বিশ্বজিৎ এতে ভেঙে পড়লো না, সে রাজকুমারী জয়শ্রী দেবীকে পেয়ে আত্মহারা। গহন বনে পর্ণকুটির তৈরি করে সেখানে ঘর বাঁধলো ওরা দু জনে।
বিশ্বজিৎ সারাদিন বনে বনে কাঠ কাটে, সন্ধ্যায় হাটে বিক্রয় করে জয়শ্রীর জন্য নিয়ে আসে। আলতা আর সিঁদুর। নিয়ে আসে ফলমূল আর দুধ। হাসে, খেলে, গান গায়–রাজকুমার এতেই খুশি।
কিন্ত জয়শ্রী ব্যথা- বেদনায় মুষড়ে পড়ে, স্বামীর কষ্ট তাকে অত্যন্ত পীড়া দেয়। আজ তার জন্যই রাজকুমার হয়ে গহন বনে কুড়ে ঘরে বাস করছে। একমুঠি অন্নের সংস্থানে প্রখর রৌদ্রের মধ্যে কাষ্ঠ সংগ্রহ করে সে তারই জন্য।
জয়শ্রী এই জঙ্গলে সখী হিসাবে পেয়েছে ভীলবালা ফুল্লরাকে সে প্রায়ই আসে, ওর কাছে বসে কথা বলে, কখনও বা বন থেকে ফল এনে খেতে দেয়, কখনও বা ফুল দিয়ে মালা গেঁথে পরিয়ে দেয় জয়শ্রীর গলায়।
আজ জয়শ্রীর সঙ্গে ফুল্লরার একটি দৃশ্য গ্রহণ করা হবে।
পরিচালক শ্যামা এবং নূরীকে তাদের চরিত্র সম্বন্ধে বুঝিয়ে দিয়ে সরে দাঁড়ালেন, তারপর উচ্চকণ্ঠে বললেন–লাইট রেডি।
ক্যামেরা সাউন্ড….
ফ্লোরের বাইরে সাউন্ডভ্যান থেকে শোনা গেলো সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের গলা–ও,কে!
সাইলেন্স প্লিজ! অল লাইটস।
নিস্তব্ধ চারিদিক।
প্রখর শক্তিশালী বৈদ্যুতিক আলোগুলো যেন আগুন ছড়াচ্ছে।
ক্লপষ্টিকে সিকোয়েন্স সিন নাম্বার টেক-নাম্বার এবং বই–এর নাম চক পেন্সিলে লিখে এ্যাসিসটেন্ট ক্যামেরার সামনে ধরলো।
পরিচালক বলে উঠলেন স্টার্ট ক্যামেরা।
এ্যাসিসটেন্ট বলে দ্রুত গলায় স্বয়ংবরা। নাম্বার নাইনটি নাইন। টেক থ্রী!
ক্যামেরা চলতে শুরু করে।
কিন্ত ঐ মুহূর্তে নূরী শ্যামাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠে–না না আমি পারবো না, পারবো না এ সব! গলা থেকে ফুলের মালা ছিঁড়ে ফেলে। খোঁপা থেকে খুলে ফেলে ফুলের থোকা।
একি কান্ড, ইউনিট স্তব্ধ হয়ে যায়।
পরিচালক কাট’ বলবার আগেই ক্যামেরাম্যান ক্যামেরা বন্ধ করে ফেলেন।
এবার পরিচালক চিৎকার করে উঠেন–লাইটস্ অফু, ফ্যান্স…
পট পট করে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক আলোগুলো নিভে যায়।
চার পাশে ফ্যানগুলো স্পীডে চলতে শুরু করে।
পরিচালক মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে বসে পড়েন একটা চেয়ারে। সেটে সবাই স্তব্ধ-বিস্মিত হতবাক কারো মুখে কোনো কথা নেই। সহকারী দল এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে।
শ্যামা তখন রাগতভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে, ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে সে-শশী, এ তুমি কি করলে?
নূরী তখন তার সমস্ত মেকআপ নষ্ট করে ফেলেছে, বলে সে–চলো, তোমরা আমাকে শীগগির নিয়ে চলো বাসায় আর এক মুহূর্তও আমি এখানে থাকবো না।
শেষ পর্যন্ত নূরীর কথাই শুনতে বাধ্য হলেন পরিচালক।
*
ললাটে একটি কোমল হস্তের স্পর্শ অনুভব করে চোখ মেললো বনহুর–কেশব, এতো রাত–তুমি ঘুমাও নি?
কেশবের ডিউটি আছে, সে ইঞ্জিন-কক্ষে।
আপনি! আপনি এখানে মেম সাহেব?
কেমন আছো আলম এখন?
অনেক ভাল। কিন্তু আপনি এখানে…
কেন, দোষ কি তাতে?
মেম সাহেব, নিকৃষ্ট এক নাবিকের ক্যাবিনে আপনি সত্যি কল্পনাও করতে পারি না।
আলম, নাবিক বলে তুমি নিকৃষ্ট কে বলো? কেউ না জানুক আমি জানি, নাবিক হলেও তুমি অনেক মহৎ নীহারের হাতখানা তখনো বনহুরের ললাটে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হচ্ছিলো।
পূর্ণ দু’সপ্তাহ পর আরোগ্য লাভ করেছে বনহুর। এখনও সে সম্পূর্ণ সুস্থ নয়। দেহের কয়েকটা ক্ষতে তখনও ব্যান্ডেজ বাঁধা রয়েছে। ডাক্তার আপ্রাণ চেষ্টায় নাবিক আলমের চিকিৎসা করেছেন–আজও করছেন। শুধু আবু সাঈদের অনুরোধেই নয়, ডাক্তার আলমকে কখন ভালবেসে ফেলেছিলেন গভীরভাবে।
দিনরাত পরিশ্রম করেছেন ডাক্তার আলমের জন্য। নানা রকম ঔষধ-ইনজেকশন চালিয়েছে, পথ্যা-পথ্যের দিকে লক্ষ্য দিয়েছেন তিনি ভালভাবে।
নীহার নিজ হাতে আলমের সেবা করেছে, ঔষধ খাওয়ানো থেকে মাথা ধোয়ানোটা পর্যন্ত।
আবু সাঈদ মানা করেননি বা বিরক্ত হননি কোনো সময়। বরং এতে তিনি খুশিই হয়েছেন। ধনবান ঐশ্বর্যশালী লোক হলেও তাঁর অন্তর ছিলো অত্যন্ত সচ্ছ, স্বাভাবিক। কোনো রকম অহঙ্কার বোধ ছিলো না তার মধ্যে! তাই নীহারের নিরহঙ্কার স্বভাবে তিনি আনন্দই পেতেন।
অনেক রাতেও পিতার সঙ্গে কতদিন খোঁজ নিতে আসতো নীহার। আজও এসেছে–কিন্তু আবু সাঈদ তখন নিদ্রামগ্ন ছিলেন।
বনহুর নীহারের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো, দেখলো ওর চোখ দুটো। কেমন মায়াময় ছলছল দুটি চোখ। শুভ্র ললাটে কয়েকগুচ্ছ কোকড়ানো কালো চুল। চিবুকের পাশে একটি তিল চিহ্ন। ক্যাবিনের স্বল্প আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নীহারের চিবুকে তিলটা। বড় সুন্দর লাগছে ওকে– বনহুর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
নীহার দৃষ্টি ফিরাতেই বনহুরের দৃষ্টির সঙ্গে চোখাচুখি হয়।
বনহুর বলে–মেম সাহেব এবার আপনি যান।
আমি তোমার পাশে থাকলে খারাপ লাগে বুঝি?
না। ভাল লাগে।
তবে আমি এলেই তুমি কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করো?
বনহুরের মুখে একটা ব্যথা করুণ হাসি ফুটে উঠে, বলে–আপনি কেমন করে জানলেন ঐ সময় আমি অস্বস্তি বোধ করি?
আমি এলেই তুমি আমাকে চলে যাবার জন্য বারবার ইংগিপূর্ণ কথা বলো।
মেম সাহেব!
না, আমাকে আর মেম সাহেব বলে ডাকবে না।
সে কি!
আমি জানি তুমি নাবিক নও।
চমকে উঠে বনহুর–আপনি কি বলছেন?
কেশবের মুখে শুনেছি, তুমি নাকি সাধারণ লোক নও!
