নীহার!
আলম, বলো তুমি কি চাও আমার কাছে?
বনহুর স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিলো মুক্ত গবাক্ষে। সীমাহীন জলরাশির উচ্ছলতার দিকে তাকিয়ে শুনে যাচ্ছিলো। নীহারের আবেগভরা কথাগুলো। ফিরে তাকালো বনহুর এবার নীহারের শেষ কথাটা শুনে। দেখলো ওর চোখেমুখে এক অপূর্ব ভাবের উন্মেষ।
বনহুরের বুকের মধ্যে একটা আলোড়ন শুরু হলো। দেহের মাংস পেশীগুলো যেন সজাগ হয়ে। উঠলো ক্রমান্বয়ে। সোজা হয়ে বসলো বনহুর।
নীহার ঠিক তার অর্ধ হাত দূরে, তারই শয্যায় বসে রয়েছে। নীল মায়াভরা দুটি চোখে মোহময় চাহনি। গোলাপের পাপড়ির মত দুটি আঁখিপল্লব। ওষ্ঠদ্বয় অর্ধস্ফীত। কুঞ্চিত একরাশি চুল বিনী করে ঝুলানো রয়েছে পিঠে ঠিক একটি সাপের মত।
বনহুর নিশ্বাস নিলো। একটা সুগন্ধ প্রবেশ করলো তার নাসিকারন্ধ্রে। নীহারের দেহের মিষ্ট গন্ধ এটা জানে বনহুর। কারণ আরও অনেকদিন এ গন্ধ বনহুরের নাকে প্রবেশ করেছে তার অসুস্থকালে। অতি পরিচিত এ গন্ধ। নীহার শিয়রে এসে দাঁড়ালেই বনহুর টের পেতো নীহার এসেছে, কারণ নীহারের দেহের সুগন্ধ এটা।
অবশ্য নীহার ইচ্ছে করে সুগন্ধ ব্যবহার করে তবে এ ক্যাবিনে আসতো না। ধনবান দুহিতা মূল্যবান প্রসাধন ব্যবহার করতো–তাই এ গন্ধ। বনহুর তাই ঐ গন্ধের সঙ্গে বিশেষ করে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলো।
আজ নীহারের দেহের মিষ্ট সুবাস বনহুরের আনমনা নাককে চঞ্চল করে তোলে। নীহারের হাতখানার উপর আস্তে তার হাতখানা রাখে।
নীহার শিউরে উঠলেও চমকায় না। বুকটা টিপ টিপ করতে থাকে। একটা অনুভূতি দোলা জাগায় সমস্ত দেহ আর মনে। মাথা নত করে নেয় নীহার। চোখ তুলে তাকাতে পারছে না যেন আর সে।
সেদিন নাসেরের ক্ষুধিত শার্দুলের মত ক্ষুব্ধ আক্রমণে নীহার ক্ষিপ্তের ন্যায় হয়ে উঠেছিলো। নিজকে বাঁচানোর জন্য সে চালিয়েছিলো ভীষণ সংগ্রাম। মৃত্যুকেও সে ঐ মুহূর্তে জয় করে নিতে। কি কঠিনভাবে যুদ্ধই না সে করেছিলো নাসেরের সঙ্গে নিজকে রক্ষা করার জন্য।
নীহার মরিয়া হয়ে উঠেছিলো নাসেরের কবল থেকে ইজ্জৎ বাঁচানোর জন্য। সেই মুহূর্তে সে ওকে হত্যা করতেও কুণ্ঠা বোধ করতো না। নাসেরের দেহের মাংস ছিঁড়ে ফেলেছিলো নীহার দাঁত দিয়ে সেদিন।
নীহার জানতো নাসের তাকে ভালবাসে, জানতো তার পিতা আবু সাঈদ ওর সঙ্গে বিয়েও দেবেন। নাসের অসুন্দর যুবক নয় বলিষ্ঠ সুশ্রী সুপুরষ। তবু নীহার ওকে ঘৃণা করতো, কারণ চরিত্রহীন কুৎসিতমনা পুরুষকে কোন সতচরিত্রা নারী প্রেমপ্রীতি আর ভালবাসা দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না।
নীহার সম্ভ্রান্ত ঘরের শিক্ষিতা আদর্শবতী কন্যা। নাসের তাকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করলেও সে কোনো সময় নাসেরের প্রতারণায় আত্নহুতি দিতো না। যতদূর সম্ভব নিজেকে কুচরিত্রের শ্যেন দৃষ্টি থেকে সরিয়ে রাখতো। নাসেরের সংস্পর্শকে সে ঘৃণা করতো চরম আকারে।
নাসের নীহারের কাছে ঘৃণিত ব্যক্তি হিসাবে প্রথম থেকেই অবহেলা পেয়ে এসেছে। যখন। আলম আসেনি এ জাহাজে, তখনও ওকে কোনো সময় প্রশ্রয় দেয়নি, বা প্রীতির চোখে দেখেনি। নাসেরের মত একজন সুদর্শন বলিষ্ঠ তেজোদ্দীপ্ত যুবক পাশে থাকা সত্ত্বেও নীহারের মনে ছিলো অতৃপ্ত বাসনা–যে আকাঙ্খা পূর্ণ করতে পারবে না নাসের।
নীহার যেমন ধীরস্থিরা মেয়ে, চরিত্র যেমন ফুলের মত সচ্ছ-সুন্দর, তেমনি একজনের সন্ধানে সে অহরহ প্রতীক্ষা করতো শান্ত মন নিয়ে খুজতো ফুলের সুবাস।
নাবিক আলমের আগমনে নীহার সন্ধান পেয়েছিলো তার কামনার মানুষটির। প্রথম নজরেই ওকে ভাল লেগেছিলো। সুন্দর চেহারা তখন ঢাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফের আড়ালে। কাজেই নাবিকের রূপলাবণ্য আকৃষ্ট করেনি তাকে। নীহার আকৃষ্ট হয়েছিলো আলমের পৌরুষোচিত কণ্ঠস্বরে, তার দীপ্ত উজ্জল চোখ দুটির চাহনি অভিভূত করেছিলো তাকে।
কিন্তু জানে না নীহার–যাকে খুঁজে পেয়েছে তাকে কোনদিন সে নিজের করে পাবে না। ধূমকেতুর মত এসেছে, আবার হারিয়ে যাবে তার জীবনপাতার অন্তরালে।
নীহার বনহুরের হাতের মধ্যে হাত রেখে নতমুখে বসে থাকে। সরিয়ে নিতে পারে না সে হাতখানা। বনহুর হাতখানা তুলে নেয় হাতের মুঠোয়। বাম হস্তের মধ্যে নীহারের হাতখানা নিয়ে দক্ষিণ হস্ত বুলোতে থাকে ওর হাতের উপর। এমনি একটি কোমল নরম হাত কদিন আগেও সে হাতের মুঠায় রেখেছিলো, কিন্তু কালচক্রে আজ সে হাত কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে। হিংস্র জন্তুর গহ্বরে চলে গেছে, না কোনো জংলীদলের কবলে ধরা পড়েছে–কে বলবে তাকে তার সন্ধান বনহুরের গন্ড বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
বনহুর বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলে নীহার!
চোখ তুলে নীহার, আলমের চোখে পানি দেখে চমকে উঠে–আলম তুমি কাঁদছো?
একটা জমাট ব্যথা যেন বেরিয়ে আসে বনহুরের বুক চীরে। দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে– নীহার, আমি বড় দুঃখী! বড় একা।
আলম, আমি তোমাকে বলছি, যা চাও আমি তোমায় তাই দেবো! আর আমি যদি থাকি। তোমার পাশে?
নীহার!
আলম, আমার অতৃপ্ত হৃদয় তোমায় খুঁজে পেয়েছে; আমি তোমায় কোথাও যেতে দেবো না আর।
একটা করুণ বিষণ্ণ হাসির স্মিত রেখা ফুটে উঠলো বনহুরের ঠোঁটে। নীহারের হাতখানা সেই মুহূর্তে খসে পড়লো বনহুরের হাতের মুঠা থেকে।
