সাঈদ এসে পড়লেন–পাশে নীহার। বললেন আবু সাঈদ আলম, আমাদের সঙ্গে তোমাকেও যেতে হবে।
চোখ তুলে তাকালো বনহুর। আবু সাঈদের মুখ থেকে দৃষ্টিটা একবার ফসকে গেলো নীহারের নতমুখে। অনুমানে বুঝতে পারলো, পিতার ইচ্ছার পিছনে কন্যার একটা যোগাযোগ আছে। বললো–আমি বরং ইঞ্জিনের মেশিনগুলো ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখে নিই। কথাটা বলে আর একবার সে তাকালো নীহারের দিকে।
নীহারও সেই সময় চোখ দুটো তুলে তাকিয়েছিলো একবারের জন্য। বনহুরের সঙ্গে চোখা চোখি হতেই পুনরায় মাথাটা নত করে নিলো।
আবু সাঈদ বললেন–ইঞ্জিন পরীক্ষার কাজ চালাবে ইঞ্জিনিয়ার, তোমাকে আমার সঙ্গে যেতেই হবে আলম। কারণ নতুন এক জায়গায়, বিশেষ করে নীহার আমার সঙ্গে থাকবে কিনা, বুঝলে?
বনহুর বুঝতে পেরেছে প্রথম কথাতেই, এবার রাজি না হয়ে উপায় রইলো না কিছু। বললো–বেশ, যাবো।
তৈরি হয়ে নাও আলম, আমরা এক্ষুণি জাহাজ থেকে বন্দরে অবতরণ করবো।
বনহুর দেখলো, নীহারের মুখে একটা আনন্দের দ্যুতি খেলে গেলো। দীপ্ত চোখে তাকালো একবার ওর মুখের দিকে। মনোভাব–তুমি যদি আমার সঙ্গে থাকো, ভয় কিসে!
ওরা চলে গেলো।
বনহুর স্বাভাবিক নাগরিক ড্রেসে সজ্জিত হয়ে নিলো। কিন্তু সেদিনের নাসেরের গুলীভরা পিস্তলখানা প্যান্টের পকেটে গোপনে লুকিয়ে নিতে ত্রুটি করলো না।
আবু সাঈদ ও নীহারের সঙ্গে বনহুরও চললো।
অন্যান্য সবাই যার-যার ইচ্ছামত নেমে পড়ছে।
সিঁড়ি বেয়ে বন্দরে অবতরণ করছে সবাই। আবু সাঈদ এবং নীহার প্রধান সিঁড়ি দিয়ে। এগুচ্ছেন। বনহুর আসছে তাদের পিছনে। সিঁড়িটা শূন্যের উপরে দুলছে, নিচে প্রচন্ড জলস্রোত। নীহার বড় ভয় পাচ্ছিলো। সিঁড়ির সঙ্গে দুলছে নীহারের কম্পিত দেহটা।
আবু সাঈদ বয়স্ক লোক; তিনি কন্যাকে এগিয়ে নেবেন কিন্তু তারও সাহস হচ্ছিলো না যেন। নীহার তখন সিঁড়ির মাঝখানে এসে গেছে।
অসহায় ভীতি দৃষ্টি নিয়ে তাকালো নীহার বনহুরের দিকে। বনহুর তখনও সিঁড়ির উপরে পা রাখেনি, কারণ মালিক এবং মালিক-কন্যা পার হবার পর সে এগুবে। নীহারের করুণ অবস্থা দেখে বনহুর ভড়কে গেলো কিছুটা, হঠাৎ যদি পড়ে যায় তাহলে যে প্রখর স্রোত, নিচে ওকে খুঁজে পাওয়াই মুস্কিল হবে। হঠাৎ বনহুরের চোখের সম্মুখে লুসীর করুণ মুখখানা ভেসে উঠলো ক্ষণিকের জন্য। বনহুর দক্ষিণ হাতখানা বাড়িয়ে ধরে ফেললো ওকে, বললো–সাবধানে আমার হাত ধরে চলুন মেম সাহেব।
