হাঁ, মেশিনের দাঁতের ফাঁকে পিষে গেছে তার হাড়গোড় মাংসের দলা বনে গেছে ওর দেহটা।
উঃ! শেষ পর্যন্ত ওর এই অবস্থা? নীহার টলতে লাগলো মাতালের মত।
নাসের নীহারকে ধরে ফেললো টেনে নিলো নিবিড় করে বুকের মধ্যে। এই আশাতেই সে আজ এসেছে নীহারের ক্যাবিনে সকলের অনুপস্থিতিতে।
নীহারের অসংযত দেহ থেকে আঁচলখানা খসে পড়ে। যৌবনভরা অনিন্দ্য-স্লথ বক্ষে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে লোভাতুর নাসেরের চোখ দুটো শ্বাপদের মত জ্বলে উঠে জ্বলজ্বল করে। আরও ঘনিষ্ঠ করে টেনে নেয় ওকে বাহু দুটির মধ্যে।
কিন্তু নীহার জ্ঞান হারায়নি, একটু মাথাটা ঘুরে গিয়েছিলো নাসেরের কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে। অল্পক্ষণেই নীহার নিজেকে সামলে নিলো, নাসেরের আচরণে নাগকন্যার মত রুখে উঠলো। এক মোচড়ে নাসেরের বাহুবন্ধন থেকে নিজকে মুক্ত করে নিয়ে প্রচন্ড এক চড় বসিয়ে দিলো ওর গালে।
নাসের গালে হাতটা একবার বুলিয়ে নিলো আলগোছে। কিছু যেন হয়নি হাসলো সে নীহারের মুখের দিকে তাকিয়ে, নেশা চেপে গেছে ওর মাথায় নীহারের অপরূপ যৌবনসুধা পান করতেই হবে। খপ করে ধরে ফেললো নাসের পুনরায় ওকে। বলিষ্ঠ কঠিন হাতে ওকে চেপে ধরে মুখের কাছে মুখটা নিয়ে এলো।
নীহার নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য ধস্তাধস্তি করতে লাগলো, ভীষণভাবে কামড়ে দিলো নাসেরের হাতে।
নাসেরের মধ্যে তখন জেগে উঠেছে একটা পাপান্ধ পশুত্ব বোধ। নীহারের দাঁত হাতের পিঠে বসে গেলেও নাসের তাকে মুক্ত করে দিলো না।
নীহার প্রাণপণে নিজেকে বাঁচিয়ে নেবার জন্য সমস্ত শক্তি ব্যয় করে চলেছে।
আর নাসের ওকে পাওয়ার জন্য হিংস্র হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্করভাবে। নীহারের মুখের কাছে ওর কঠিন লোভাতুর ওষ্ঠদ্বয় এগিয়ে আসছে চুম্বকের মত।
নীহার ঘেমে উঠেছে–যেন গোসল করেছে সে। হাঁপাচ্ছে রীতিমত। নাসেরও হাঁপাচ্ছে, যেন দুটি যুদ্ধরত ছায়ামূর্তি।
ক্যাবিনে স্বল্প আলো জ্বলছিলো।
ক্রমে নীহারের দেহ শিথিল হয়ে আসছে যেন। হাজার হলেও সে নারী, শক্তির দিক দিয়ে নাসেরের চেয়ে অনেক দুর্বল সে। কতক্ষণ পেরে উঠবে এভাবে লড়াই করে।
নীহার এবার প্রাণ দিয়ে স্মরণ করে খোদাকে, হে দয়াময়, তুমি আমাকে রক্ষা করো, রক্ষা। করো ইজ্জৎ বাঁচাও তুমি– নীহারের কণ্ঠ দিয়ে কথাগুলো একরকম জোরেই বেরিয়ে এলো। নিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে।
নাসের তখন নেশাযুক্ত মত্তের মত হুশহারা। কোনো কথাই তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। সে নীহারের দেহটাকে নিষ্পেষিত দলিত-মথিত-নিঃশেষিত করে ফেলতে চাইছে।
নীহারের বাধা দিবার ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস হয়ে আসছে। অবশ হাত দুখানা ঝুলে পড়ে দু’পাশে। ঠিক ঐ মুহূর্তে ক্যাবিনের বাইরে শোনা যায় আবু সাঈদের কণ্ঠ–নীহার! নীহার–মা। মনি।
আবু সাঈদের গম্ভীর ব্যস্ত কণ্ঠস্বরে হুঁশ ফিরে আসে, নাসের তাড়াতাড়ি নীহারকে মুক্ত করে দিয়ে সরে দাঁড়ায়।
আবু সাঈদ ক্যাবিনে প্রবেশ করে বলেন-নীহার মা আলম মরেনি। আলম বেঁচে আছে, আলম বেঁচে আছে– হঠাৎ নীহারের উপর দৃষ্টি পড়তেই দেখলেন নীহার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলছে। যেন, ব্যস্তভাবে বললেন–একি মা, কি হয়েছে তোমার?
ওদিক থেকে নাসের এগিয়ে আসে, দ্রুতহস্তে রুমাল দিয়ে নিজের কপালের বিন্দু বিন্দু। ঘামগুলো মুছে ফেলছে সে, হন্তদন্ত কণ্ঠে বলে,–হঠাৎ আলমের এ্যাকসিডেন্ট সংবাদে নীহার সংজ্ঞা হারার মত হয়ে পড়েছিলো, তাই আমি ওকে–
ও তাই বলো। বেশ করেছো নাসের আমি তো আলমকে নিয়ে এতোক্ষণ ব্যস্ত ছিলাম। কি যে দুর্ভাবনা হয়েছিলো আমার। যাক ডাক্তার বলেছেন আঘাত গুরুতর হলেও মৃত্যুর কোনো সম্ভাবনা নেই। নীহারের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম একেবারে।
আমি তাহলে আসি স্যার।
আচ্ছা এসো বাবা। ইস কি উপকারটাই না করেছো তুমি! তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
আবু সাইদের ধন্যবাদ গ্রহণ করার মত স্থিরচিত্ত তখন ছিলো না নাসেরের। মুখের গ্রাস হারিয়ে হিংস্র জন্তু যেমন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে ঠিক তেমনি অবস্থা নাসেরের। কিন্তু সরে না পড়ে কোনো উপায় নেই। তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে প্রস্থান করলো সাধু ব্যক্তির মত মন্থর পদক্ষেপে।
শুধু শিকার হারিয়ে নয়–আলম জীবিত আছে; তার মৃত্যুর সম্ভাবনা আর নেই জেনে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। সমস্ত দেহে এবং মনে যেন আগুন জ্বলে উঠলো। হিংসার বহ্নিজ্বালা যাকে বলে।
আবু সাঈদ নীহারের কাঁধে হাত রাখলেন–নীহার! নীহার–নীহার ধপ করে বসে পড়লো শয্যার উপরে, গলা শুকিয়ে গেছে এতক্ষণ শয়তানটার ধস্তাধস্তি করতে গিয়ে। কিন্তু এত বিপদের মধ্যেও যখন নীহারের কানে ঐ একটিমাত্র শব্দ এসে পৌঁছলো–মা আলম বেঁচে আছে–সে। মরেনি-মৃত্যুর সম্ভাবনা আর নেই–অনবিল এক শান্তিতে নীহারের বুক থেকে একটা কঠিন চাপ যেন নেমে গেলো মুহূর্তে। কথা সে বলতে পারলো না সহজে কিন্তু সমস্ত ব্যথা ভুলে গেলো। বসে পড়লো শয্যায়, শুকনো জিভটা একবার ঠোঁটের উপর বুলিয়ে নিয়ে বললো–আব্বা একটু পানি দাও–
পানি! পানি খাবে মা? সবুর করো, ক্ষুণি আনছি। আবু সাইদ টেবিলে ঢাকা দেওয়া পানির গেলাসটা হাতে তুলে নিয়ে কন্যার দিকে এগিয়ে গেলেন–নাও।
নীহার পিতার হাত থেকে পানির গেলাসটা নিয়ে এক নিশ্বাসে ঢক ঢক করে পান করে ফেলে।
আবু সাঈদ দেহ থেকে স্লিপিং গাউনটা খুলে রাখতে রাখতে বললেন–কি বলবো মা, আলমের অবস্থা দেখে আমিই সংজ্ঞা হারাতে বসেছিলাম। ভেবেছিলাম, ছেলেটা মারা পড়েছে। ডাক্তার যখন বললেন ভয়ের সম্ভাবনা নেই তখন আমি আশ্বস্ত হয়েছি। উঃ বেচারী একটুর জন্য বেঁচে গেছে।
