নীহার অবাক হয়ে তাকালো।
জীবনে সে বহু পুরুষ দেখেছে, যদিও সে কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়নি। কিন্তু যতটুকু পরিচয় হয়েছে তার সঙ্গে সবাই তাকে কাছে পেলেই কিসের যেন একটা লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে দেখেছে। সুযোগ পেলেই শুনিয়েছে প্রেমবাণী। আরও কাছে পাবার জন্য তারা যেন পশুর মত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে।
নীহারের চোখেমুখে এক মধুময় দীপ্তভাব ফুটে উঠে। নিজের আঁচলে বনহুরের চোখের গড়িয়ে পড়া দু’ফোঁটা পানি মুছিয়ে দেয়।
বনহুর পুনরায় নীহারের হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বাষ্প ভরা গলায় বলে নীহার, চোখের অশ্রু যেমন করে মুছিয়ে দিলে, পারবে অমনি করে আমার মন থেকে সব ব্যথা-বেদনা মুছে ফেলতে?
পারবো। তোমার সব বেদনা আমি মুছে ফেলতে পারবো। কথাটা বলে নীহার হঠাৎ বনহুরের বুকে মাথা রাখে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাবিনে প্রবেশ করে নাসের, দক্ষিণ হস্তে তার উদ্যত পিস্তল।
২.১৫ ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ
নাসেরের দৃষ্টিদ্বয় হতে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বের হচ্ছে। পিস্তল হস্তে যমদূতের মত এসে দাঁড়িয়েছে সে। পৈশাচিক নিষ্ঠুর মুখোব।
নীহার বনহুরকে আড়াল করে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো, তীব্র কঠিন কণ্ঠে উচ্চারণ করলো–নাসের সাহেব, এতো বড় স্পর্ধা আপনার কি করে হলো?
মুখোভাব আরও কুৎসিত হয়ে উঠলো তার, দাঁতে দাঁত পিষে বললো–স্পর্ধা আমার, না ঐ ছোটলোকটার? সরে দাঁড়াও নীহার, এই মুহূর্তে ওকে আমি হত্যা করবো।
আমি ওকে হত্যা করতে দেবো না। দেখি আপনি কেমন করে ওকে হত্যা করেন।
ওঃ– এ তো দরদ! নীহার, একটা নাবিকের জন্য তুমি নিজকে বিপন্ন করতে চাও?
হাঁ, আমাকে হত্যা করে তারপর ওকে…রাগে কণ্ঠরোধ হয়ে আসে নীহারের।
ব্যঙ্গপূর্ণ হাসি হাসে নাসের–ওর জন্য মরতেও রাজি আছো দেখছি। নীহার, মনে রেখো তোমাকে আমি হত্যা করবো না, কারণ তোমাকে হত্যা করলে আমার সব আশা-আকাক্ষা মাঠে মারা যাবে। তোমাকে আমার প্রয়োজন।
বনহুর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে, সরল-সহজভাবে দৃষ্টি শুধু স্থির হয়ে আছে নাসেরের মুখে।
নীহার তীক্ষ্ণকণ্ঠে বললো–তোমার আকাঙ্ক্ষা কোনোদিনই পূর্ণ হবে না শয়তান।
শয়তান আমি না তোমার ঐ নাবিক বন্ধু?
নাসেরের কথা শেষ হতেই বনহুরের এক শটে ওর হাতের পিস্তলখানা ছিটকে পড়লো গিয়ে কেবিনের দেয়ালে, ধাক্কা খেয়ে সে পড়লো এসে মেঝেতে।
বনহুর বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে ধরলো নাসেরের জামার কলার।
ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে উঠলো নাসেরের মুখ। মুহূর্তে এমন একটা পরাজয়ের কালিমা লেপন হবে তার মুখে, ভাবতেও পারেনি সে। প্রথমে হকচকিয়ে গেলো নাসের কিন্তু পরক্ষণেই নিজকে সামলিয়ে নিয়ে রুখে দাঁড়ালো।
নীহার তখন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
নাসের বনহুরের মাথা লক্ষ্য করে প্রচণ্ড এক ঘুষি চালালো।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর মাথাটা সরিয়ে নিলো, ঘুষিটা ব্যর্থ হলো তার। পরক্ষণেই বনহুরের দক্ষিণ হস্তটা গিয়ে পড়লো নাসেরের মুখে। একটা পাক খেয়ে ঘুরে পড়ে গেলো নাসের মেঝেতে।
এক চক্র দিয়ে উঠে দাঁড়ালো নাসের, পরক্ষণেই ঝাঁপিয়ে পড়লো বনহুরের উপর। বনহুর হুট করে ওর হাত ধরে মোচড় দিলো খুব জোরে।
নাসেরের মুখ কালো হয়ে উঠলো, দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে লাথি দিলো বনহুরের হাঁটুতে।
বনহুর তার আগেই ওর হাত ছেড়ে দিলো, সঙ্গে সঙ্গে দড়াম করে পড়ে গেলো নাসের।
বনহুর নাসেরের হাত থেকে ছিটকে-পড়া পিস্তলখানা আলগোছে তুলে নিলো হাতে। নাসের এবার কেঁচোর মত কুঁকড়ে গেলো যেন। কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে হাতের পিঠে নাকের মাথাটা একবার মুছে নিয়ে আড়চোখে তাকালো বনহুরের হস্তস্থিত তারই পিস্তলখানার দিকে।
নাসেরের দৃষ্টি এবার স্থির হলো বনহুরের চোখে, আজ যেন প্রথম দেখলো নাসের নাবিক আলমের নতুন রূপ।
বনহুর গম্ভীর দৃঢ়স্বরে বললো বেরিয়ে যাও এই মুহূর্তে।
বনহুরের বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বরে নাসেরের হৃৎপিন্ড কেঁপে উঠলো থর থর করে। আর এক দন্ড দাঁড়াবার সাহস হলো না তার। বেরিয়ে গেলো অনুগত ভুত্যের মত পিছু হটে।
নাসের বেরিয়ে যেতেই ফিরে তাকালো বনহুর নীহারের দিকে।
রাজ্যের বিস্ময় যেন ঝরে পড়ছে ওর দু’চোখে। স্ফীত উজ্জ্বল দীপ্তময় নীহারের মুখমন্ডল। শুধু। আশ্চর্যই হয়নি সে ওর শক্তির পরিচয়ে, তার প্রতি অনুরাগ আরও গভীরতম হয়ে উঠেছে।
কয়েক পা এগিয়ে আসে নীহার।
বনহুর হস্তস্থিত রিভলভারখানা বিছানার উপর ফেলে দিয়ে বসে পড়ে বিছানায়। আঙ্গুল দিয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো সংযত করে নিয়ে বলে–মেমসাহেব, আপনি মাফ করবেন। আমাকে। একজন নাবিক ছাড়া আমি কিছু নই। এখানে আসাটা আপনার মোটেই উচিত নয়।
আলম, তুমি আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছে?
না।
তবে অমন করে কথা বলছো কেন?
আপনি জানেন আমার ক্যাবিনে আসাটা আপনার জন্য সম্পূর্ণ অসঙ্গত। আমি অনুরোধ করছি, আপনি আমার ক্যাবিনে আর আসবেন না।
আলম!
হা মেম সাহেব।
নাসেরের আগমনে তুমি আমাকে..
আমাকে মাফ করবেন মেম সাহেব, আমি অক্ষম…
নীহার নতমুখে বেরিয়ে যায় মন্থর গতিতে আলমের ক্যাবিন থেকে।
বনহুর শয্যায় বসেছিলো, উঠে পায়চারি শুরু করলো। মনটা বড় এলোমেলো লাগছে, নীহারের সঙ্গে একটু পূর্বে তার যে সম্বন্ধ গড়ে উঠেছিলো, অশোভনীয় লাগছে এখন। তবে অসঙ্গত এমন কিছু নয় যা তার এবং নীহারের জীবনকে কলুষিত করেছে। নীহারকে ‘তুমি’ সম্বোধনটা খুশি করেছিলো যথেষ্ট এবং ওকে খুশি করবার জন্যই বলেছিলো সে। কিন্তু এতোটা নিচে নেমে আসা হয়তো তার পক্ষে সমীচীন হয়নি। নীহার এবং তার দু’জনার জন্যই অমঙ্গলজনক তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
