নীহার তখনও হাঁপাচ্ছিলো, পিতার কথাগুলো তার কানে প্রবেশ করেছিলো কিনা কে জানে। রাগে অধর দংশন করছিলো নাসেরের আচরণ সম্বন্ধে পিতাকে সব বলবে কিনা ভাবছে!
শয়তানটা তার আব্বাকে সুন্দর একটা সান্ত্বনা দিয়ে নিজেকে সচ্ছ করে নিয়ে বেরিয়ে গিলো।
আবু সাঈদ ভাবলেন সত্যিই নাসের তার কন্যাকে যত্ন সহকারে আগলে রেখেছিলো তাই ধন্যবাদ জানাতে তিনি ভুললেন না। নীহার বললো–আব্বা, নাসের সাহেবকে তুমি ধন্যবাদ জানালে কিন্তু জানো সে কত বড় অন্যায় করেছে?
সে কি মা? কি করেছে সে?
ওর মত শয়তান আমাদের জাহাজে দ্বিতীয় জন নেই। সুযোগ বুঝে সে আমাকে–মানে আমার উপর আক্রমণ চালিয়েছিলো–আমাকে–আমাকে–কণ্ঠ আটকে আসে, বলতে পারে না নীহার স্পষ্ট করে সব কথা।
আবু সাঈদ চমকে উঠেন, উদ্বিগ্নভাবে বললেন–কি হয়েছে মা বলো?
আজ নয় আব্ব। আজ কিছু বলতে চাই না কিন্তু জেনে রেখো নাসের সাহেব শুধু শয়তান নয়, সে একজন এক নম্বর লম্পট।
আবু সাঈদ গম্ভীর হয়ে পড়লেন চোখমুখ তার কালো হয়ে উঠলো। বুঝতে পারলেন নাসের তাহলে কোনো কুমতলব নিয়েই নীহারের পাশে এসেছিলো। রাগে ক্ষোভে পায়চারী শুরু করলেন তিনি। নাসেরকে আবু সাঈদ স্নেহের দৃষ্টি নিয়েই দেখতেন, বন্ধুপুত্র বলেই শুধু নয়–নাসের শিক্ষিত সুদর্শন এবং বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে, নীহারের সঙ্গে সুন্দর মানানসই হবে। তাছাড়াও নাসেরকে তিনি পেয়েছিলেন সর্বসময় নিজের পাশে পাশে পর্যটক হিসাবে। নানা কারণে আবু সাঈদ নাসেরকে ভালবেসেছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি ঐ সর্বগুণ সম্পন্ন ছেলেটিই তার কতখানি অমঙ্গল কামনা করে।
*
বোম্বে স্টুডিও।
পরিচালক আসলাম আলীর ওপেল কার গাড়িখানা এসে থামলো তিন নাম্বার ফ্লোরের সামনে। গাড়ি থেকে নামলেন পরিচালক স্বয়ং এবং বশির আহাম্মদ। নায়িকা শ্যামা এবং আর একটি যুবতী সঙ্কোচিতভাবে নেমে দাঁড়ালো গাড়ি থেকে।
আসলাম আলী শ্যামা ও যুবতীটিকে লক্ষ্য করে বললেন –এসো তোমরা।
পরিচালককে অনুসরণ করলো ওরা সবাই।
সহকারী বশির আহম্মদও এগুলেন সবার পিছনে।
শ্যামা যুবতীটির দক্ষিণ হাতখানা তুলে নিলো হাতে–কোনো ভয় নেই।
যুবতীর রক্তিম গন্ড আরও রক্তিম দেখাচ্ছে অসহায় করুণ চোখে একবার তাকালো শ্যামার দিকে।
ফ্লোরে প্রবেশ করেই বললেন আসলাম আলী–শ্যামা ওকে নিয়ে গ্রীণরুমে যাও। আমি সেট থেকে ফিরে আসছি। বশির তুমিও এসো।
শ্যামা মৃদু হেসে গ্রীবা বাঁকা করে বললো–চট করে আসবেন কিন্তু।
হাঁ, এক্ষুণি এসে যাচ্ছি শ্যামা তুমি ওকে ওর চরিত্রটা সুন্দর করে বুঝিয়ে দাও।
আসলাম আলী ও বশির আহম্মদ চলে গেলেন সেটের দিকে। শ্যামা যুবতীকে নিয়ে এগুলো।
গ্রীনরুমে প্রবেশ করে অবাক হলো যুবতী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে লাগলো চারিদিকে।
শ্যামা একটা চেয়ার দেখিয়ে বললো–বসো।
যুবতী বসলো।
শ্যামা ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজের দেহটাকে একবার নিখুঁতভাবে দেখে নিলো। তারপর বললো–কি বলে ডাকবো তোমায় বলো? পরিচালক সাহেব যে নাম দিয়েছেন ঐ নামে ডাকতে মানা করেছে, কিন্তু কেন বলতো?
ও নাম আমার কাছে ভাল লাগেনা।
তবে কি বলে ডাকবো? বলো লজ্জা কি? আমিও তো তোমার মতই একজন। যুবতী চেয়ারের হাতলে বসলো শ্যামা। দক্ষিণ হস্তের আংগুলে ওর কপালে থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিতে লাগলো। সস্নেহে। বললো আবার বলো কি বলে ডাকলে তুমি খুশি হবে?
আমার নাম ধরে ডেকো।
উ হু, নূরী নামটা তোমাকে পাল্টাতে হবে।
তাহলে যা খুশি তাই বলে ডেকো কিন্তু ঐ নামে নয়।
হেসে বললো শ্যামা–ঐ নাম মানে পরিচালক যে নাম দিয়েছেন?
হাঁ, ও নামে আমাকে ডেকো না।
বেশ, তাহলে আমিই একটা নাম রাখবো তোমার।
নূরী মাথা নিচু করে কথা বলে না কিছু।
শ্যামা ঠোঁটের উপর আংগুল রেখে ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করে।
নূরী তখন তলিয়ে যায় নিজের চিন্তায়।–আজ বেশ কয়েকদিন হলো সে এই নতুন দেশে এসে হাজির হয়েছে। তাকে জোরপূর্বক ধরে এনেছে এরা। তাকে কোনো কষ্ট না দিয়ে যত্নই করেছে বরাবর। জীবনে সে যে সব দেখেনি–তা দেখেছে। যা সে কোনোদিন খায়নি, তাই খাচ্ছে। যা সে জীবনে পরেনি তাই সে এখন পরছে। কিন্তু এতো আদর যত্নে থেকেও তার পাশে তাহলে সে এতোটুকু চিন্তিত বা দুঃখিত হতো না। কিন্তু কে জানে কোথায় সে। হয়তো এখনও সেই পর্বতমালার উপরে তার নাম ধরে ডেকে ফিরছে। খুঁজে ফিরছে বন হতে বনান্তরে। নূরীর গন্ড বেয়ে গড়িয়ে এলো দু’ফোঁটা অশ্রু।
শ্যামা হঠাৎ বলে উঠলো–পেয়েছি চমৎকার একটা নাম পেয়েছি তোমার জন্য। একি তুমি কাঁদছো?
নুরী হাতের পিঠে চোখের পানি মুছে ফেলে বলে-কই না তো।
হা তুমি কাঁদছিলে। কিন্তু কেঁদে শুধু কষ্টই পাবে; ব্যথা কমবে না আরও বেশি হবে।
বলো শ্যামা কি নাম তুমি আমার জন্য পছন্দ করলে?
শশী বলে ডাকবো তোমায়।
শশী!
হ, শশী মানে কি জানো?
মাথা নাড়লো নূরী–না, জানি না।
শশী–চন্দ্রের এক নাম।
হাসলো নূরী।
এমন সময় আসলাম আলী এলেন, ব্যস্তসমস্তভাবে বললেন–শ্যামা মেক আপম্যান এলেই তোমরা তৈরি হয়ে নাও। আর শোনো।
শ্যামা বললো–তার আগে আমার একটা কথা শুনুন।
বলো? আসলাম আলী সিগারেট ধরালেন।
শ্যামা বললো–ওর নাম আমি নতুন করে দিয়েছি।
কি নাম?
শশী।
শশী?
হুঁ।
কেন–আমার দেওয়া নামটা বুঝি—
