হেড নাবিকের মৃত্যুর পর ঐ পদে ছিলো আলম।
আলম এক্সিডেন্ট হবার পর হেড নাবিকের কাজ করে চলেছে নাবিক ফারুক আলী। যে ফারুক আলীকে নাসের হাতের মুঠায় ভয়ে নিয়েছে।
নীহার পিতার অনুমতি নিয়ে আলমকে দেখাশোনার ভার নিয়েছিলো, কাজেই সে সময় অসময় সর্বক্ষণ যেতো নিচের ডেকে নাবিক আলমের ক্যাবিনে।
স্বল্প পাওয়ারের আলোতে ছোট বোয়াটে ক্যাবিনটার মধ্যে এসে দাঁড়াতে নীহার। তাকিয়ে দেখতে অসুস্থ আলমের ঘুমন্ত মুখ। করুণ ব্যথাভরা লাগতো ওকে। আহা বেচারী, কেউ নেই ওর। নীহারের গন্ড বেয়ে দু’ফোঁটা পানি ঝরে পড়তো।
নীহার আলগোছে কম্বলটা ঠিক করে দিতো আলমের দেহে।
কোনোদিন শিয়রে বসে কপালে হাত রাখতো।
ঔষধ খাওয়ানোর সময় হলে কতদিন খাইয়ে দিতো।
আলমের তখন হুশ ছিলো না, সে তখন ক্ষতের ব্যাথায় কাতর।
যখন তার হুশ হলো, তখন নীহারকে তার অপরিচ্ছন্ন ক্যাবিনে দেখে অবাক হলো–মেম সাহেব এসেছেন তার রোগশয্যার পাশে!
বনহুর একদিন বলেই ফেলেছিলো–মেম সাহেব, আপনি কষ্ট করছেন আমার জন্য!
হেসে বলেছিলো নীহার–আমার এ কষ্ট দিয়ে তোমার কষ্ট যদি লাঘব করতে পারতাম, তার চেয়ে আনন্দ বুঝি আমার আর কিছু ছিলো না।
বনহুর সেদিন এক অভূতপূর্ব খুশিতে অভিভূত হয়ে পড়েছিলো, বলেছিলো মেম সাহেব, আপনি আমাকে এতো আর বলতে পারেনি সে।
কেশব এসে পড়েছিলো কক্ষের মধ্যে।
বনহুর চোখ মুদে ছিলো তখন অনিচ্ছাসত্ত্বে নীহারের দিকে চাইতে পারেনি সে।
নীহার বনহুরকে ঔষধ খাইয়ে চলে গিয়েছিলো সেদিন, শোনা হয়নি তার–কি বলতে চেয়েছিলো আলম।
*
বনহুর ক্যাবিনের বিছানায় অর্ধশায়িত অবস্থায় শুয়ে তাকিয়েছিলো পাশের ছোট শার্সী দিয়ে কলকল ছলছল জলরাশির দিকে।
ক্যাবিনে বা আশেপাশে কেউ নেই। কেশব কাজে গেছে। বনহুরকে বড় একা লাগছে আজ। এখন তো সে অসুস্থ নয়। প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ বলা বলে।
কাঁধে এবং হাতে দু’এক জায়গায় ছোট্ট পট্টি রয়েছে এখনও। তবে ভয় নেই আর, বিপদ কেটে গেছে পূর্ণভাবে। বনহুর ভেবে চলেছে তার বিগত জীবনের কথা।
ঠিক সেই সময় লঘু পদশব্দ শুনতে পেলো বনহুর।
হালকা হিলের খুটখাট শব্দ।
আজ এ ক’দিনে এই শব্দটার সঙ্গে বেশ পরিচিত হয়ে গেছে সে। নীহারের জুতোর শব্দ বুঝতে পেরে বনহুর যেমন ছিলো তেমনি থাকে।
এ শব্দটা বড় ভাল লাগে দস্যু বনহুরের কাছে। মায়া-মমতা আর প্রীতির ছোঁয়া যেন লেগে আছে এ শব্দের সঙ্গে; স্নিগ্ধ হিমেল হাওয়ার মত মিষ্ট এ শব্দটা মনে হয় বনহুরের কাছে।
সুমিষ্ট কণ্ঠের প্রতিধ্বনি জাগে–ঔষধ খেয়েছো আলম?
সোজা হয়ে বসে বনহুর–মেম সাহেব আপনি!
আবার তুমি আমাকে মেম সাহেব বলছো? মেম সাহেব বললে আমি কিন্তু বড় রাগ করবো।
আমি গরিব বেচারী কি বলে ডাকতে পারি বলুন?
নাম ধরে ডেকো।
নাম! আপনার নাম ধরবো আমি?
দোষ কি আমার নাম ধরতে?
কি যে বলেন, আমরা চাকর-বাকর নাবিক মানুষ…
আবার নেকামি? আমি তো বলেছি তোমার সব খোঁজ জানি?
কেশব যা বলছে মোটেই সত্য নয়।
কেশব মিথ্যা বললেও আমার চোখ তো মিথ্যা নয়। আমার দৃষ্টি বলছে–তুমি সাধারণ মানুষ নও।
নীহার! হঠাৎ বনহুরের মুখ দিয়ে শব্দটা বেরিয়ে এলো।
বনহুরের মুখে নামটা শুনে নীহারের চোখ দুটো আনন্দে স্ফীত হয়ে উঠলো। বসে পড়লো সে বনহুরের বেডের পাশে।“হাঁ, তুমি আজ থেকে আমাকে নাম ধরে ডাকবে।
তা হয় না মেম সাহেব। আপনি মনিব-কন্যা আর আমি…
আলম!
বলুন?
তোমার যদি এতো অসুবিধা মনে হয় তবে সবার আড়ালে তুমি আমায় নাম ধরে ডাকবে? নীহার বনহুরের মুখের দিকে ব্যাকুল আঁখি মেলে তাকালো।
বনহুর শয্যায় দেহটা এলিয়ে দিলো, একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললো–যদি খুশি হন। আপনি তবে তাই ডাকবো।
কিন্তু আপনি নয় তুমি বলতে হবে।
আমাকে এতোটা প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না মেম সাহেব।
কেন?
সে জবাব আমি দিতে চাই না।
ঔষধ খেয়েছো?
আর কত ঔষধ খাবো? এখন তো আমি সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেছি।
শরীর তো মোটেই সারেনি। আরও এক সপ্তাহ তোমাকে বিশ্রাম নিতে হবে।
আমি যে দম বন্ধ হয়ে মারা পড়বো মেম সাহেব?
বেশ, আমি তোমাকে মুক্ত হাওয়ায় নিয়ে যাবো। নাও, ঔষধটা খেয়ে নাও। শিশি থেকে ছোট্ট গেলাসটায় ঔষধ ঢেলে বনহুরের মুখের কাছে এগিয়ে ধরে।
বনহুর হাত বাড়ায়–দিন।
নীহারের হাত থেকে ঔষধের ছোট্ট গেলাসটা নিতে গিয়ে বনহুরের হাতখানা লাগে নীহারের হাতে। অভূতপূর্ব এক শিহরণ বয়ে যায় নীহারের সমস্ত দেহে, হাতখানা চট করে সরিয়ে নিতে পারে না ওর হাতের তলা থেকে।
বনহুর বলে–নীহার, সত্যি তোমার অন্তরের অনুভূতি বরফের চেয়েও ঠান্ডা। গভীর তোমার প্রতিবোধ। সামান্য নাবিক জেনেও তুমি আমাকে ঘৃণা করোনি কোনোদিন। তোমার সচ্ছ হৃদয়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
বনহুর নীহারের হাত থেকে ঔষধের ছোট্ট গেলাসটা নিয়ে ঔষধ পান করে।
নীহার তখন অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুরের দিকে। একজন সাধারণ নাবিকের মুখে এ কথা তাকে যেন সম্বিৎ হারা করে ফেললো। বুঝতে পারলো, কেশবের কথা শুধু সত্যই নয়, একেবারে খাঁটি বিশ্বাসযোগ্য। বললো নীহার–আলম, তুমি নাবিক সেজে কেন নিজেকে এভাবে গোপন রেখেছো?
হাসলো বনহুর–কাজ তো কোনোদিন ছোট হয় না নীহার। যে কোন কাজের মাধ্যমেই মানুষ মহত্বের পরিচয় দিতে পারে।
আলম, তোমাকে যত দেখি তত আরও দেখতে ইচ্ছা করে। যত ভাবি তোমার কথা, ততই আরও ভাবতে চায় মন। তোমার সান্নিধ্য আমাকে আত্নবিস্মৃতির পথে টেনে নিয়ে যায়….
