পছন্দ হয়নি ওর।
বেশ তো! শশী–শশীকলার মতই আত্মবিকাশ করবে চিত্রজগতের আকাশে। হাসলেন আসলাম আলী। তারপর বললেন–শ্যামা, সেটে সব প্রস্তুত শুধু তোমরা হাজির হলেই হয়।
এমন সময় মেক আপ-ম্যান গ্রীনরুমে প্রবেশ করেন।
আসলাম আলী তার সঙ্গে নূরীর পরিচয় করিয়ে দিলেন।
নূরী মেক আপ-ম্যানের অর্থই বুঝে না, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।
আসলাম সাহেব মেক আপ ম্যানকে তার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
শ্যামা নূরীকে বললো–এসো শশীরাণী।
নূরী উঠে এলো।
বড় আয়নাটার সম্মুখে বসতে বললো শ্যামা নূরীকে।
নূরী আদেশ পালন করলো শ্যামার।
মেক আপ ম্যান এসে দাঁড়ালেন নূরীর অতি নিকটে রং এর তুলি হাতে তুলে নিয়ে বাম হাতখানা রাখলেন নূরীর মাথায়।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো নূরী বিদ্যুৎগতিতে।
শ্যামা হেসে উঠলো খিলখিল করে। তারপর বললো–উনি তোমায় সাজিয়ে দেবেন বুঝলে?
নূরী তীক্ষ্ণকণ্ঠে বললো–আমি কারো হাতে সাজতে চাই না। নিজেই ঢের পারি।
অনেক বুঝিয়েও নূরীকে শ্যামা রাজি করাতে পারলো না।
খবর পেয়ে শশব্যস্তে ছুটে এলেন আসলাম আলী, শ্যামার মুখে সব শুনে অবাক হলেন। নানাভাবে বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত নূরীকে রাজি করিয়ে তবে ছাড়লেন।
পার্শ্ব-নায়িকার চরিত্রে রূপ দেবার জন্য নূরীকে একটি ভীলবালার বেশে সজ্জিত করা হলো। এ ড্রেসে ওকে মানালো অপরূপ। আসলাম আলী আনন্দে যেন ফেটে পড়লেন। এবার তার ছবি হিট না করে যাবে না। এখন অভিনয়ে সুনাম রাখলেই হয় মেয়েটা। আশায় বুক ভরে উঠলো তার ভরা নদীর মত।
*
স্টুডিও সেটেলাইট ক্যামেরা সাউন্ড সব প্রস্তুত। শ্যামার সঙ্গে নূরী এসে দাঁড়ালো সেটে। একি! চারিদিকে তাকিয়ে আড়ষ্ট হলো নূরী। কাঁপছে তার দেহটা বেতসপত্রের মত থরথর করে। বিস্ময়ে চোখ তার ছানাবড়া হয়ে উঠলো। শ্যামার আচল চেপে ধরলো ভয়কম্পিত হাতে।
প্রমাদ গুণলেন পরিচালক আসলাম আলী। এতে করে আজ কদিন থেকে অবিরত বুঝিয়েছেন তিনি মেয়েটাকে। তাছাড়াও শ্যামা তো সর্বক্ষণ ওর সঙ্গে রয়েছে ছায়ার মত! আজ নূরীর প্রথম শট, সামান্য কিছু এ্যাকশন আছে। কিন্তু একি বিভ্রাট। সেটে আসবার পূর্বেও কি কম বোঝাতে হয়েছে তাকে। তার আগে মেক আপ নিতে গেছে কয়েক ঘন্টা।
বোম্বে-স্টুডিও ফ্লোর। তারিখ পাওয়াই মুস্কিল। একটার পর একটা ছবি সুটিং চলেছে একটানাভাবে। কোনোরকমে তারিখ করে নিয়েছেন আসলাম আলী দু’টি দিনের জন্য। শুধু কি তারিখ ফেলা ভার? আজকাল ফ্লোর পেতে হলেও চাই টাকা। ঘন্টায় হাজার দিতে হয় স্টুডিও কোম্পানীকে।
নূরীর ব্যাপারে আজ ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যাচ্ছে অহেতুকভাবে। আবার শুরু হলো নূরীকে বোঝানোর পালা।
আসলাম আলী নিজে ম্যান্সক্রিপ্টা হাতে চরিত্রটা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন।
টেকিং শুরু হবে এবার।
ক্যামেরা রেডি করে নিয়ে দাঁড়িয়েছেন ক্যামেরাম্যান মধু বোস। ফ্লোরের বাইরে সাউন্ডভ্যানে ইঞ্জিনিয়ার সারথী বাবু প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছেন।
সেটে একটি কুটিরের দৃশ্য পড়েছে।
দাওয়ার খুটিতে ঠেশ দিয়ে বসে আছে শ্যামা নায়িকা রাজকুমারী জয়শ্রীদেবীর বেশে, এলায়িত রাশিকৃত চুল লুষ্ঠিত হচ্ছে ভূতলে। আঁচলখানা লুটায়িত দাওয়ার নিচে। গম্ভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন। জয়শ্রী, গন্ড বেয়ে গড়িয়ে আসছে দু’ফোঁটা অশ্রু।
নূরী ভীলবালার বেশে দন্ডায়মান তার পাশে। খোঁপায় গলায় হাতে ফুলের মালা। খোঁপাটা বামে উঁচু করে বাঁধা ঠিক্ ভীল নারীদের মত। পায়ে মল।
ছবির নাম হলো “স্বয়ং বরা”
রাজকুমারী জয়শ্রী ভালবাসতো রাজকুমার বিশ্বজিৎকে। কিন্তু দুই রাজ্যের রাজার মধ্যে ছিলো বিরোধ। কাজেই দুই রাজ্যের রাজকুমারী আর রাজকুমারের মিলন কিছুতেই সম্ভব ছিলো না।
প্রেম অন্ধ।
জয়শ্রী বিশ্বজিৎকে না পেলে যেমন বাঁচবে না তেমনি রাজকুমার বিশ্বজিৎ জয়শ্রীকে না পেলে মৃত্যুবরণ করবে।
জয়শ্রীর বাবা রাজা মহন্ত সেন কন্যার জন্য স্বয়ংবরের ব্যবস্থা করলেন। বিভিন্ন দেশে নিমন্ত্রণ পাঠালেন রাজকুমারগণকে আহ্বান জানিয়ে। পাশের রাজ্যের রাজকুমার বাদ পড়লো এ আমন্ত্রণে।
রাজকুমার বাদ পড়লেও সে গোপনে এলো রাজসভায় এক সন্ন্যাসী যুবক বেশে।
কেউ তাকে না চিনলেও চিনতে পারলো জয়শ্রী দেবী।
সখীগণ পরিবেষ্টিত হয়ে মালাহস্তে জয়শ্রী যখন রাজসভায় অসংখ্য রাজকুমারের মধ্যে তার প্রিয়জনকে অন্বেষণ করে ফিরছিলো তখন প্রতিটি রাজকুমার আশায়-উদ্দীপনায় গলাটা উঁচু করে বাড়িয়ে ধরছিলো। কিন্তু জয়শ্রীর কোনদিকে ভূক্ষেপ নেই–সে সম্মুখে এগুচ্ছে।
সখীগণ পিছন থেকে পুষ্পবৃষ্টি করছিলো।
হঠাৎ জয়শ্রী দেখতে পায় তার সামনে ভূতলে বসে এক সন্ন্যাসী যুবক। জয়শ্রী চিনতে পারে তাকে হস্তস্থিত মালাটা পরিয়ে দেয় তার গলায়।
সঙ্গে সঙ্গে রাজসভার অন্যান্য রাজকুমার অমঙ্গলসূচক শব্দ করে দাঁড়িয়ে পড়ে।
কোষাবদ্ধ তরবারি উন্মোচন করে ক্ষিপ্তের মত উঠে দাঁড়ান রাজা মহন্ত সেন–কে ঐ সন্নাসী যুবক তাকে গ্রেফতার করো।
কিছু অদূরেই ছিলো রাজকুমার বিশ্বজিতের তেজবান অশ্ব, মুহূর্ত বিলম্ব না করে রাজকুমারী জয়শ্রী দেবীকে নিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে চেপে বসে উধাও হয়ে যায় হাওয়ার বেগে।
বিশ্বজিতের বাবা জানতে পেরে ভয়ানক ক্রুদ্ধ হন, পুত্রকে তিনি রাজপ্রাসাদে স্থান দেন না। কারণ শত্ৰুকন্যাকে তিনি গ্রহণ করতে পারবেন না পুত্রবধু হিসাবে।
