ডাক্তার যখন আলম সম্বন্ধে জীবিত আছে বলে প্রমাণ দিলেন এবং জানালেন আঘাত ভয়ঙ্কর হলেও গুরুতর নয়–তখন নাসেরের মুখ অমাবস্যার অন্ধকারের মত কালো হলো। ধীরে ধীরে সকলের অজ্ঞাতে সরে পড়লো সেখান থেকে।
আবু সাঈদ কয়েকজন নাবিককে বললেন আলমকে তার ক্যাবিনের শয্যায় নিয়ে গিয়ে যত্ন সহকারে শুইয়ে দিতে। কারণ এক্ষুণি তার চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
বনহুরকে অজ্ঞান অবস্থায় তার নিজস্ব ক্যাবিনে শুইয়ে দেওয়া হলো তার বিছানায়।
আবু সাঈদ স্বয়ং এলেন ডাক্তারের সঙ্গে, চোখেমুখে তার সেকি ব্যাকুলতা! যেমন করে হোক বাঁচাতে হবে ওকে। আলমের মত একজন ব্যক্তির নিতান্ত প্রয়োজন তাদের জাহাজে। সেদিন আলম একা তার জাহাজের লাঠিয়ালদের ক’জনাকে কাবু করে ফেলেছিলো, শুধু দৈহিক শক্তিশালীই সে নয়–তার কর্মনিষ্ঠা অত্যন্ত বিমুগ্ধ করেছিলো মালিককে। পর্যটক হিসাবে তাঁকে গোটা বছর ঘুরে ফিরতে হয় দেশ হতে দেশান্তরে। কখন কোন দেশে যান তার কোনো ঠিক নেই।
অজানা-অচেনা জায়গা আবিষ্কার করাই হলো তার কাজ। যেমন বিভিন্ন দেশ-বিদেশ ঘুরে ফিরতে হয়, তেমনি নানারকম বিপদ আপদেও পড়তে হয়। এবং সেই কারণেই জাহাজে তিনি বেশ কিছুসংখ্যক দেহরক্ষী রেখেছিলেন। আলমকেও আবু সাঈদ পছন্দ করেছিলেন একজন কৌশলী বুদ্ধিমান শক্তিশালী সঙ্গী হিসাবে। আজ সেই আলমের অবস্থা দেখে চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসছিলো তার। অনেক কষ্টে সংযত করে রাখছিলেন তিনি নিজেকে।
ডাক্তার আলমের ক্ষতস্থানে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। ইনজেকশন করলেন কয়েকটা।
নাসেরের দল ছাড়া এ জাহাজে আলমকে ভালোবাসতো সবাই। ওর ব্যবহারে কেউ অসন্তুষ্ট। ছিলো না, বরং সবাই খুশি ছিলো। অবশ্য এর কারণ ছিলো–জাহাজের ছোট-বড় সকলকে সে সমান চোখে দেখতো। সুযোগ পেলেই তাদের সহায়তা করতে কাজে।
একদিন আলম পিছন ডেক অভিমুখে যাচ্ছিলো, তখন একজন খালাসী ভারী কোন একটা বস্তু উপরে উঠানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। তখন আশে পাশে কেউ ছিলো না তাকে সাহায্য করবার মত। অসহায় খালাসী ঘর্মাক্ত দেহ নিয়ে চেষ্টার পর চেষ্টা করে চলেছে।’
আলমের দৃষ্টি স্থির হলো খালাসীটার উপরে, এগিয়ে গেলো সে ওর পাশে নির্বিঘ্নে তাকে সাহায্য করলো। আর এক দিন একজন নাবিক তার ডিউটিকালে হঠাৎ পেটের ব্যথায় অস্থির হয়ে পড়লো। কিন্তু ডিউটি তাকে করতেই হবে। ঐ সময় আলম তার কাজ শেষ করে ফিরে যাচ্ছিলো, হঠাৎ নাবিকের মুখোভাব লক্ষ্য করে সে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে তার। নাবিক তার অস্বস্তির কথা জানালো। আলম তাকে ঐ মুহূর্তে বিশ্রাম করতে বললো–সে তার ডিউটি সময়টা চালিয়ে নেবে বলে তাকে আশ্বাস দিলো।
নাবিক কৃতজ্ঞতায় নত হলো আলমের কাছে।
এমনি আরও কতজন আলমের এ করুণ অবস্থা দর্শনে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো।
ভীড় জমে গেলো আলমের ক্যাবিনে।
কিন্তু ডাক্তারের নির্দেশে সবাইকে ক্যাবিন ত্যাগ করতে হলো। চলে গেলেও তাদের অন্তর যেন পড়ে রইলো আলমের পাশে, ব্যথা বেদনা নিয়ে নিজ নিজ স্থানে গমন করলো ওরা।
নীহার তখন নিজের ক্যাবিনে বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। আজ সে উপলব্ধি করছে– কখন সে নাবিক আলমকে এতখানি ভালবেসেছিলো, কখন তার মনের আসনে প্রতিষ্ঠা করেছিলো ওকে! আজ আলমের মৃত্যুর সংবাদ তাকে উন্মাদিনী করে ফেলেছে। মাথা ঠুকে কাঁদতে লাগলো নীহার। কেন তবে ও এসেছিলো তাদের জাহাজে। না এলে এমন তো হতো না। তার জীবন ছিলো স্বাভাবিক সচ্ছ। হাসি আর আনন্দই ছিলো পরম সম্পদ কিন্তু যেদিন থেকে ওকে সে দেখেছে কেন সে নিজেই জানে না হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে। আগের নীহার পাল্টে গিয়েছিলো ক’দিনের ব্যবধানে। প্রকৃতির চলার গতির পথে ঋতু যেমন বয়ে আনে পরিবর্তন, ভাবগম্ভীর বসুন্ধরা বিভাসিত হয়ে উঠে যেমন বসন্তের আগমনে তেমনি নীহারের মধ্যে নাবিক আলম এনেছিলো এক ছন্দের শিহরণ। ধনবান দুহিতা বিদুষী সে; সামান্য একজন নাবিকের মধ্যে খুঁজে নেবে তার প্রিয়জনকে এ যে কল্পনাতীত!
প্রেম প্রীতি-ভালবাসা, স্নেহ-মায়া-মমতা কোনদিন জাতি বা স্থান-কুল বিচার করে না। নীহারও নিজের অজান্তে ওকে মনের গহনে আসন দিয়ে বসেছিলো। আজ সে উপলব্ধি করে। বিশেষ করে সবকিছু।
নীহার যখন অন্ধকার ক্যাবিনে কান্নায় ভেঙে পড়েছে তখন আস্তে করে ক্যাবিনে প্রবেশ করে। নাসের। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করে ওকে। হাসে নাসের আপন মনেই কারণ সে জানে নীহারের কান্না কিসের জন্য।
সরে আসে একেবারে নীহারের শয্যার নিকটে পিঠে হাত রেখে ডাকে সে গলাটাকে কোমল করে নিয়ে নীহার!
চমকে মুখ তোলে নীহার। সোজা হয়ে বসে, দ্রুত হস্তে চোখের পানি মুছে ফেলে বলে– আপনি কেন এখানে?
নাসের কেঁচোর মত হাত দু’খানা কোটের পকেটে পুরে নিয়ে মুচকি হেসে বললো–চোখের পানি মুছে ফেললে কেন নীহার? কাঁদো আরও কাঁদো–বরফ যখন গলতে শুরু করেছে তখন আর থামবে না।
ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠে নীহার–বেরিয়ে যান।
যদি না যাই?
আব্বাকে ডাকবো।
আব্বা! আব্বা এখন তোমার সেই নাবিকটার মৃতদেহের সৎকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
নীহার নিজের মাথাটা চেপে ধরে দু’হাতে ভুলে যায় নাসের তার পরম শত্রু, বলে সে ব্যাকুল কণ্ঠে–নাসের সাহেব আলম মারা পড়েছে!
