বনহুর শয্যায় উঠে বসতে যায়। মুখখানা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে উঠে–ভাবে বনহুর, তবে কি কেশব সব কথা নীহারের কাছে বলে দিয়েছে…
নীহার শুইয়ে দেয় পুনরায় ওকে, বলে সে–আমি সব শুনেছি, কিন্তু কেন নিজকে গোপন করে নাবিক বেশে পরিচিত হয়েছো আলম?
মেম সাহেব, আমি অতি সাধারণ, তবে বড় খামখেয়ালী কিনা, তাই বুঝি কেশব আপনাকে যাতা বলেছে।
নিজকে লুকোতে চাইলেই লুকোনো যায় না আলম। তুমি ঘুমাও, আমি চললাম।
বনহুর কোনো জবাব দিলো না।
নীহার কম্বলখানা ভালভাবে বনহুরের দেহে টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
বনহুর পাশ ফিরে শুলো।
কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো, কেশব কি তাহলে ছেলেমানুষের মত সব কথা প্রকাশ করে দিয়েছে নীহারের কাছে।
সমস্ত রাত কেমন যেন ছটফট করে কাটাতে লাগলো বনহুর। কেবলি নীহারের শেষ কথাটা মনে আঁচড় কেটে চললো, নিজকে লুকোতে চাইলেই লুকোনো যায় না আলম।
তবে কি কেশব সব ব্যক্ত করে দিয়েছে? নিশ্চয়ই তাই হবে।
পরদিন কেশবকে ডেকে বললো বনহুর–কেশব শোনো।
কেশব খুশি হয়ে এলো বনহুরের পাশে, শিয়রে বসলো–বাবু কিছু বলবেন?
হা।
বলুন বাবু?
কেশব, আমি তোমাদের বিশ্বাস করি, তোমাকে আমি নিজের ভাই-এর মত মনে করি। আর। তুমি আমার সম্বন্ধে সব কথা বলে দিয়েছো মালিকের কন্যা নীহারের কাছে?
অবাক হয়ে তাকালো কেশব, বললো–আপনি কি বলছেন বাবু? আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
কেশব, তুমি নীহারের কাছে আমার আসল পরিচয় ব্যক্ত করেছো?
না তো বাবু।
হাঁ, তুমি আমার পরিচয় দিয়েছো ওর কাছে? সব কিছু বলেছে?
মাফ করবেন বাবু, আমি নিজে কিছু বলিনি। মেম সাহেব একদিন আমাকে ডেকে বললেন, কেশব, তোমার বাবুকে দেখলে কিন্তু নাবিক বলে মনে হয় না।
তুমি কি বললে?
আমি বললাম–বাবু আসলেই নাবিক নন, তিনি মস্ত বড়লোকের ছেলে।
হুঁ, শুধু তাই বলেছো?
হাঁ বাবু, আমি শপথ করে বলছি শুধু তাই বলেছি।
বনহুর নিশ্চিত হয়ে চোখ মুদলো, একটা চাপ যেন নেমে গেলো তার বুক থেকে।
*
বনহুর প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে।
কাজে যোগ দিতে চাইলেও আবু সাঈদ তাকে কাজ করতে দেননি, বলেছেন আর কয়েকদিন বিশ্রাম গ্রহণ করতে হবে। অগত্যা বনহুর শুয়ে-বসেই কাটাচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের জাহাজ দুটো বন্দর অতিক্রম করেছে। লাইলিয়াস বন্দর আর হিংলী বন্দর–এখানে দু’চারদিন নোঙ্গরও করেছে তাদের জাহাজ।
ক্যাপ্টেন জানিয়েছেন আর দু’দিন পর তাদের জাহাজ ইরুইয়ায় পৌঁছবে। ইরুইয়ায় একদিন অপেক্ষা করবার পর জাহাজ রওয়ানা দেবে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপে।
ইরুইয়ায় প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করে নেবেন আবু সাঈদ–চাউল, ময়দা, মুরুগী, শুকনো দুধ আর ফলমূল। এসব ছাড়াও অনেক জিনিস ক্রয় করতে হবে।
আবু সাঈদ কন্যাসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির একটি লিস্ট তৈরী করে ফেললেন। অন্য সময় হলে এক্ষণে নাসের থাকতো তাদের পাশে। পর পর কয়েকটা ঘটনার পর আবু সাঈদের মন যেন নাসেরের উপর বিরূপ হয়ে পড়েছিলো। কাজেই তিনি কতকটা ইচ্ছে করেই ওকে এড়িয়ে চলছেন আজকাল।
নীহার সেদিনের নাসেরের ঘটনাটা পিতার কাছে সচ্ছভাবে বলতে না পারলেও যতটুকু ব্যক্ত করেছিলো, তাতেই আবু সাঈদের কাছে নাসেরের আসল রূপ উদঘাটিত হয়ে পড়েছিলো। শুধু অমানুষই নয় সে, নষ্ট চরিত্রহীন এক কুৎসিত যুবক।
তার এতোদিনের ইচ্ছার পাদমূলে কুঠারাঘাত হয়েছিলো। দূষিত আবর্জনার মত মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিলেন আবু সাঈদ নাসেরকে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেই ওকে পর্যটক দল থেকে বিতাড়িত করবেন–এ কথাও তিনি মনে মনে স্থির করে ফেলে ছিলেন। নীহারকেও তিনি বলে দিয়েছিলেন ওর সংস্পর্শে যেন আর না যায় সে।
শুধু আবু সাঈদই নন, নীহারও আজকাল নাসেরকে দেখে তুচ্ছ জ্ঞান করে পরিহার করে চলে।
আবু সাঈদের অবহেলার চেয়ে নীহারের অবজ্ঞাভরা ভাব দুষ্ট নাসেরকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। নানা ব্যাপারে বেশ কয়েকবার বিফল মনোরথ হয়ে খৰ্গহস্ত হয়ে উঠে সে। সদা-সর্বদা চলে গোপন পরামর্শ জলিল, শুম্ভ আর জন্ধুকে নিয়ে।
নাবিক ফারুক আলীকেও দলে টেনে নেয়; ওকে দিয়ে পুনরায় যদি কোনো পথ পরিস্কার করা। যায়!
আসলে ফারুক আলী মন্দ লোক নয়। সে জীবনের ভয়ে মুখ বুজে থাকে, এবং নাসেরের দলবলের সঙ্গে যোগ দিয়ে চলে। মকবুলের মৃত্যুরহস্য তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে ঐদিন যেদিন নাসের বলেছিলো–আমার কথায় আপত্তি জানালে তোমাকেও মকবুলের মত পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে।
দেশে ফারুক আলীর বৌ ছেলেমেয়ে আছে, সংসার আছে। সবাই মুখ চেয়ে আছে ওর। ফারুক আলী অর্থ নিয়ে দেশে ফিরবে–কত আশা, বাসনা, আর কিনা সে মৃত্যুবরণ করবে! মরতে রাজি নয় সে, জীবনরক্ষার্থে তাকে দু’চারটা-কুকর্ম করতে হয় তাই করবে।
নাসের তার অনুচরদের নিয়ে সদা গোপন বৈঠক করলেও সহজে সে কিছু করে উঠতে পারছিলো না। বিশেষ করে জাহাজের সবাই সতর্ক হয়ে গিয়েছিলো, মকবুলের মৃত্যু, নাবিক আলমকে হত্যার ষড়যন্ত্র ভাবিয়ে তুলেছিলো প্রতিটি যাত্রীকে।
আবু সাঈদের সঙ্গী-সাথী পর্যটকগণও আতঙ্কিত হয়েছেন–আলমের মত একজন কর্মপরায়ণ উন্নতমনা নাবিককেও যখন প্রাণনাশ করার চেষ্টা হয়েছিলো, তখন বিশ্বাস কি।
নীহার নিজের চেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত ছিলো নাবিক আলমের জন্য। পিতাকে বলে সে তার জন্য আরও কিছুদিন ছুটি মঞ্জুর করে নিয়েছিলো। উপস্থিত ওকে বিশ্রাম নিতে হবে।
